আপনি কি ২০২৬ সালের মাধ্যমিক ইতিহাস Model Question Paper 8 এর সমাধান খুঁজছেন? তাহলে আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন। এই আর্টিকেলে আমরা WBBSE-এর ইতিহাস ২০২৬ মাধ্যমিক ইতিহাস Model Question Paper 8-এর প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক ও বিস্তৃত সমাধান উপস্থাপন করেছি।
প্রশ্নোত্তরগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা সহজেই পড়ে বুঝতে পারে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যবহার করতে পারে। ইতিহাস Model Question Paper প্রশ্নপত্র ও তার সমাধান মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ও সহায়ক।
MadhyamikQuestionPapers.com, ২০১৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষার সমস্ত প্রশ্নপত্র ও সমাধান সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করে আসছে। ২০২৬ সালের সমস্ত মডেল প্রশ্নপত্র ও তার সঠিক সমাধান এখানে সবার আগে আপডেট করা হয়েছে।
আপনার প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করতে এখনই পুরো প্রশ্নপত্র ও উত্তর দেখে নিন!
Download 2017 to 2024 All Subject’s Madhyamik Question Papers
View All Answers of Last Year Madhyamik Question Papers
যদি দ্রুত প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজতে চান, তাহলে নিচের Table of Contents এর পাশে থাকা [!!!] চিহ্নে ক্লিক করুন। এই পেজে থাকা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর Table of Contents-এ ধারাবাহিকভাবে সাজানো আছে। যে প্রশ্নে ক্লিক করবেন, সরাসরি তার উত্তরে পৌঁছে যাবেন।
Table of Contents
Toggleবিভাগ-ক
১. সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো:
১.১ ভারত প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপে জয়লাভ করেছিল-
(ক) ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে
(খ) ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে
(গ) ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে
(ঘ) ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে
উত্তর: (খ) ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে
১.২ বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছিলেন-
(ক) তিন বছর
(খ) চার বছর
(গ) দশ বছর
(ঘ) বারো বছর
উত্তর: (খ) চার বছর
১.৩ আত্মীয় সভার প্রতিষ্ঠাতা-
(ক) শিবনাথ শাস্ত্রী
(খ) বিদ্যাসাগর
(গ) কেশবচন্দ্র সেন
(ঘ) রামমোহন রায়
উত্তর: (ঘ) রামমোহন রায়
১.৪ ‘চুইয়ে পড়া তত্ত্ব’ প্রচার করেন-
(ক) কোলব্রুক
(খ) টমাস ব্যাবিংটন মেকলে
(গ) ডেভিড হেয়ার
(ঘ) উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক
উত্তর: (খ) টমাস ব্যাবিংটন মেকলে
১.৫ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি প্রাপক ছিলেন –
(ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(খ) বিদ্যাসাগর
(গ) আনন্দমোহন বসু
(ঘ) আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (ঘ) আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
১.৬ তিতুমিরের প্রকৃত নাম ছিল-
(ক) চিরাগ আলি
(খ) হায়দার আলি
(গ) মির নিশার আলি
(ঘ) তোরাপ আলি
উত্তর: (গ) মির নিশার আলি
১.৭ ‘হল্কা’ কথার অর্থ হল –
(ক) গ্রাম
(খ) অঞ্চল
(গ) মহকুমা
(ঘ) জেলা
উত্তর: (খ) অঞ্চল
১.৮ ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি রচনা করেন –
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ
উত্তর: (গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
১.৯ ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটির সভাপতি ছিলেন –
(ক) রাজা রাধাকান্ত দেব
(খ) প্রসন্নকুমার ঠাকুর
(গ) রাজা রামমোহন রায়
(ঘ) দ্বারকানাথ ঠাকুর
উত্তর: (ক) রাজা রাধাকান্ত দেব
১.১০ নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতির জনক বলা হয়-
(ক) দ্বারকানাথ ঠাকুরকে
(খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে
(গ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে
(ঘ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে
উত্তর: (গ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে
১.১১ বিশ্বভারতীর প্রথম উপাচার্য হলেন-
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) তারকনাথ পালিত
(ঘ) সুবোধচন্দ্র মল্লিক
উত্তর: (খ) রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১.১২ রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাকাহিনী’ গল্পটি মূলত-
(ক) ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা
(খ) বিশ্বভারতীর শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা
(গ) আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার সমালোচনা
(ঘ) আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার সমালোচনা
উত্তর: (ক) ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা
১.১৩ বাবা রামচন্দ্র কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন-
(ক) বিহারে
(খ) যুক্তপ্রদেশে
(গ) রাজস্থানে
(ঘ) মহারাষ্ট্রে
উত্তর: (খ) যুক্তপ্রদেশে
১.১৪ কোন্ ঘটনাকে সুরেন্দ্রনাথ ‘গভীর জাতীয় বিপর্যয়’ বলেছেন? –
(ক) বঙ্গভঙ্গকে
(খ) রাওলাট আইনকে
(গ) জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডকে
(ঘ) চৌরিচৌরা ঘটনাকে
উত্তর: (ক) বঙ্গভঙ্গকে
১.১৫ ভারতের প্রথম শ্রমিক সংগঠন ছিল-
(ক) গিরনি-কামগড় ইউনিয়ন
(খ) মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন
(গ) ইন্ডিয়ান মিল হ্যান্ডস ইউনিয়ন
(ঘ) সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস
উত্তর: (খ) মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন
১.১৬ নারী কর্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-
(ক) ঊর্মিলা দেবী
(খ) বাসন্তী দেবী
(গ) সরলাদেবী চৌধুরানি
(ঘ) সুনীতি দেবী
উত্তর: (ক) ঊর্মিলা দেবী
১.১৭ ‘গদর’ শব্দের অর্থ হল –
(ক) বিপ্লব
(খ) বিদ্রোহ
(গ) অভ্যুত্থান
(ঘ) আন্দোলন
উত্তর: (ক) বিপ্লব
১.১৮ ডন সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন-
(ক) সতীশচন্দ্র মুখার্জি
(খ) সতীশচন্দ্র বসু
(গ) শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু
(ঘ) সতীশচন্দ্র সামন্ত
উত্তর: (ক) সতীশচন্দ্র মুখার্জি
১.১৯ পুনর্গঠিত কেরল রাজ্যটি অবস্থিত ছিল –
(ক) গোদাবরী উপত্যকায়
(খ) দক্ষিণ ওড়িশায়
(গ) কাথিয়াবাড় উপদ্বীপে
(ঘ) মালাবার উপকূলে
উত্তর: (ঘ) মালাবার উপকূলে
১.২০ দেশভাগের ভয়াবহ স্মৃতিবিজড়িত ‘তমস’ গ্রন্থটির লেখক হলেন –
(ক) ভীষ্ম সাহানি
(খ) খুশবন্ত সিং
(গ) সলমন রুশদি
(ঘ) মহাশ্বেতা দেবী
উত্তর: (ক) ভীষ্ম সাহানি
বিভাগ-খ
২. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ১৬টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
উপবিভাগ ২.১ একটি বাক্যে উত্তর দাও:
২.১.১ ভাগনাডিহিতে কোন্ বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল?
উত্তর: ভাগনাডিহিতে সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল।
২.১.২ ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি কোন্ পুস্তকের অন্তর্ভুক্ত?
উত্তর: ‘বন্দেমাতরম’ গানটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২ সালে প্রকাশিত) উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত।
২.১.৩ ফরওয়ার্ড ব্লক কোন্ বছর প্রতিষ্ঠিত হয়? ME – ’18
উত্তর: ফরওয়ার্ড ব্লক ১৯৩৯ সালের ২২ জুন বছর প্রতিষ্ঠিত হয়।
২.১.৪ ‘ভারতীয় বিপ্লববাদের জনক’ কাকে বলা হয়?
উত্তর: ‘ভারতীয় বিপ্লববাদের জনক’ বলা হয় বাল গঙ্গাধর তিলককে।
উপবিভাগ ২.২ ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো:
২.২.১ বাংলা ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে।
উত্তর: ঠিক
২.২.২ রাজা রাধাকান্ত দেব স্কুল বুক সোসাইটির সভাপতি ছিলেন।
উত্তর: ঠিক
২.২.৩ ড. অনিল শীল আঠারো শতককে ‘সভাসমিতির যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন। ME-23
উত্তর: ভুল
২.২.৪ ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতীয় সংবিধানে মোট স্বীকৃত ভাষার সংখ্যা ছিল ১৬।
উত্তর: ভুল
উপবিভাগ ২.৩ ‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ লাদুরি | (১) ওঁরাও |
| ২.৩.২ তানাভকৎ আন্দোলন | (২) কলকাতা ME – ’23 |
| ২.৩.৩ সি ভি রমন | (৩) দলিত আন্দোলন |
| ২.৩.৪ বি আর আম্বেদকর | (৪) অ্যানাল স্কুল |
উত্তর:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ লাদুরি | (৪) অ্যানাল স্কুল |
| ২.৩.২ তানাভকৎ আন্দোলন | (১) ওঁরাও |
| ২.৩.৩ সি ভি রমন | (২) কলকাতা |
| ২.৩.৪ বি আর আম্বেদকর | (৩) দলিত আন্দোলন |
উপবিভাগ ২.৪ প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখা মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত করো ও নামাঙ্কিত করো:
২.৪.১ মুরশিদাবাদ,
২.৪.২ সুরাট,
২.৪.৩ শ্রীরামপুর,
২.৪.৪ তেভাগা আন্দোলন যে স্থানে শুরু হয়- দিনাজপুর।
উপবিভাগ ২.৫ নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন করো:
২.৫.১ বিবৃতি: ইংরেজ কোম্পানি নীলদর্পণ নাটকের অভিনয় বন্ধ করে দেয়।
ব্যাখ্যা ১: এই নাটকটি দেখে বাংলার সব কৃষক নীলচাষ বন্ধ করে দেয়।
ব্যাখ্যা ২: নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার ফলে বাংলার মানুষের মধ্যে ইংরেজবিরোধী ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
ব্যাখ্যা ৩ : এই নাটকটির নাট্যকার ইংরেজ জাতি সম্পর্কে কটূক্তি করেছিলেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার ফলে বাংলার মানুষের মধ্যে ইংরেজবিরোধী ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
২.৫.২ বিবৃতি: ভারতের ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার অরণ্য আইন প্রবর্তন করেছিল।
ব্যাখ্যা ১: ব্রিটিশ সরকারের অরণ্য আইন প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা।
ব্যাখ্যা ২: ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল অরণ্যবাসীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা।
ব্যাখ্যা ৩: ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থে অরণ্য সম্পদ ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থে অরণ্য সম্পদ ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
২.৫.৩ বিবৃতি: ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কমিউনিস্টরা যোগ দেয়নি। ΜΕ -’23
ব্যাখ্যা ১: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির প্রতি কমিউনিস্টদের সমর্থন ছিল।
ব্যাখ্যা ২: জাতীয় কংগ্রেস আপত্তি জানিয়েছিল।
ব্যাখ্যা ৩: কমিউনিস্টরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি উদাসীন ছিল।
উত্তর: ব্যাখ্যা ১: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির প্রতি কমিউনিস্টদের সমর্থন ছিল।
২.৫.৪ বিবৃতি : সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার (১৯৩২) মাধ্যমে অনুন্নত শ্রেণিদের পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হলে গান্ধিজি তার প্রতিবাদে আমরণ অনশন শুরু করেন। ΜΕ -’20
ব্যাখ্যা ১: গান্ধিজি ছিলেন অনুন্নত শ্রেণিদের নির্বাচনী অধিকারের বিরোধী।
ব্যাখ্যা ২: হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরির প্রতিবাদে গান্ধিজি অনশন করেন।
ব্যাখ্যা ৩: জাতীয় কংগ্রেসের নির্দেশে গান্ধিজি প্রতিবাদী অনশন করেছিলেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরির প্রতিবাদে গান্ধিজি অনশন করেন।
বিভাগ-গ
৩. দুটি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও : (যে-কোনো ১১টি)
৩.১ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ গুরুত্বপূর্ণ কেন? ΜΕ -’23
উত্তর: ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই বছরের কয়েকটি ঘটনা ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ও সংহতিকে ত্বরান্বিত করেছিল। নিম্নলিখিত কারণে এই বছরটির গুরুত্ব বিশেষভাবে স্বীকৃত –
রাজধানী স্থানান্তর ও দিল্লি দরবার – ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত রাজকীয় দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের ঘোষণা করেন।
বঙ্গভঙ্গ রদ – ১৯০৫ সালে কার্যকর হওয়া বঙ্গভঙ্গ ছিল ব্রিটিশদের ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতির একটি জ্বলন্ত উদাহরণ, যা বাংলায় তীব্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও বয়কটের সূচনা করেছিল। ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বরই এই বঙ্গভঙ্গ রদেরও ঘোষণা করা হয়।
মোহনবাগানের ঐতিহাসিক জয় – ১৯১১ সালের ২৯শে জুলাই, কলকাতার মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব ভারতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (IFA) শিল্ডের ফাইনালে ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট দলকে ২-১ গোলে পরাজিত করে। এটি ছিল কোনও ভারতীয় দলের প্রথম IFA শিল্ড জয়।
৩.২ নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা বলতে কী বোঝো?
উত্তর: “নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা” বলতে ঐতিহাসিক গবেষণার এমন একটি ধারাকে বোঝায়, যার মূল বিষয়বস্তু হল সমাজের তথাকথিত অন্ত্যজ, প্রান্তিক ও দলিত শ্রেণির মানুষের জীবনকাহিনি, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা। এই ইতিহাসচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সাধারণ মানুষ, যাদের কথা ও কাহিনি প্রথাগত ইতিহাসে সাধারণত উপেক্ষিত থাকে। এই গবেষণায় যুগ যুগ ধরে চলে আসা এইসব মানুষের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নবাগত বা আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের বিরোধ এবং তার ফলে সৃষ্ট বিক্ষোভ ও বিদ্রোহগুলি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। রণজিৎ গুহ, শাহিদ আমিন, জর্জ রুদে, গৌতম ভদ্র প্রমুখ ঐতিহাসিকদের কাজের মাধ্যমে ইতিহাসচর্চার এই নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি বিকশিত হয়েছে।
৩.৩ ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ বিভক্ত হল কেন? ΜΕ -’17
উত্তর: ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ বিভক্ত হওয়ার মূল কারণ হল – ব্রাহ্মসমাজের প্রাণপুরুষ কেশবচন্দ্র সেনের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের প্রতি অনুরাগ, গুরুবাদের প্রতি আসক্তি এবং শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্তিবাদের প্রতি বিশ্বাসের কারণে শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু প্রমুখ নবীন ব্রাহ্ম নেতাদের সঙ্গে তাঁর মতাদর্শগত সংঘাত তৈরি হয়। এই মতপার্থক্য চূড়ান্ত বিভাজনের দিকে এগোয় যখন কেশবচন্দ্র সেন তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্কা (১৪ বছর বয়সী) কন্যা সুনীতিদেবীর সঙ্গে কুচবিহারের অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৬ বছর বয়সী) মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের বিবাহ দেন। এই বিবাহ সেই সময়ে ‘নেটিভ ম্যারেজ অ্যাক্ট’ বা ব্রাহ্মসমাজের নিজস্ব বিধানগুলিরও লঙ্ঘন করেছিল। এই বিরোধের ফলস্বরূপ ১৮৭৮ সালে শিবনাথ শাস্ত্রীর নেতৃত্বে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে, কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বাধীন ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ পরবর্তীতে ১৮৮০ সালে সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শে নববিধান ব্রাহ্মসমাজে রূপান্তরিত হয়।
৩.৪ বামাবোধিনী সভার দুটি উদ্দেশ্য লেখো।
উত্তর: বামাবোধিনী সভার দুটি উদ্দেশ্য হল –
“শিক্ষা ও সচেতনতার প্রসার – বামাবোধিনী সভার মূল লক্ষ্য ছিল নারীদের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া। নারীশিক্ষাকে এগিয়ে নিতে এই সংগঠনের তত্ত্বাবধানে বাংলায় প্রায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
কুসংস্কার দূরীকরণ – নারীদের মন থেকে কুসংস্কার দূর করে তাদের মধ্যে যুক্তিভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাও এই সভার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল।”
৩.৫ নীল বিদ্রোহে খ্রিস্টান মিশনারিদের ভূমিকা কীরূপ ছিল? ΜΕ-’19
উত্তর: বাংলায় সংঘটিত নীল বিদ্রোহে ইউরোপ থেকে ভারতে আগত খ্রিস্টান মিশনারিদের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এই বিদ্রোহের সময় তারা নীলচাষিদের প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি জানায়। তারা নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ও শোষণের চিত্র স্থানীয় সংবাদপত্রগুলিতে তুলে ধরে। তারা উপলব্ধি করে যে, নীলচাষিদের দুর্দশা দূর করার জন্য তাদের মধ্যে উন্নত ‘খ্রিস্টান শিক্ষা’ ও গণশিক্ষার প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মিশনারি জেমস লঙ নীলকরদের তীব্র সমালোচক ছিলেন।
৩.৬ কে, কেন ‘বিশে ডাকাত’ নামে পরিচিত ছিলেন?
উত্তর: নদীয়া জেলার চৌগাছা গ্রামের বিশ্বনাথ সর্দার ‘বিশে ডাকাত’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি নীলবিদ্রোহের একজন বিখ্যাত নেতা এবং বাংলার রবিনহুড ও নীলবিদ্রোহের প্রথম শহীদ হিসেবে খ্যাত। তিনি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে অত্যাচারী নীলকুঠির ম্যানেজার স্যামুয়েল ফেডিকে আক্রমণ করেছিলেন। এই ডাকাতি-সদৃশ সশস্ত্র আক্রমণের কার্যকলাপ এবং বিদ্রোহী ভূমিকার কারণেই তিনি “বিশে ডাকাত” নামে পরিচিত হন।
৩.৭ শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি অংশ কেন মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) বিরোধিতা করেছিল? ME-22
উত্তর: প্রগতির ভয় ও মধ্যযুগীয় শাসনের আশঙ্কা – শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি অংশ মনে করেছিল যে, বিদ্রোহীরা সফল হলে ভারতে একটি মধ্যযুগীয় সামন্ত-তান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। তারা ইংরেজ শাসনে যে আধুনিক শিক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা ও সুশাসনের সূচনা হয়েছিল, তা বিঘ্নিত হবে বলে আশঙ্কা করত।
আর্থিক ও কর্মসংস্থানের স্বার্থ – শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি বড়ো অংশ ইংরেজ সরকারের অধীনে কর্মরত ছিল, যেমন ডাকঘর, আদালত, রেলওয়ে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তারা ভেবেছিল যে বিদ্রোহ সফল হলে ব্রিটিশ শাসনের পতন ঘটবে এবং এর ফলে তারা তাদের চাকরি ও সামাজিক মর্যাদা হারাবে।
এই দুইটি প্রধান কারণে শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি অংশ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বিরোধিতা করেছিল।
৩.৮ ভারতে জাতীয় চেতনার বিকাশে গোরা উপন্যাসটির ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: গোরা” কেবল একটি উপন্যাস নয়; এটি ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ভারতবর্ষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জিজ্ঞাসার একটি মহাকাব্যিক দলিল। উপন্যাসের মূল চরিত্র গোরা (গৌরমোহন) একজন অতি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী আইরিশ যুবক হিসেবে তার পরিচয় দিয়ে শুরু করলেও, তার চরিত্রের মধ্য দিয়ে একটি জাতির সামগ্রিক পরিচয় ও আত্মানুসন্ধানের প্রক্রিয়া চিত্রিত হয়েছে। গোরার চেতনায় ভারতবর্ষের প্রতি অগাধ প্রেম এবং সমাজের অখণ্ডতাবোধ নিগূঢ়ভাবে ফুটে উঠেছে। তার সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রাথমিকভাবে সমাজকে বিভক্ত করলেও, পরিণতিতে তা একটি সর্বগ্রাহী ও সার্বভৌম ভারতীয় পরিচয়ের দিকে এগোয়। এই যাত্রাপথ ছিল জাতীয় চেতনার বিকাশের একটি রূপক। রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসে তৎকালীন বঙ্গসমাজের জাতীয় আন্দোলন, ব্রাহ্ম-হিন্দু সংঘাত, কুসংস্কার, সামাজিক সংস্কার এবং ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে ভারতীয়দের আত্ম-পরিচয়ের সংকটকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে চিত্রায়িত করেছেন। এটি পাঠকদের মধ্যে তাদের নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় অবদান হলো এর গতিপথ। এটি ধর্ম ও সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করে শেষ হয় এক উদার, মানবতাবাদী ও সার্বজনীন চেতনায়। গোরা যখন আবিষ্কার করে সে জৈবিকভাবে ভারতীয় নয়, তখনই সে উপলব্ধি করে যে ভারতীয়ত্ব কোনো জন্মগত পরিচয় নয়, বরং এ দেশের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির প্রতি মমত্ববোধেরই ফল। এই উপলব্ধি ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে একটি সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে মুক্ত করে এক সর্বভারতীয় ও মানবিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে প্রেরণা যুগিয়েছিল। সর্বোপরি, “গোরা” উপন্যাসটি ভারতীয়দের মধ্যে একটি যুক্তিসংগত, গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় চেতনা গড়ে তুলতে একটি বৌদ্ধিক ও মানসিক ভিত্তি প্রস্তুত করেছিল, যা কেবল বিদেশী শাসনের বিরোধিতা নয়, বরং একটি আধুনিক, সংহত ও মানবিক ভারত গঠনের আদর্শকে সামনে রেখেছিল।
৩.৯ ‘বিদ্যাসাগর সাট’ বলতে কী বোঝায়? ΜΕ -’24, ’22
উত্তর: “বিদ্যাসাগর সাট” বলতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক সংস্কারকৃত বাংলা বর্ণমালার ভিত্তিতে তৈরি নতুন ছাঁচের ছাপার অক্ষর বা মুদ্রণ অক্ষরকে বোঝায়। বাংলা ভাষা শিক্ষার প্রসার ও মুদ্রণের কাজ সহজ ও বিজ্ঞানসম্মত করার জন্য বিদ্যাসাগর বর্ণমালা সংস্কার করেন। তিনি তাঁর সংস্কারিত বর্ণমালা (১২টি স্বরবর্ণ ও ৪০টি ব্যঞ্জনবর্ণ, মোট ৫২টি বর্ণ) ‘বর্ণপরিচয়’ গ্রন্থে উপস্থাপন করেন। এই সংস্কারকৃত বর্ণমালার ভিত্তিতে তৈরি নতুন মুদ্রণ অক্ষরই “বিদ্যাসাগর সাট” নামে বাংলা মুদ্রণের ইতিহাসে পরিচিত।
৩.১০ বাংলায় ছাপাখানা প্রসারের দুটি কারণ উল্লেখ করো।
উত্তর: বাংলায় ছাপাখানা প্রসারের দুটি কারণ নিম্নরূপ –
ক্রমবর্ধমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান – বাংলায় প্রচলিত দেশজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ফলে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠ্যবই ছাপার জন্য ছাপাখানা দরকার হয়।
মুনাফা – ছাপাখানার ব্যাবসাতে প্রচুর মুনাফা হয়। তাই নতুন নতুন উদ্যোগীরা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন।
৩.১১ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? ME-’17
উত্তর: ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের শ্রমিক ও কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার জন্য। ১৯২৫ সালের ১ নভেম্বর “দি লেবার স্বরাজ পার্টি অব দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস” নামে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি ১৯২৮ সালে নাম পরিবর্তন করে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি (WPP) হয়। এই দল প্রতিষ্ঠার মুখ্য উদ্দেশ্যগুলো ছিল নিম্নরূপ –
- শ্রমিকদের কাজের সময়সীমা কমানো।
- শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন মজুরির হার নির্ধারণ করা।
- জমিদারি প্রথার অবসান ঘটানো।
- নতুনভাবে শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করা।
৩.১২ ‘হালি প্রথা’ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: “হালি প্রথা” বলতে পশ্চিম ভারতের সুরট অঞ্চলে প্রচলিত একটি ভূমিদাসত্ব প্রথাকে বোঝায়। এই প্রথায় নিম্নবর্ণের কালিপারাজরা (ভূমিহীন কৃষক) জমিদার বা উচ্চবর্ণের উজালিপারাজদের জমিতে নিজেদের গোরু-লাঙ্গল দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করত। এটি ছিল একটি বংশানুক্রমিক বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কালিপারাজদেরকে উজালিপারাজদের জমিতে শ্রম দিতে হত এবং শোষণ ও অত্যাচারের ধারা মেনে চলতে হত। বিশেষত গুজরাটের বারদৌলি তালুকে এই প্রথা প্রচলিত ছিল।
৩.১৩ ‘দলিত’ কাদের বলা হয়? ΜΕ -’19, ’17
উত্তর: “দলিত” শব্দটির অর্থ “দলন করা” বা “মাড়িয়ে যাওয়া”। এটি মূলত ভারতের সেই সকল সম্প্রদায়কে বোঝায় যারা হিন্দু সমাজের চতুর্বর্ণ ব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করে এবং যাদের সাথে ঐতিহাসিকভাবে ঘোরতর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, বঞ্চনা ও অস্পৃশ্যতা পালন করা হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে এই শব্দটি নিপীড়িত, শোষিত ও মূলস্রোতের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত যারা “অবর্ণ” বা “অতিশূদ্র” নামে পরিচিত, যেমন – চামার, মাহার, নমঃশূদ্র প্রভৃতি সম্প্রদায় “দলিত” হিসেবে পরিচিত। এরা হিন্দু সমাজে সবচেয়ে নিম্নস্তরে অবস্থান করে এবং বিভিন্ন সময়ে “অস্পৃশ্য” বা “চণ্ডাল” হিসেবেও আখ্যায়িত হয়।
৩.১৪ রশিদ আলি দিবস কী?
উত্তর: ১৯৪৬ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি দিল্লির লালকেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রশিদ আলির কোর্ট মার্শাল করে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ের প্রতিবাদে ১১ই ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ছাত্র লিগের ডাকে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়, যাতে কংগ্রেস ও বামপন্থী ছাত্ররাও যোগ দেয়। এই বিক্ষোভের সময় ইংরেজ পুলিশের গুলিতে ৪৮ জন ছাত্র নিহত এবং ৩০০-রও বেশি আহত হন। এই পুলিশি বর্বরতার প্রতিক্রিয়ায় পরের দিন, অর্থাৎ ১২ই ফেব্রুয়ারি, সমগ্র বাংলায় তীব্র ক্ষোভের প্রকাশ হিসাবে সেই তারিখটিকে “রশিদ আলি দিবস” হিসেবে পালন করা হয় এবং কলকাতায় সর্বাত্মক বন্ধ পালিত হয়। সুতরাং, রশিদ আলি দিবস ছিল ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এবং ক্যাপ্টেন রশিদ আলির দণ্ডের প্রতিবাদে ছাত্র হত্যাকাণ্ডের পর বাংলায় সৃষ্ট ক্ষোভ ও গণআন্দোলনের একটি প্রকাশ।
৩.১৫ স্মৃতিকথাকে কীভাবে উদ্বাস্তু সমস্যার ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যায়?
উত্তর: উদ্বাস্তু সমস্যার ইতিহাস রচনার উপাদান হিসাবে ‘স্মৃতিকথা’র ব্যবহার হল –
- ‘স্মৃতিকথা’ গুলি উদ্বাস্তু সমস্যা ও তার প্রভাব বিষয়ে নানা তথ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আকর রূপে বিবেচিত হয়।
- সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ কীভাবে উদ্বাস্তু সমস্যা দ্বারা প্রভাবিত হয় সেই ইতিহাস জানার উপাদান হিসাবে স্মৃতিকথা ব্যবহার করা হয়।
- ‘স্মৃতিকথা’ থেকে দেশভাগের প্রেক্ষাপট, জিন্নাসহ মুসলিম লিগ, জাতীয় কংগ্রেস, বামপন্থী ও ইংরেজ সরকারের ভূমিকা, উদ্বাস্তু সমস্যা ও তার সমাধান বিষয়ে জানা যায়।
৩.১৬ জে ভি পি কমিটি কেন গঠন করা হয়েছিল?
উত্তর: ভারতের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন অঞ্চলে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের জোরালো দাবি উঠতে থাকে। এই দাবিগুলি দেশের ঐক্য ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল ও পট্টাভি সীতারামাইয়ার নামানুসারে জে.ভি.পি. কমিটি গঠন করা হয়।
এই কমিটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের দাবিগুলি তদন্ত করা, তাদের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করা এবং নতুন রাষ্ট্রের স্বার্থে এ ধরনের পুনর্গঠন আদৌ প্রয়োজনীয় কি না, সে বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া।
বিভাগ-ঘ
৪. সাত বা আটটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও : (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
উপবিভাগ ঘ.১
৪.১ এদেশের চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রে কলকাতা মেডিকেল কলেজের কীরূপ ভূমিকা ছিল? ME-’18
উত্তর: এদেশের চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রে কলকাতা মেডিকেল কলেজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত যুগান্তকারী ও গতিপ্রদানকারী। নিম্নলিখিত পয়েন্ট গুলির মাধ্যমে এই ভূমিকা স্পষ্ট হয় –
আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার সূচনা – ১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতবর্ষে প্রথমবারের মতো প্রথাগত ও সংস্কারবিহীনভাবে পাশ্চাত্য আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়মিত শিক্ষাদান শুরু হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিপ্লব – এই কলেজ প্রতিষ্ঠার পর সরকার দেশীয় চিকিৎসাপদ্ধতিতে অর্থব্যয় বন্ধ করে দেন। ফলে, দেশীয় পদ্ধতির স্থলে দ্রুত পাশ্চাত্য আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা প্রসার লাভ করে।
এশিয়ায় দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান – পণ্ডিচেরির পর কলকাতা মেডিকেল কলেজ ছিল এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় এমন প্রতিষ্ঠান যেখানে ইউরোপীয় আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা শেখানো হতো।
প্রশিক্ষিত চিকিৎসক তৈরি – কলেজ থেকে পাস করা প্রথম দিকের ছাত্ররা (যেমন – উমাচরণ শেঠ, রাজকৃষ্ণ দে, দ্বারকানাথ গুপ্ত) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, মুরশিদাবাদ, পাটনা ইত্যাদি) ডাক্তার হিসেবে কাজ করে আধুনিক চিকিৎসার প্রসার ঘটান।
কুসংস্কার দূরীকরণ – কলেজের ছাত্র মধুসূদন গুপ্ত প্রথম ভারতীয় হিসেবে শবব্যবচ্ছেদ করেন, যা তৎকালীন সমাজের কুসংস্কার দূর করতে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান বিকাশে যুগান্তর সৃষ্টি করে।
সারসংক্ষেপে, কলকাতা মেডিকেল কলেজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই ছিল না, এটি ছিল ভারতবর্ষে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর ও এর প্রসারের প্রধান কেন্দ্র। এর প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম বাংলা তথা সমগ্র ভারতের চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসে এক নবযুগের সূচনা করেছিল।
৪.২ উনিশ শতকে নারীশিক্ষার প্রসার সম্পর্কে আলোচনা করো।
উত্তর: ভূমিকা – উনিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় নারীশিক্ষার অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। সমাজের রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কারের কারণে নারীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অ্যাডাম রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সে সময় নারীরা প্রায় সম্পূর্ণরূপেই নিরক্ষর ছিল। তবে এই শতকের মধ্যবর্তী সময় থেকে মিশনারি ও কিছু প্রগতিশীল ব্যক্তির ব্যক্তিগত উদ্যোগে নারীশিক্ষার প্রসার শুরু হয়, যা বাংলার নারীসমাজের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
নারীশিক্ষার বিস্তার – উনিশ শতকে বাংলাদেশে (তৎকালীন বাংলা) নারীশিক্ষার বিস্তারের জন্য মূলত দুটি ধারায় উদ্যোগ গৃহীত হয় বেসরকারি উদ্যোগ ও সরকারি উদ্যোগ।
বেসরকারি উদ্যোগ –
মিশনারিদের ভূমিকা – ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান মিশনারিরা ‘ক্যালকাটা ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮২৫ সালের মধ্যে এই সংস্থা ৬টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে মোট ১৬০ জন ছাত্রী পড়াশোনা করত।
ইংল্যান্ডের সংস্থার ভূমিকা – ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের ‘ফরেন স্কুল সোসাইটি’ ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটির সহযোগিতায় বাংলায় বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসে। তারা মিস কুক নামে একজন শিক্ষিকাকে কলকাতায় প্রেরণ করেন। তাঁর চেষ্টায় ৩০টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রায় ৬৮৫ জন ছাত্রী এতে ভর্তি হন।
বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা – ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে জনহিতৈষী ইংরেজ কর্মকর্তা ড্রিংকওয়াটার বেথুন ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ (পরবর্তীতে বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বাংলায় নারীশিক্ষার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, মদনমোহন তর্কালঙ্কার এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই বিদ্যালয়টি উচ্চবর্ণের হিন্দু পরিবারের মেয়েদের শিক্ষাদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
অন্যান্য উদ্যোগ – ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দেই নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর উদ্যোগে বারাসত বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও, ব্রাহ্ম সমাজের নেতাদের চেষ্টায় ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’ ও ‘অবলাবান্ধব পত্রিকা’-র মতো সংবাদপত্র নারীশিক্ষার পক্ষে জোরালো প্রচার চালায়।
সরকারি উদ্যোগ –
বেসরকারি উদ্যোগের তুলনায় সরকারি উদ্যোগ ছিল অনেকটাই সীমিত ও ধীরগতিসম্পন্ন। বেথুন সাহেবের মৃত্যুর পর গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি তাঁর প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব ও ব্যয়ভার সরকারি তহবিল থেকে বহন করার সিদ্ধান্ত নেন, এইভাবে এটি একটি সরকারি বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শিক্ষা বিভাগের ইনস্পেকটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৮৫৭ থেকে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলার বিভিন্ন জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শুরুতে নারীদের পরীক্ষায় বসতে দিত না। কিন্তু ব্রাহ্ম সমাজসহ প্রগতিশীলদের চাপের মুখে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে এটি নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসার সুযোগ সৃষ্টি করে। উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪) এবং পরবর্তীকালে ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন নারীশিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করে এবং এর উন্নতির জন্য সুপারিশ করে, যা সরকার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে সমর্থন করে।
শিক্ষার প্রগতি – এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে নারীশিক্ষার দ্রুত প্রসার ঘটে। ১৮৬৬-৬৭ সালের শিক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮১টিতে। মাত্র এগারো মাসের মধ্যে ৬৪টি নতুন বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা নারীশিক্ষার প্রতি ক্রমবর্ধমান সামাজিক স্বীকৃতিরই প্রমাণ দেয়।
মূল্যায়ন – উনিশ শতকের বাংলায় নারীশিক্ষার প্রসার ছিল একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা। গভীর সামাজিক কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার বাধা সত্ত্বেও মিশনারি, বিদেশি সংস্থা, উদারমনা ইউরোপীয় ব্যক্তিত্ব এবং ভারতীয় সমাজ সংস্কারকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় নারীশিক্ষার বীজ রোপিত হয়। প্রাথমিকভাবে বালিকা বিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রীসংখ্যা কম ছিল (গড়ে ২০ জন) এবং শিক্ষাক্রমও সীমিত ছিল, তবুও এ কথা নিঃসন্দেহে স্বীকার করতে হয় যে, এই আন্দোলনই আধুনিক শিক্ষার আলো প্রথমবারের মতো বাঙালি নারীদের জীবনকে স্পর্শ করে। এটি নারীদের গৃহকোণ থেকে বের করে এনে শিক্ষালয়ের প্রাঙ্গণে উপস্থিত করেছিল, যা পরবর্তীতে উনিশ ও বিংশ শতাব্দীতে নারীমুক্তি আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে।
উপবিভাগ ঘ.২
৪.৩ ‘বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা’কে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয় কেন? ME-’19
উত্তর: ভূমিকা – উনিশ শতকে বাংলায় সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সভা-সমিতি গঠিত হয়। ড. অনিল শীল এই শতককে “সভাসমিতির যুগ” বলে চিহ্নিত করেছেন। এগুলোর মধ্যে “বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা” (১৮৩৬) বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ একে বাংলা তথা ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কারণসমূহ –
সরকারি নীতির সমালোচনা – এই সভা সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনব্যবস্থার ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনার জন্য গঠিত হয়েছিল। এটি সরকারি কার্যাবলির ওপর জনগণের মতামত প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
জনস্বার্থে আবেদন – বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের অভিযোগ সরকারের নিকট পেশ করা। এটি সরকারের কাছে সাংগঠনিকভাবে দাবি উত্থাপনের প্রথা চালু করে।
কর নীতির বিরোধিতা – ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষ্কর জমিতে কর আরোপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই সভা সক্রিয় প্রতিবাদ ও জনসভার আয়োজন করে, যা একটি রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় দেয়।
রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার – সভায় নিয়মিত রাজনৈতিক বিষয়াবলি আলোচিত হত, যা সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলার পথ প্রশস্ত করে।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন – গবেষক যোগেশচন্দ্র বাগল প্রমুখের মতে, বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাই ছিল বাংলা ও ভারতবর্ষের প্রথম সংগঠন যেটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কার্যক্রম গ্রহণ করেছিল। এর মাধ্যমেই ভারতে সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।
উপসংহার – বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা কেবল সাহিত্য বা সামাজিক সংস্কারের সীমা অতিক্রম করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল বলে একে “প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এটি পরবর্তীকালে ভারতের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর জন্য আদর্শ হিসেবে কাজ করে।
৪.৪ টীকা লেখো: মহারানির ঘোষণাপত্র।
উত্তর: ভূমিকা – ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়। ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে সরিয়ে সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুটের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। ১৮৫৮ সালের ১লা নভেম্বর ভারতের প্রথম ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং এলাহাবাদে মহারানি ভিক্টোরিয়ার পক্ষে এই ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন, যা “মহারানির ঘোষণাপত্র” নামে পরিচিত।
পটভূমি – বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে দায়ী মনে করে। এর ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘ভারতে উন্নত ধরনের শাসন আইন, ১৮৫৮’ (Government of India Act, 1858) পাস করে। এই আইনের মাধ্যমে ভারতের শাসনদণ্ড সরাসরি মহারানি ভিক্টোরিয়ার হাতে অর্পণ করা হয়।
মূল বক্তব্য – ঘোষণাপত্রের মূল সূত্রগুলি ছিল নিম্নরূপ –
- ধর্মীয় স্বাধীনতা – ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার হস্তক্ষেপ করবে না।
- চাকরির সমতা – জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল যোগ্য ভারতবাসী সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাবেন।
- স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল – দত্তকপুত্র গ্রহণের মাধ্যমে দেশীয় রাজ্যগুলির উত্তরাধিকার রক্ষা করা হবে।
- বিস্তারবাদের পরিহার – সরকার ভারতীয় উপমহাদেশে আর সাম্রাজ্য বিস্তার করবে না বলে ঘোষণা করে।
- চুক্তির মর্যাদা – দেশীয় রাজাদের সঙ্গে কোম্পানির স্বাক্ষরিত সব চুক্তি ব্রিটিশ সরকার মেনে চলবে।
মূল্যায়ন – এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দীর্ঘ ১০০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এটি ছিল একটি কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পদক্ষেপ, যার লক্ষ্য ছিল বিদ্রোহ-পরবর্তী অস্থিরতা দূর করে ভারতবাসীর আস্থা অর্জন করা। তবে ঘোষণাপত্রে দেওয়া অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই পরে কার্যকর হয়নি। ধর্মীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়া, চাকরিতে ভারতীয়দের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব না পাওয়া ইত্যাদি কারণে ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার একে ‘প্রতিশ্রুতিভঙ্গের অধ্যায়’ বলে বর্ণনা করেছেন।
উপবিভাগ ঘ.৩
৪.৫ টীকা লেখো: কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল। ΜΕ-’12
উত্তর: ভূমিকা – ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে দাদাভাই নৌরোজী তাঁর ‘Poverty and Un-British Rule in India’ গ্রন্থে যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে একটি বামপন্থী চিন্তাধারার জন্ম দেয়। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল গঠিত হয়।
পটভূমি – এই দল গঠনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করেছিল –
- ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের প্রভাব ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বিস্তার।
- ১৯৩২-৩৪ সময়কালে আইন অমান্য আন্দোলন ও ব্রিটিশ দমননীতির বিরুদ্ধে কংগ্রেস নেতৃত্বের দুর্বল প্রতিক্রিয়া।
- গান্ধীবাদী আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে তরুণ নেতাদের অসন্তোষ।
- কৃষক ও শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে কংগ্রেসের পর্যাপ্ত মনোযোগের অভাব।
প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্ব – দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২৩ অক্টোবর, ১৯৩৪ তারিখে বোম্বাইয়ে আচার্য নরেন্দ্রদেবের সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও নেতাদের মধ্যে ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, রামমনোহর লোহিয়া, অচ্যুত পট্টবর্ধন, মিনু মাসানি ও ইউসুফ মেহের আলি। পরবর্তীতে এ. কে. গোপালন ও ই. এম. এস. নাম্বুদিরিপাদও এই দলের সাথে যুক্ত হন।
উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি – দলের প্রধান লক্ষ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক আদর্শে ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন। তাদের উল্লেখযোগ্য কর্মসূচিসমূহের মধ্যে ছিল –
- জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ ও ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে জমি বিতরণ।
- শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও কাজের অধিকার নিশ্চিতকরণ।
- বেগার প্রথা (বিনা মজুরিতে শ্রম) বিলোপ।
- শিল্প ও বাণিজ্যের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
প্রসার ও প্রভাব – দলটির কার্যক্রম উত্তরভারত (যেমন যুক্তপ্রদেশ) ও দক্ষিণ ভারতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পি. কে. পিল্লাই ও এম. এ. ব্রেডলির মতো কংগ্রেসের বিদ্রোহী নেতাদের যোগদানের মাধ্যমে এর প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়।
উপসংহার – অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও আদর্শগত সংঘাতের কারণে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল বেশিদূর টিকতে না পারলেও, এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে কৃষক ও শ্রমিকদের সমস্যাগুলি জাতীয় আন্দোলনের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪.৬ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কৃষকদের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: ভূমিকা – ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ বিরোধী শেষ গণ-আন্দোলন। “করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে” – গান্ধিজির এই ডাকে কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে যোগ দেয়।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য – এই আন্দোলনে কৃষকরা জমিদারদের বদলে পুলিশি অত্যাচার ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেছিল। ধনী কৃষক, ক্ষেতমজুর, ভূমিহীন কৃষক, এমনকি কিছু জমিদারও এই আন্দোলনে সামিল হয়। কংগ্রেসের জাতীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত এই আন্দোলনে কৃষকরাও দ্রুত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল এবং এটি একটি গণ-বিদ্রোহের রূপ নেয়।
আন্দোলনের বিভিন্ন কেন্দ্র –
বিহার – বিহারে কিষান সভা পরিচালিত কৃষক আন্দোলন উগ্র রূপ নিয়েছিল। আন্দোলনকারীরা রেলস্টেশন, পৌরভবন, ডাকঘর প্রভৃতি সরকারি দপ্তরে অগ্নিসংযোগ করে এবং বিহারের প্রায় আশি শতাংশ থানা দখল করে নিয়েছিল।
বাংলা – বাংলার বিভিন্ন জেলায় কৃষক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লেও মেদিনীপুর জেলা প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানে কৃষকরা খাজনা দেয়া বন্ধ করে দেয় এবং মাতঙ্গিনী হাজরার মতো কৃষক নেত্রী পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। সতীশ সামন্তের নেতৃত্বে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
গুজরাট – সুরাট, রাজকোট সহ সমগ্র গুজরাটে কৃষকরা গেরিলা কায়দায় রেল অবরোধ, সরকারি নথি পোড়ানো প্রভৃতি কর্মসূচি পালন করে।
অন্যান্য অঞ্চল – এছাড়া উড়িষ্যা, আসাম, মধ্যপ্রদেশ, বোম্বাই সহ সমগ্র ভারতে কৃষকদের ব্যাপক যোগদানের ফলে ভারতছাড়ো আন্দোলন প্রায় একটি সর্বাত্মক কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল।
মূল্যায়ন – কৃষকরা, যারা অন্নদাতা এবং দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত ও শোষিত একটি সম্প্রদায়, তারা এই আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাদের ব্যাপক ও সক্রিয় অংশগ্রহণই এই আন্দোলনকে একটি গণ-বিদ্রোহের চরিত্র দান করেছিল।
উপবিভাগ ঘ.৪
৪.৭ কীভাবে কাশ্মীর সমস্যার সৃষ্টি হয়? ΜΕ -’23, ’19
উত্তর: কাশ্মীর সমস্যার সৃষ্টি হয় মূলত ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন ও স্বাধীনতার সময়কালীন পরিস্থিতিতে। সমস্যাটির সূত্রপাত হয় নিম্নলিখিত ধাপাবলীতে –
স্বাধীনতার সময়কার অনিশ্চয়তা – ভারত স্বাধীনতা লাভের সময় কাশ্মীর ছিল একটি দেশীয় রাজ্য, যার শাসক ছিলেন মহারাজা হরি সিং। তাঁকে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই নিজ নিজ রাষ্ট্রে যোগদানের আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু মহারাজা কোনও পক্ষেই যোগদান না করে রাজ্যটিকে স্বাধীন রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
পাকিস্তানের আক্রমণ – ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তানের মদতপুষ্ট হানাদার বাহিনী কাশ্মীর আক্রমণ করে এবং হত্যা, লুণ্ঠনসহ হিংসাত্মক কার্যকলাপ শুরু করে।
ভারতভুক্তি – এই আক্রমণের মুখে মহারাজা হরি সিং ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেন। ভারত সরকার সাহায্যের শর্ত হিসেবে কাশ্মীরের ভারতভুক্তি দাবি করেন। ২৬ অক্টোবর মহারাজা হরি সিং ‘ভারতভুক্তির দলিলে’ (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করলে কাশ্মীর আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতভুক্ত হয়।
যুদ্ধ ও জাতিসংঘে উত্থাপন – ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে প্রবেশ করে আক্রমণকারীদের বিতাড়িত করে। এই সংঘাতের প্রেক্ষিতে ভারত বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করে।
যুদ্ধবিরতি ও সমস্যার স্থায়ীত্ব – ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয় এবং একটি যুদ্ধবিরতি রেখা (LOC) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে কাশ্মীরের একটি অংশ পাকিস্তান-অধিকৃত হয়ে যায় এবং সমস্যাটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অমীমাংসিত রূপ নেয়।
সুতরাং, কাশ্মীর সমস্যার সৃষ্টি হয় রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রাথমিক অনিশ্চয়তা, পাকিস্তানের সামরিক আক্রমণ, ভারতভুক্তি এবং পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ও বিভক্তির মধ্য দিয়ে, যা আজও চলমান।
৪.৮ উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ ও বিতর্কটি পর্যালোচনা করো।
উত্তর: দুই শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম ও অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ভারত যখন স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন তার সবচেয়ে বড় মূল্য চুকাতে হয় দেশভাগের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ সালের এই বিভাজন শুধু ভূখণ্ডই বিভক্ত করেনি, তৈরি করেছে ইতিহাসের এক ভয়াবহ মানবিক সংকট – উদ্বাস্তু সমস্যা। ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে শরণার্থীতে পরিণত হন। ১৯৪৯ সালের মধ্যে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ লক্ষতে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি।
পাঞ্জাব ও বাংলার ভিন্ন অভিজ্ঞতা –
দেশভাগের যন্ত্রণা সবচেয়ে গভীরভাবে আঘাত হানে পাঞ্জাব ও বাংলায়। যদিও উভয় ক্ষেত্রেই মূল কারণ ছিল ধর্মীয় বিভাজন, কিন্তু সমস্যার প্রকৃতি ছিল ভিন্ন।
পাঞ্জাব – সেখানে ব্যাপক দাঙ্গার মুখোমুখি হয়ে মানুষ পালাতে বাধ্য হয়। পাঞ্জাবের শরণার্থীরা ভারত ত্যাগ করার সময় রেখে যাওয়া সম্পত্তি দখল করে তুলনামূলকভাবে দ্রুত পুনর্বাসিত হতে পেরেছিলেন। ভাষাগত সাদৃশ্যের কারণে তারা পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, রাজস্থান ও হরিয়ানায় ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হন।
বাংলা – বাংলার পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী। এখানে দাঙ্গার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম ছিল, কিন্তু শরণার্থীদের অনুপ্রবেশ একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। ১৯৪৭-এর পরবর্তী বছরগুলো জুড়ে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এই প্রবাহ অব্যাহত থাকে। সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যের কারণে এই উদ্বাস্তুরা পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরায় আশ্রয় নেন। সরকার যখন তাদের উড়িষ্যা ও আন্দামানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন অনেকেই তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিভিন্ন স্থানে জবরদখল করে বসবাস শুরু করেন, যা অল্প সময়ের মধ্যে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে।
রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও বিতর্ক – দেশভাগের সময় বাংলাকে অখণ্ড রাখার জন্য মুসলিম লিগের আবুল হাসিম এবং বেঙ্গল কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু ও কিরণশঙ্কর রায়ের মতো নেতারা আন্দোলন চালালেও, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তার তীব্র বিরোধিতা করেন। স্বাধীনতার পর নেহেরুর মন্ত্রিসভায় শিল্পমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও, পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের বিষয়ে নেহেরু সরকারের নীতির বিরোধিতা করে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং ভারতীয় জনসংঘ গঠন করেন। দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ভারতের জওহরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের লিয়াকত আলী খান ১৯৫০ সালে দিল্লি চুক্তি (নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি) স্বাক্ষর করেন। কিন্তু এই চুক্তি কার্যত ব্যর্থ হয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও ড. ক্ষিতিশচন্দ্র নিয়োগী এই চুক্তির বিরোধিতা করে মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দেন। পাকিস্তান থেকে সংখ্যালঘুদের ভারতমুখী প্রবেশ অব্যাহত থাকে।
দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা ও মরিচঝাঁপি ট্র্যাজেডি – বাংলায় উদ্বাস্তু সমস্যা একটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, যার সবচেয়ে মর্মান্তিক উদাহরণ হল ১৯৭৮ সালের মরিচঝাঁপির ঘটনা। দণ্ডকারণ্যে পুনর্বাসিত হওয়া প্রায় দেড় লক্ষ উদ্বাস্তু ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দূরত্বের কারণে সেখান থেকে ফিরে এসে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মরিচঝাঁপিতে আশ্রয় নেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য প্রথমে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে এবং পরে হাইকোর্টের রায়ের পর সশস্ত্র বাহিনী প্রেরণ করে, যার পরিণতি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক।
উপসংহার – উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে নেহেরু সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা ছিল নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা সাফল্যও পেয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যার ব্যাপকতা ও জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তা অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়। সরকারি নথিতে দেশভাগের পুরো চিত্র ধরা না পড়লেও, খুশবন্ত সিং-এর ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’, সুনন্দা শিকদারের ‘দয়াময়ীর কথা’, মিহির সেনগুপ্তের ‘বিষাদবৃক্ষ’ বা উর্বশী বুটালিয়ার ‘দ্য আদার সাইড অফ সাইলেন্স’-এর মতো সাহিত্যকর্ম ও স্মৃতিচারণমূলক রচনা সেই যন্ত্রণা, বিচ্ছেদ ও হাহাকারের গভীরতম অনুভূতিগুলোকে আমাদের কাছে জীবন্ত করে তোলে। দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি ভারত ও বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির উপর একটি গভীর ও স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
বিভাগ-ঙ
৫. পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে যে-কোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর দাও :
৫.১ পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে ডেভিড হেয়ার ও বেথুন সাহেবের অবদান সম্পর্কে লেখো।
উত্তর: ভূমিকা – উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও নবজাগরণের সূচনায় দুজন ইউরোপীয় ব্যক্তিত্ব বিশেষ ভূমিকা রাখেন— ডেভিড হেয়ার ও জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন। এঁরা দুজনেই ছিলেন ভারতপ্রেমী, এবং বাংলার মানুষের শিক্ষা ও সমাজের উন্নতির জন্য নিজেদের নিবেদিত করেছিলেন।
ডেভিড হেয়ারের অবদান –
ডেভিড হেয়ার স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন এবং ঘড়ি ব্যবসায়ী হিসেবে কলকাতায় আসেন। কিন্তু বাংলা ও তার মানুষদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ তাকে এদেশেই থেকে যেতে প্ররোচিত করে। তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮১৭) – ডেভিড হেয়ার বুঝতে পেরেছিলেন যে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ছাড়া বাঙালি সমাজের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই তিনি রাজা রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব এবং তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাইড ইস্টের সহায়তায় ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং বাংলায় ইংরেজি ও আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি (১৮১৭) – ভালো পাঠ্যপুস্তকের অভাবে শিক্ষার্থীরা তখন পিছিয়ে পড়ছিল। এই অভাব দূর করতে হেয়ার ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ইংরেজি ও ভারতীয় ভাষায় মানসম্মত বই প্রকাশ করে এবং সুলভ মূল্যে বা বিনামূল্যে বই বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি (১৮১৮) – বিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়ন ও নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হেয়ার ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি গঠন করেন। এই সংস্থা কলকাতা ও তার আশেপাশের অনেক স্কুলের উন্নয়নে সাহায্য করে।
অন্যান্য অবদান – তিনি নারীশিক্ষার প্রসারে আগ্রহী ছিলেন এবং এ বিষয়ে আর্থিক সহায়তা দিতেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রে তিনি নিয়মিত অর্থদান করতেন।
মূল্যায়ন – ডেভিড হেয়ারের নিরলস প্রচেষ্টা বাংলায় আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করে। তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে কলকাতায় হেয়ার স্কুল, হেয়ার স্ট্রিট ইত্যাদি নামকরণ করা হয়েছে।
বেথুন সাহেবের অবদান –
জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন ছিলেন একজন ভারতবন্ধু ব্রিটিশ কর্মকর্তা। তিনি নারীশিক্ষার প্রসার এবং বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলার নবজাগরণে বিশেষ অবদান রাখেন।
বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা (১৮৪৯) – তখনকার সমাজে নারীশিক্ষাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। বেথুন সাহেব এই অবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে ১৮৪৯ সালের ৭ মে হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত হয়। এটি বাংলার প্রথম সুসংগঠিত বালিকা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় মির্জাপুরে তাঁর বাড়িটি বিদ্যালয়ের জন্য দান করেন।
অর্থনৈতিক সহায়তা – বেথুন তাঁর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এই স্কুলের জন্য দান করেন, যা বিদ্যালয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহযোগিতা – ১৮৫০ সালে বিদ্যাসাগর বেথুন স্কুলের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। তাঁর যোগদানের পর স্কুলের সুনাম ও কার্যকারিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েদের শিক্ষা – রামগোপাল ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ও বিদ্যাসাগরের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কারণে উচ্চবর্ণ ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরা এখানে পড়াশোনার সুযোগ পান। একটি অভিভাবক কমিটি গঠন করে ছাত্রীদের সার্বিক দেখভাল করতেন।
মূল্যায়ন – বেথুন সাহেবের প্রতিষ্ঠিত স্কুল পরবর্তীতে বেথুন কলেজে রূপান্তরিত হয়, যা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মহিলা কলেজ। তিনি বলেছিলেন, “আজকের দিনে একটি বিপ্লবের সূচনা হল…”— যা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।
উপসংহার – ডেভিড হেয়ার ও বেথুন সাহেব উভয়েই বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা ও নারীশিক্ষার প্রসারে ঐতিহাসিক অবদান রেখে গেছেন। হেয়ারের হিন্দু কলেজ ও বেথুনের বেথুন স্কুল বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এনেছিল এবং আধুনিক ভারত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
৫.২ উনিশ শতকে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষের কারণসমূহ আলোচনা করো।
উত্তর: ভূমিকা – জাতীয় চেতনা থেকেই জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়। ঔপনিবেশিক শাসনের গোড়ার দিকে ভারতে কোনো জাতীয়তাবাদী চেতনা ছিল না। বিদেশি শাসনের ফলশ্রুতি হিসেবেই আধুনিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ শুরু হয়। উনিশ শতকে ভারতবাসীর মনে এই জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটার পিছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ কাজ করেছিল।
জাতীয় চেতনা উন্মেষের কারণসমূহ –
ব্রিটিশ শাসন ও শোষণমূলক নীতি – ব্রিটিশ শাসনের বিভিন্ন শোষণমূলক নীতি যেমন, জমিদারি ব্যবস্থা, রাজস্ব নীতি, কৃষকদের ওপর অত্যাচার ইত্যাদি ভারতবাসীর মনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এই অসন্তোষ থেকেই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হওয়ার চেতনা জন্ম নেয়।
জাতিগত বৈষম্য ও অপমান – ব্রিটিশ শাসকরা নিজেদেরকে উন্নত জাতি হিসেবে বিবেচনা করত এবং ভারতীয়দের সঙ্গে জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ করত। তারা ভারতীয়দের সঙ্গে সামাজিক মেলামেশা, ক্লাব, রেলওয়ের কামরা, এমনকি বিচারালয়েও পৃথক ও হীন আচরণ করত। এই অপমান ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেয়।
পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব – মিশনারি ও ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে। এই শিক্ষার মাধ্যমে ভারতীয় শিক্ষিত যুবকেরা ইউরোপীয় স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ, ফরাসি বিপ্লব এবং উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ধারণার সঙ্গে পরিচিত হন। এগুলো তাদের মধ্যে স্বাধীনচেতা মনোভাব গড়ে তোলে।
ভারতীয় অতীত ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কার – উইলিয়াম জোনস, ম্যাক্স মুলার প্রমুখ পাশ্চাত্য পণ্ডিত এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ভান্ডারকর প্রমুখ ভারতীয় পণ্ডিতদের গবেষণার মাধ্যমে ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, সাহিত্য, দর্শন ও বৈজ্ঞানিক উন্নতির গৌরবময় ইতিহাস পুনরাবিষ্কৃত হয়। এই গৌরবময় অতীত ভারতীয়দের আত্মবিশ্বাস ও জাতীয় গর্ব ফিরিয়ে আনে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূমিকা – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ ও ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বীরবাঙালি’ কাব্য, দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক প্রভৃতি সাহিত্যকর্ম ভারতীয়দের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করে।
সংবাদপত্রের ভূমিকা – সংবাদপত্রগুলি জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রামমোহন রায়ের ‘সম্বাদ কৌমুদী’, দ্বারকানাথ ঠাকুরের ‘বেঙ্গল হরকারু’, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের ‘বেঙ্গল গেজেট’ প্রভৃতি পত্র-পত্রিকা ব্রিটিশ শাসনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও শোষণের কাহিনি জনসাধারণের মধ্যে পৌঁছে দেয় এবং জাতীয় চেতনা সৃষ্টিতে সাহায্য করে।
যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি – ব্রিটিশ সরকার তাদের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য রেলপথ, সড়কপথ ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার প্রসার ঘটায়। এর ফলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ সহজতর হয়। তারা একে অপরের সমস্যা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারে এবং প্রাদেশিকতা অতিক্রম করে একটি জাতীয় পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়।
অর্থনৈতিক শোষণ ও দেশীয় শিল্পের ধ্বংস – ব্রিটিশ শাসনের ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প ও হস্তশিল্প ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ব্রিটেনে তৈরি পণ্যের অবাধ প্রবেশ এবং কাঁচামাল রপ্তানির নীতির ফলে ভারতের অর্থনীতি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অর্থনৈতিক শোষণ ভারতবাসীকে বুঝতে সাহায্য করে যে ব্রিটিশ শাসন তাদের উন্নতির জন্য নয়, বরং শোষণের জন্য এসেছে।
ইউরোপীয় বিভিন্ন ঘটনা ও আদর্শের প্রভাব – আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৪-৮৩), ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) এর স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলন, ইতালি ও জার্মানির একত্রীকরণ আন্দোলন এবং জাপানের আধুনিকীকরণ ভারতীয় শিক্ষিত সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
উপসংহার – উনিশ শতকে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে হয়নি; বরং ব্রিটিশ শাসনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব, অতীত গৌরবের পুনরাবিষ্কার এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির মাধ্যমে তৈরি হওয়া দেশপ্রেম মিলেই এই চেতনার জন্ম দেয়। এই জাতীয় চেতনাই পরবর্তীকালে সংগঠিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে।
৫.৩ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা লেখো।
উত্তর: সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা – ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন একটি গৌরবময় অধ্যায়। এই আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট। বিপ্লবীদের স্মৃতিকথা, ঐতিহাসিক দলিল ও সরকারি নথিপত্র থেকে জানা যায়, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অসংখ্য ছাত্র বিপ্লবী আন্দোলনে যোগদান করেছিল। তারা কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ না রেখে, দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিল।
বিপ্লবী দল গঠনে ছাত্রদের অংশগ্রহণ –
বাংলায় বেশ কয়েকটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল, যেগুলোর সদস্য ও কর্মী ছিল মূলত তরুণ ছাত্ররা।
অনুশীলন সমিতি – ১৯০২ সালে সতীশচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত এই সমিতির আদর্শ ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘অনুশীলন তত্ত্ব’। এখানে ছাত্রসদস্যদের শারীরিক শিক্ষা ও অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হত।
যুগান্তর দল – ১৯০৬ সালে অরবিন্দ ঘোষ ও ভগিনী নিবেদিতার অনুপ্রেরণায় এই দল গঠিত হয়। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখের নেতৃত্বে এই দল ছাত্রদের অস্ত্রচালনা ও বোমা তৈরি করার প্রশিক্ষণ দিত।
অ্যান্ট-সার্কুলার সোসাইটি – ১৯০৫ সালে স্বদেশি আন্দোলনের সময় স্কুলছাত্রদের সাহায্যের জন্য শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু এই সমিতি গড়ে তোলেন। এর ‘ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন’ শাখায় ছাত্রদের অস্ত্রশিক্ষা দেওয়া হত।
বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স – ১৯২৮ সালে ঢাকার ‘মুক্তিসংঘ’ সংগঠনটি বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স নাম নেয়। এই দলের সদস্য হিসেবে বহু ছাত্র সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়।
ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি – চট্টগ্রামের শিক্ষক সূর্য সেন (মাস্টারদা) ১৯১৮ সালে এই দল গঠন করেন। এখানে ছাত্রসদস্যদের অস্ত্র ও বিস্ফোরক তৈরি শেখানো হত।
বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে ছাত্রদের অংশগ্রহণ –
বিভিন্ন সাহসী সশস্ত্র অভিযানে ছাত্র বিপ্লবীরা নেতৃত্ব দিয়েছে।
কিংসফোর্ড হত্যা প্রচেষ্টা (১৯০৮) – অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে গিয়ে কিশোর ছাত্র ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকি তাদের জীবন উৎসর্গ করেন।
লোম্যান হত্যা (১৯৩০) – ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র বিনয়কৃষ্ণ বসু অত্যাচারী পুলিশ ইনস্পেক্টর জেনারেল লোম্যানকে গুলি করে হত্যা করেন।
রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান (১৯৩০) – তিন ছাত্র বিপ্লবী বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ করে ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার সিম্পসনকে হত্যা করেন। বিনয় ও বাদল আত্মহত্যা এবং দীনেশের ফাঁসি হয়।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (১৯৩০) – মাস্টারদা সূর্য সেন তার ছাত্র বিপ্লবী দল নিয়ে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ করেন এবং জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেন।
ব্রিটিশ অফিসার হত্যা – বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের ছাত্র সদস্যরা পেডি (১৯৩১), ডগলাস (১৯৩২) ও বার্জ (১৯৩২) নামক তিন অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করে।
মূল্যায়ন – বাংলার ছাত্রসমাজ দেশপ্রেম ও বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের এই সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনকে বেগবান করেছিল। বিভিন্ন দুঃসাহসিক অভিযান ও ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যার মাধ্যমে তারা ব্রিটিশ সরকারকে চরমভাবে সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের আত্মদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
MadhyamikQuestionPapers.com এ আপনি অন্যান্য বছরের প্রশ্নপত্রের ও Model Question Paper-এর উত্তরও সহজেই পেয়ে যাবেন। আপনার মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কেমন লাগলো, তা আমাদের কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আরও পড়ার জন্য, জ্ঞান অর্জনের জন্য এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য MadhyamikQuestionPapers.com এর সাথে যুক্ত থাকুন।
