Madhyamik Question Papers

ইতিহাস Model Question Paper 7 (2026) এর উত্তর – Class 10 WBBSE

History
History Model Question Paper 7 2026 Answer Thumbnail

আপনি কি ২০২৬ সালের মাধ্যমিক ইতিহাস Model Question Paper 7 এর সমাধান খুঁজছেন? তাহলে আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন। এই আর্টিকেলে আমরা WBBSE-এর ইতিহাস ২০২৬ মাধ্যমিক Model Question Paper 7-এর প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক ও বিস্তৃত সমাধান উপস্থাপন করেছি।

প্রশ্নোত্তরগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা সহজেই পড়ে বুঝতে পারে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যবহার করতে পারে। ইতিহাস মডেল প্রশ্নপত্র ও তার সমাধান মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ও সহায়ক।

MadhyamikQuestionPapers.com, ২০১৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষার সমস্ত প্রশ্নপত্র ও সমাধান সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করে আসছে। ২০২৬ সালের সমস্ত মডেল প্রশ্নপত্র ও তার সঠিক সমাধান এখানে সবার আগে আপডেট করা হয়েছে।

আপনার প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করতে এখনই পুরো প্রশ্নপত্র ও উত্তর দেখে নিন!

Download 2017 to 2024 All Subject’s Madhyamik Question Papers

View All Answers of Last Year Madhyamik Question Papers

যদি দ্রুত প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজতে চান, তাহলে নিচের Table of Contents এর পাশে থাকা [!!!] চিহ্নে ক্লিক করুন। এই পেজে থাকা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর Table of Contents-এ ধারাবাহিকভাবে সাজানো আছে। যে প্রশ্নে ক্লিক করবেন, সরাসরি তার উত্তরে পৌঁছে যাবেন।

Table of Contents

বিভাগ-ক

১. সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো:

১.১ উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী যুক্ত ছিলেন-

(ক) শহরের ইতিহাসে
(খ) স্থানীয় ইতিহাসে
(গ) শিল্পচর্চার ইতিহাসে
(ঘ) বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসে

উত্তর: (ঘ) বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসে

১.২ ‘বাংলা চলচ্চিত্রের জনক’ বলা হয়-

(ক) সত্যজিৎ রায়কে
(খ) হীরালাল সেনকে
(গ) দাদাসাহেব ফালকেকে
(ঘ) মৃণাল সেনকে

উত্তর: (খ) হীরালাল সেনকে

১.৩ ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি ছাপা হয়েছিল-

(ক) নদিয়াতে
(খ) ঢাকায়
(গ) শ্রীরামপুরে
(ঘ) কলকাতায়

উত্তর: (খ) ঢাকায়

১.৪ হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন –

(ক) মধুসূদন রায়
(খ) উমেশচন্দ্র দত্ত
(গ) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
(ঘ) গিরিশচন্দ্র ঘোষ

উত্তর: (ঘ) গিরিশচন্দ্র ঘোষ

১.৫ বাংলার নবজাগরণ ছিল-

(ক) ব্যক্তিকেন্দ্রিক
(খ) প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক
(গ) কলকাতাকেন্দ্রিক
(ঘ) গ্রামকেন্দ্রিক

উত্তর: (গ) কলকাতাকেন্দ্রিক

১.৬ জঙ্গলমহল নামে একটি পৃথক জেলা গঠন করা হয়েছিল-

(ক) সাঁওতাল বিদ্রোহের পরে
(খ) কোল বিদ্রোহের পরে
(গ) চুয়াড় বিদ্রোহের পরে
(ঘ) মুন্ডা বিদ্রোহের পরে

উত্তর: (গ) চুয়াড় বিদ্রোহের পরে

১.৭ ‘তারিকা-ই-মহম্মদীয়া’ কথাটির অর্থ হল –

(ক) খলিফা নির্দেশিত পথ
(খ) কাজি নির্দেশিত পথ
(গ) মহম্মদ নির্দেশিত পথ
(ঘ) কোরান নির্দেশিত পথ

উত্তর: (গ) মহম্মদ নির্দেশিত পথ

১.৮ মহাবিদ্রোহকে (১৮৫৭) ‘কৃষক বিদ্রোহ’ আখ্যা দিয়েছেন-

(ক) সুরেন্দ্রনাথ সেন
(খ) রমেশচন্দ্র মজুমদার
(গ) শশীভূষণ চৌধুরি
(ঘ) বিনায়ক দামোদর সাভারকর

উত্তর: (গ) শশীভূষণ চৌধুরি

১.৯ ‘মানুষ জন্ম থেকেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত।’- একথা বলেছেন –

(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) নন্দলাল বসু
(গ) স্বামী বিবেকানন্দ
(ঘ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

উত্তর: (গ) স্বামী বিবেকানন্দ

১.১০ ‘রাষ্ট্রগুরু’ নামে পরিচিত ছিলেন –

(ক) রামমোহন রায়
(খ) রাজনারায়ণ বসু
(গ) নবগোপাল মিত্র
(ঘ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

উত্তর: (ঘ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

১.১১ ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ (১৯০৬)-এর প্রথম সভাপতি ছিলেন –

(ক) রাসবিহারী ঘোষ
(খ) অরবিন্দ ঘোষ
(গ) তারকনাথ পালিত
(ঘ) সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

উত্তর: (ক) রাসবিহারী ঘোষ

১.১২ সন্দেশ পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন-

(ক) পঞ্চানন কর্মকার
(খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) কাঙাল হরিনাথ
(ঘ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

উত্তর: (ঘ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

১.১৩ একা আন্দোলন ঘটেছিল-

(ক) বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের পর্যায়ে
(খ) আইন অমান্য আন্দোলনের পর্যায়ে
(গ) অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের পর্যায়ে
(ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পর্যায়ে

উত্তর: (গ) অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের পর্যায়ে

১.১৪ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয় –

(ক) কানপুরে
(খ) আমেরিকায়
(গ) তাসখন্দে
(ঘ) লখনউতে

উত্তর: (গ) তাসখন্দে

১.১৫ বারদৌলি সত্যাগ্রহ হয়েছিল-

(ক) বোম্বাই-এ
(খ) পাঞ্জাবে
(গ) মাদ্রাজে
(ঘ) গুজরাটে

উত্তর: (ঘ) গুজরাটে

১.১৬ আজাদ হিন্দ ফৌজের নারীবাহিনীর প্রধান ছিলেন –

(ক) লক্ষ্মী স্বামীনাথন
(খ) রানি লক্ষ্মীবাঈ
(গ) অরুণা গঙ্গোপাধ্যায়
(ঘ) মায়া বন্দ্যোপাধ্যায়

উত্তর: (ক) লক্ষ্মী স্বামীনাথন

১.১৭ ‘নারী সত্যাগ্রহ সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল-

(ক) বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়
(খ) অসহযোগ আন্দোলনের সময়
(গ) আইন অমান্য আন্দোলনের সময়
(ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়

উত্তর: (গ) আইন অমান্য আন্দোলনের সময়

১.১৮ ভারতে দেবদাসী প্রথা বিলোপের জন্য বিল আনেন –

(ক) সরোজিনী নাইডু
(খ) মুথুলক্ষ্মী রেড্ডি
(গ) বি আর আম্বেদকর
(ঘ) বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত

উত্তর: (খ) মুথুলক্ষ্মী রেড্ডি

১.১৯ ‘অপারেশন পোলো’-র নেতৃত্ব দেন-

(ক) বল্লভভাই প্যাটেল
(খ) জে এন চৌধুরি
(গ) জওহরলাল নেহরু
(ঘ) ভি.পি মেনন

উত্তর: (খ) জে এন চৌধুরি

১.২০ ‘ছেড়ে আসা গ্রাম’ বইটির লেখক –

(ক) দক্ষিণারঞ্জন বসু
(খ) অন্নদাশঙ্কর রায়
(গ) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
(ঘ) কালীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

উত্তর: (ক) দক্ষিণারঞ্জন বসু

বিভাগ-খ

২. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ১৬টি প্রশ্নের উত্তর দাও)

উপবিভাগ ২.১ একটি বাক্যে উত্তর দাও:

২.১.১ কলকাতা মেডিকেল কলেজ কোন্ বছর প্রতিষ্ঠিত হয়?

উত্তর: কলকাতা মেডিকেল কলেজ ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়।

২.১.২ ছোটোনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন কবে পাস হয়?

উত্তর: ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন ১৯০৮ সালে পাস হয়।

২.১.৩ বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম চিত্রিত গ্রন্থের নাম লেখো। ME – ’19

উত্তর: বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম চিত্রিত গ্রন্থের নাম হলো ‘অন্নদামঙ্গল’।

২.১.৪ সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা কে ঘোষণা করেন?

উত্তর: সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা ঘোষণা করেন র‌্যামসে ম্যাকডোনাল্ড।

উপবিভাগ ২.২ ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো:

২.২.১ ‘নদীয়া কাহিনী’ গ্রন্থটি শহরের ইতিহাস-এর অন্তর্গত। ME-20

উত্তর: ভুল

২.২.২ শ্রীরামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ME – ’17

উত্তর: ভুল

২.২.৩ উপেনী সেনা গঠন করেছিলেন ভগিনী নিবেদিতা।

উত্তর: ভুল

২.২.৪ ভগিনী সেনা গঠন করেছিলেন ভগিনী নিবেদিতা।

উত্তর: ভুল

উপবিভাগ ২.৩ ‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও:

‘ক’ স্তম্ভ‘খ’ স্তম্ভ
২.৩.১ লর্ড আমহার্স্ট(১) জমিদার সভা ME-22
২.৩.২ দ্বারকানাথ ঠাকুর(২) নলিনী গুপ্ত
২.৩.৩ কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা(৩) বিনয় বসু
২.৩.৪ বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স(৪) সাধারণ জনশিক্ষা কমিটি ΜΕ -’24

উত্তর:

‘ক’ স্তম্ভ‘খ’ স্তম্ভ
২.৩.১ লর্ড আমহার্স্ট(৪) সাধারণ জনশিক্ষা কমিটি
২.৩.২ দ্বারকানাথ ঠাকুর(১) জমিদার সভা
২.৩.৩ কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা(২) নলিনী গুপ্ত
২.৩.৪ বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স(৩) বিনয় বসু

উপবিভাগ ২.৪ প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখা মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত করো ও নামাঙ্কিত করো:

২.৪.১ ভারতের বাণিজ্যনগরী
২.৪.২ কোল বিদ্রোহের এলাকা ছোটোনাগপুর ME-22 
২.৪.৩ গোয়ালিয়র
২.৪.৪ ডান্ডি

উপবিভাগ ২.৫ নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন করো:

২.৫.১. বিবৃতি: সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর অবদান সুদূরপ্রসারী।

ব্যাখ্যা ১: সন্ন্যাসী বিদ্রোহ অবলম্বনে বঙ্কিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস লিখেছিলেন।

ব্যাখ্যা ২: সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ঢাকা থেকে নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

ব্যাখ্যা ৩ : ভারতের প্রথম কৃষক বিদ্রোহ হিসেবে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ পরবর্তীকালে নানা বিদ্রোহের প্রেরণা ছিল।

উত্তর: ব্যাখ্যা ৩ : ভারতের প্রথম কৃষক বিদ্রোহ হিসেবে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ পরবর্তীকালে নানা বিদ্রোহের প্রেরণা ছিল।

২.৫.২ বিবৃতি: ব্রিটিশ সরকার আনন্দমঠ উপন্যাসটি নিষিদ্ধ করে।

ব্যাখ্যা ১: আনন্দমঠ উপন্যাসটি সাম্প্রদায়িকতার প্রসার ঘটায়।

ব্যাখ্যা ২: আনন্দমঠ উপন্যাসটি শিক্ষিত মানুষদের স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে।

ব্যাখ্যা ৩: আনন্দমঠ উপন্যাসে বন্দেমাতরম সংগীতটি থাকার জন্য।

উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: আনন্দমঠ উপন্যাসে বন্দেমাতরম সংগীতটি থাকার জন্য।

২.৫.৩ বিবৃতি: বারদৌলি সত্যাগ্রহ আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে।

ব্যাখ্যা ১: এটি ছিল কারখানার মালিক শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির একটি আন্দোলন।

ব্যাখ্যা ২ : এটি ছিল মূলত সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ধনী কৃষক শ্রেণি ও কৃষিশ্রমিকদের যৌথ আন্দোলন।

ব্যাখ্যা ৩: এটি ছিল ঋণ-দাস কৃষিশ্রমিকদের ধনী কৃষক শ্রেণির শোষণ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন।

উত্তর: ব্যাখ্যা ২ : এটি ছিল মূলত সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ধনী কৃষক শ্রেণি ও কৃষিশ্রমিকদের যৌথ আন্দোলন।

২.৫.৪ বিবৃতি : ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাস নাগাদ গোয়া ভারতভুক্ত হয়। ΜΕ -’24, ’20

ব্যাখ্যা ১: এর ফলে ভারতে বিদেশি শাসনের অবসান হয়।

ব্যাখ্যা ২: এর ফলে ভারতের সার্বভৌমত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

ব্যাখ্যা ৩ : এর ফলে ভারতের স্বাধীনতা লাভের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়।

উত্তর: ব্যাখ্যা ১: এর ফলে ভারতে বিদেশি শাসনের অবসান হয়।

বিভাগ-গ

৩. দুটি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (যে-কোনো ১১টি)

৩.১ ফোটোগ্রাফ কীভাবে আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চার উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়?

উত্তর: আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনায় ফোটোগ্রাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করে। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি (১৮৫০-এর দশক) থেকে শুরু করে ভারতীয় বিদ্রোহ (১৮৫৭), ব্রিটিশ শাসনের বিভিন্ন দৃশ্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক রীতিনীতি ও সাংস্কৃতিক আয়োজন ফোটোগ্রাফের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। পরবর্তীতে বিশ শতকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ নেতার কর্মকাণ্ড, এবং দেশভাগের বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো ফোটোগ্রাফে ধরা পড়ে। এই চিত্রগুলি ইতিহাসবেত্তাদের কাছে প্রত্যক্ষদর্শীর মতো সাক্ষ্য বহন করে এবং ইতিহাসের পুনর্নির্মাণে সহায়তা করে। ফোটোগ্রাফ কেবল ঘটনার তারিখ বা ব্যক্তির পরিচয়ই দেয় না, বরং তাৎপর্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমকালীন সামাজিক কাঠামো, রীতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, দাঁড়ানোর ভঙ্গি, ব্যক্তির মনোভাব ও শক্তির সম্পর্কও প্রকাশ করে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ আমলের ফোটোগ্রাফে উপনিবেশিক আধিপত্য ও ভারতীয়দের অবস্থান বোঝা যায়; স্বাধীনতা সংগ্রামের ছবিগুলোতে জনসাধারণের অংশগ্রহণ ও জাতীয়তাবাদী আবেগ ফুটে ওঠে। এভাবে ফোটোগ্রাফ দৃশ্য-ইতিহাস (Visual History) ও সামাজিক ইতিহাসচর্চার অত্যন্ত মূল্যবান উপাদানে পরিণত হয়েছে।

৩.২ সোমপ্রকাশ পত্রিকার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

উত্তর: সোমপ্রকাশ পত্রিকার বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ –

ভাষাগত বৈশিষ্ট্য – সোমপ্রকাশ পত্রিকা তৎকালীন প্রচলিত সাহেবি বাংলা, মৈথিলি বাংলা ও সংস্কৃত বাংলার প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে একটি বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল বাংলা ভাষার ব্যবহার চালু করে। এটি বাংলা গদ্যের বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং বাংলা ভাষাকে জনবান্ধব ও কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে।

সামাজিক সংস্কারমূলক বৈশিষ্ট্য – সোমপ্রকাশ ছিল একটি প্রগতিশীল পত্রিকা, যা তৎকালীন সমাজের বিভিন্ন কুপ্রথা ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। এটি বাল্যবিবাহ ও কৌলিন্য প্রথার তীব্র বিরোধিতা করত। পত্রিকাটি নারীশিক্ষার প্রসার এবং বিধবাবিবাহের প্রতি সমর্থন জোরালোভাবে প্রকাশ করত, যা তখনকার সমাজে অত্যন্ত সাহসী ও যুগান্তকারী ভূমিকা ছিল।

৩.৩ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী কেন স্মরণীয়?

উত্তর: বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী স্মরণীয় প্রধানত নিম্নোক্ত কারণে –

ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম আচার্য – তিনি ব্রাহ্মসমাজের একজন প্রভাবশালী নেতা ও আচার্য ছিলেন এবং ব্রাহ্মধর্মের আদর্শ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ধর্মীয় আদর্শের প্রচারক – তিনি প্রথমে ব্রাহ্মধর্ম ও পরবর্তীতে বৈষ্ণবধর্ম (নব্য বৈষ্ণববাদ) প্রচার করেন। বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ব্রাহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান তার উল্লেখযোগ্য কাজ।

প্রগতিশীল সমাজ গঠনের প্রচেষ্টা – তিনি কুসংস্কারমুক্ত ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে সচেষ্ট ছিলেন, যা তাকে সমাজ সংস্কারক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা দেয়।

সর্বোপরি, ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে তার অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন।

৩.৪ টীকা লেখো: ইয়ং বেঙ্গল।

উত্তর: সংজ্ঞা ও পরিচয় – ইয়ং বেঙ্গল ছিল উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতার হিন্দু কলেজের একদল প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তাসম্পন্ন বাঙালি ছাত্রের গোষ্ঠী। তারা তাদের অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর (Henry Louis Vivian Derozio) আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে উঠেছিল। এই যুবকেরাই ছিলেন বাংলার নবজাগরণ বা রেনেসাঁসের অগ্রদূত, যারা পাশ্চাত্য শিক্ষা, যুক্তিবাদ, মুক্তচিন্তা ও মানবতাবাদের আলোকে আলোকিত হয়েছিলেন।

ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন – ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনই হলো ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন। ফরাসি বিপ্লবের মতাদর্শ এবং পাশ্চাত্য দার্শনিকদের যুক্তিবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, তারা তৎকালীন হিন্দু সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, রক্ষণশীলতা ও সামাজিক কুপ্রথাগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। এই বিদ্রোহী আন্দোলনই ইতিহাসে ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন বা নব্য বঙ্গ আন্দোলন নামে পরিচিত।

প্রধান বৈশিষ্ট্য ও আদর্শ – ইয়ং বেঙ্গল দল যুক্তিকে সর্বোচ্চ স্থান দিত এবং অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের তীব্র বিরোধিতা করত। তারা সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি, যেমন বাল্যবিবাহ, জাতিভেদ, পর্দাপ্রথা ইত্যাদির বিরুদ্ধে সংস্কারের ডাক দিয়েছিল। তারা হিন্দুধর্মের গোঁড়া রীতিনীতির কঠোর সমালোচনা করত, যা সেই তখনকার সমাজে তাদেরকে বিতর্কিত ও “উগ্র পাশ্চাত্যবাদী” হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের পাশ্চাত্য আদর্শ তাদের চিন্তাজগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব – যদিও তাদের অনেক মতামত তখনকার সমাজের কাছে অতি-প্রগতিশীল ও গ্রহণযোগ্য মনে না হলেও, ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন বাংলায় যুক্তিবাদী চিন্তাধারার বীজ বপন করেছিল। তারা পরবর্তীকালে আসা সংস্কার আন্দোলনগুলোর (যেমন ব্রাহ্মসমাজ) পথ প্রশস্ত করেছিল এবং বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছে।

৩.৫ বারাসত বিদ্রোহ কী?

উত্তর: ১৮৩১ সালে তিতুমিরের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন, জমদার, নীলকর ও তাদের কর্মচারীদের শোষণ, অত্যাচার ও বাড়তি করের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ অর্থাৎ বারাসত বিদ্রোহ। চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাতের নারকেলবেড়িয়া গ্রামে তিতুমির একটি বাঁশের কেল্লা (বাঁশের দুর্গ) নির্মাণ করে এই বিদ্রোহের সূচনা করেন। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর ইংরেজ সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে তিতুমির নিহত হন এবং তার বাঁশের কেল্লা ধ্বংস হয়ে যায়। এই সংঘটটিই ইতিহাসে বারাসত বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

৩.৬ ওয়াহাবি আন্দোলনের লক্ষ্য ও আদর্শ কী ছিল?

উত্তর: ওয়াহাবি আন্দোলনের লক্ষ্য ও আদর্শ ছিল নিম্নরূপ –

ওয়াহাবি আন্দোলনের লক্ষ্য – ইসলামধর্মের মধ্যে প্রবেশ করা বিভিন্ন বিকৃতি দূর করে ধর্মের মৌলিক ও বিশুদ্ধ রূপটি পুনরুদ্ধার করা। ব্রিটিশ-শাসিত ভারতকে ‘দার-উল-হারব’ (বিধর্মীর দেশ) থেকে ‘দার-উল-ইসলাম’ (ইসলামী রাষ্ট্র বা ধর্মরাজ্য)-এ পরিণত করা।

ওয়াহাবি আন্দোলনের আদর্শ – আন্দোলনটির মূল আদর্শ ছিল একটি শুদ্ধিকরণ বা নবজাগরণ আন্দোলনের মাধ্যমে ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা। এটি ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করত, কারণ তাদের দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি বিধর্মী শক্তি যা ‘দার-উল-ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান বাধা।

৩.৭ নবগোপাল মিত্র কে ছিলেন? ME-’22

উত্তর: নবগোপাল মিত্র ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় নাট্যকার, কবি, প্রাবন্ধিক, দেশপ্রেমিক এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি ১৮৬৭ সালে ‘হিন্দু মেলা’ (পরবর্তীতে ‘জাতীয় মেলা’ নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

৩.৮ গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘বাংলা ব্যঙ্গচিত্রের জনক’ বলা হয় কেন?

উত্তর: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা শিল্পাঙ্গনে ব্যঙ্গচিত্রকে একটি শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর পূর্বে বাংলায় ব্যঙ্গচিত্র এতটা শিল্পসুষমা ও সামাজিক-রাজনৈতিক তীক্ষ্ণতা সহকারে উপস্থাপিত হয়নি। গগনেন্দ্রনাথ তাঁর ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনামলের ভারতীয় অভিজাত শ্রেণীর ভণ্ডামি, অন্ধানুকরণ এবং সামাজিক কুপ্রথাগুলোর নির্মম তবে রসাত্মক সমালোচনা করেছিলেন। ‘অদ্ভুতলোক’, ‘বিরূপ বজ্র’ ও ‘নব হুল্লোড়’ সিরিজের চিত্রগুলোয় তিনি তৎকালীন সমাজের বিদ্রূপাত্মক চিত্র ফুটিয়ে তোলেন। এভাবে, তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে আলাদাভাবে ব্যঙ্গচিত্রকে কৌতুকের স্তর থেকে উঠিয়ে সামাজিক সমালোচনার শিল্পিত হাতিয়ারে পরিণত করেন, যার জন্য তাঁকে বাংলা ব্যঙ্গচিত্রের পথিকৃৎ বা জনক হিসেবে গণ্য করা হয়।

৩.৯ ছাপা বই শিক্ষার প্রসারে কী ভূমিকা নিয়েছিল?

উত্তর: ছাপা বই শিক্ষাবিস্তারের পথকে সুগম করে তুলেছিল। ছাপাখানা স্থাপনের পর অত্যন্ত কম সময়ে বিপুল পরিমাণে পাঠ্যপুস্তক সস্তা দামে বাজারে আসতে থাকায় পাঠ্য বইয়ের অভাব দূর হয় এবং শিক্ষা বিস্তারের পথ সুগম হয়।

ছাপা বই শিশু শিক্ষার অগ্রগতিতে সাহায্য করেছিল। এক্ষেত্রে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশু শিক্ষা’, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ ১ম ভাগ ও ২য় ভাগ, রামসুন্দর বসাক রচিত ‘বাল্যশিক্ষা’, গোবিন্দ প্রসাদ দাসের ‘ব্যাকরণসার’ প্রভৃতি গ্রন্থ শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৩.১০ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন ভারতের প্রচলিত শিক্ষাকে প্রাণহীন বলেছেন?

উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের প্রচলিত ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রাণহীন বলেছেন মূলত নিম্নোক্ত কারণগুলোর জন্য –

সীমাবদ্ধতা ও বিচ্ছিন্নতা – রবীন্দ্রনাথের মতে, এই শিক্ষাব্যবস্থা একটি সীমিত গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিল। এটি শুধুমাত্র শহুরে একাংশ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারত, যারা মান ও অর্থ অর্জন করে সমাজের “শ্রেষ্ঠ শ্রেণিতে” পরিণত হতো। অন্যদিকে, দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে গ্রামবাসী, জ্ঞান ও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হতো এবং নানান সমস্যায় নিমজ্জিত থাকত। তিনি মনে করতেন, বিদেশি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান পাশ্চাত্যের চিন্তাধারা আত্মস্থ করার পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং শিক্ষার সুফল মুষ্টিমেয় কয়েকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে।

যান্ত্রিকতা ও সৃজনশীলতার অভাব – রবীন্দ্রনাথ এই শিক্ষাপদ্ধতিকে অত্যন্ত যান্ত্রিক বলে বিবেচনা করতেন। তাঁর মতে, এটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ও উদ্ভাবনী শক্তিকে ধ্বংস করে দেয় এবং তাদেরকে একটি নিষ্ক্রিয় যন্ত্রে পরিণত করে। মাতৃভাষার পরিবর্তে বিদেশি ভাষায় শিক্ষাদান শিশুর সহজাত জ্ঞানার্জনের ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। তিনি তাঁর নিজের স্কুলজীবনের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, শিক্ষার্থীরা জাদুঘরের নিথর বস্তুর মতো নিষ্ক্রিয় হয়ে শিক্ষকের বক্তব্য শুনত, যা তাদের মধ্যে কোনো প্রাণসঞ্চার করত না।

৩.১১ কৃষক আন্দোলনে বাবা রামচন্দ্রের কীরূপ ভূমিকা ছিল? ΜΕ -’24, ’19

উত্তর: কৃষক আন্দোলনে বাবা রামচন্দ্রের ভূমিকা –

নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিত্ব – বাবা রামচন্দ্র যুক্তপ্রদেশের (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) কৃষক আন্দোলনের একজন প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

কৃষকদের সংগঠিতকরণ – তিনি কৃষকদেরকে বেগারশ্রম, অতিরিক্ত কর, জমি থেকে উৎখাত এবং জমি বেদখলের মতো সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করেছিলেন।

আন্দোলনের সূচনা – তিনি কৃষকদের নিয়ে খাজনা বন্ধের আন্দোলন শুরু করেন।

৩:১২ তিনকাঠিয়া ব্যবস্থা কী?

উত্তর: “তিনকাঠিয়া ব্যবস্থা” ছিল ব্রিটিশ ভারতে বিহারের চম্পারণ জেলায় চাষীদের ওপর চাপানো এক জোরজুলুমমূলক নীলচাষ প্রথা। এই ব্যবস্থা অনুসারে, প্রত্যেক চাষীকে তাদের নিজস্ব জমির প্রতি বিঘার (২০ কাঠা) মধ্যে তিন কাঠা জমিতে বাধ্যতামূলকভাবে নীলচাষ করতে হতো। অর্থাৎ, তাদের মোট জমির ৩/২০ অংশে তারা নিজেদের জন্য খাদ্য শস্য উৎপাদন করতে পারত না, বরং নীলের চাষ করতে বাধ্য হতো। এরপর, সেই উৎপাদিত নীল চাষীদেরকে নীলকর ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের কাছে অত্যন্ত কম ও নির্দিষ্ট দামে বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো। এই শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই ১৯১৭ সালে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে চম্পারণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন সংঘটিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত এই তিনকাঠিয়া ব্যবস্থা বাতিল করতে বাধ্য করে।

৩.১৩ মাতঙ্গিনী হাজরা স্মরণীয় কেন? ΜΕ -’19

উত্তর: মাতঙ্গিনী হাজরা স্মরণীয় মূলত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অসামান্য সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মবলিদানের জন্য। ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময়, ৭৩ বছর বয়সী এই বিধবা নারী তমলুক থানা ঘেরাও অভিযানের পুরোভাগে ছিলেন। পুলিশের গুলি বিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি দিতে থাকেন এবং জাতীয় পতাকা দৃঢ়ভাবে ধরে রাখেন। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ তাঁকে ভারতের ইতিহাসে এক অমর বীরাঙ্গনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

৩.১৪ বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত কারণ কী ছিল?

উত্তর: বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত কারণ প্রশাসনিক সুবিধার আড়ালে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নিহিত ছিল। ব্রিটিশ সরকার বাংলাকে একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী অঞ্চল হিসেবে দেখত, যেখানে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। বিশেষ করে, বাংলায় স্বদেশী আন্দোলন ও ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্রিটিশ সরকার এ অঞ্চলের ঐক্য ভেঙে দিতে চেয়েছিল। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার বাংলার হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে, যাতে তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠনের ফলে মুসলমান প্রধান অঞ্চল তৈরি হয়, যেখানে হিন্দু প্রধান পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এটি ছিল “ভাগ করো ও শাসন করো” নীতির একটি অংশ, যা ব্রিটিশ শাসনকে মজবুত করতে সাহায্য করেছিল। সুতরাং, বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত কারণ ছিল বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনকে টিকিয়ে রাখা।

৩.১৫ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে ‘ভারতের লৌহমানব’ কেন বলা হয়? ΜΕ -’24, ’20

উত্তর: সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে ‘ভারতের লৌহমানব’ বা ‘আয়রন ম্যান অফ ইন্ডিয়া’ অভিহিত করা হয় মূলত তার দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং অটল মনোবলের জন্য। তার এই বিশেষণটি অর্জনের পিছনে মূল ভূমিকা পালন করে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যের (Princely States) শান্তিপূর্ণ ও সফল একত্রীকরণ বা Integration। এই বিশাল ও অত্যন্ত জটিল কাজটি তিনি তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং সময়ে সময়ে কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি কোনো ধরনের রক্তপাত বা বৃহৎ সংঘাত ছাড়াই প্রায় সমস্ত রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে রাজি করাতে সক্ষম হন। হায়দ্রাবাদ ও জুনাগড়ের মতো কয়েকটি রাজ্য সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে যোগ দিলেও, তা ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সুনিয়ন্ত্রিত। তার এই সাফল্য ভারতভূমিকে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিল এবং একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের পথ সুগম করেছিল। তার এই অপরিসীম দৃঢ়তা ও অধ্যবসায়ের কারণেই তিনি ইতিহাসে ‘লৌহমানব’ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

৩.১৬ উদ্বাস্তু সমস্যা বলতে কী বোঝায়? ME-’24

উত্তর: উদ্বাস্তু সমস্যা বলতে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে সৃষ্ট সেই মানবাধিকার বিধি সংকটকে বোঝায়, যখন ধর্মীয় ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক হিংসা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের পূর্বপুরুষ বাস্তুভিটার ছেড়ে বিপুল সংখ্যায় সীমান্ত পার হয়ে অন্য রাষ্ট্রে (ভারত থেকে পাকিস্তানে এবং পাকিস্তান থেকে ভারতে) আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এই মানুষরা তাদের বাড়িঘর, জমিজমা ও সম্পত্তি হারিয়ে সম্পূর্ণ সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়েন, ফলে একটি গভীর মানবাধিকার বিধি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়, যা ইতিহাসে উদ্বাস্তু সমস্যা নামে পরিচিত।

বিভাগ-ঘ

৪. সাত বা আটটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)

উপবিভাগ ঘ.১

৪.১ নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

উত্তর: ভূমিকা – ঐতিহ্যগত ইতিহাসচর্চা ছিল মূলত রাজা, মহান ব্যক্তি ও রাজবংশকেন্দ্রিক। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে, বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশক, ইতিহাসচর্চার এই ধারণায় আমূল পরিবর্তন আসে। একদল ঐতিহাসিক যুক্তি তুলে ধরেন যে, কোনো দেশের প্রকৃত ইতিহাস হলো তার সাধারণ জনগণের ইতিহাস। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইউরোপে যে নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চার সূচনা হয়, তা পরবর্তীতে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রসার লাভ করে। এই নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চার বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চার বৈশিষ্ট্যসমূহ –

সাধারণ মানুষের ইতিহাস – নতুন সামাজিক ইতিহাসের মূল বিষয়বস্তুই হলো সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, যাদের কথা এর আগের ইতিহাসে উপেক্ষিত ছিল। এটি রাজপরিবার ও শাসক শ্রেণির বদলে কৃষক, শ্রমিক, কারিগর, নারী, আদিবাসী ও সমাজের প্রান্তিক মানুষদের জীবনকাহিনিকে ইতিহাসের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসে।

বহুমাত্রিক বিষয়বস্তুর সমন্বয় – এই ইতিহাসচর্চায় কেবল রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জিই নয়, বরং মানুষের সামাজিক অবস্থান, আচার-ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, বিনোদন, শিক্ষা-সংস্কৃতি, জীবনযাপনের রীতি-নীতি, এমনকি তাদের মানসিকতা ও বিশ্বাসও ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।

অ্যানালস্ ঐতিহ্যের প্রভাব – ফ্রান্সের ‘অ্যানালস্’ স্কুল অফ হিস্টরি এই ইতিহাসচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মার্ক ব্লখ, লুসিয়েন ফেব্র্ ও ফের্নান ব্রোদেলের মতো ঐতিহাসিকগণ দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক কাঠামো ও প্রক্রিয়ার (যেমন- নগরায়ণ, শিল্পায়ন, পরিবারের গঠন, সামাজিক গতিশীলতা) উপর জোর দেন। তাদের মতে, ইতিহাস শুধু যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস নয়, এটি সমাজের গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত পরিবর্তনের ইতিহাস।

নিম্নবর্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি – এটি নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে। রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্র, শাহিদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ দেখিয়েছেন কিভাবে উপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চা থেকে সমাজের নিম্নবর্গীয় (অন্ত্যজ, আদিবাসী, প্রান্তিক কৃষক) মানুষের ভূমিকা ও সচেতনতা সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়ে গিয়েছিল। নিম্নবর্গীয় গবেষণা এই সব মানুষের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংগ্রামের ইতিহাস উন্মোচন করে।

আন্তঃশাস্ত্রীয় পদ্ধতির ব্যবহার – নতুন সামাজিক ইতিহাস রচনার জন্য ঐতিহাসিকগণ নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সাহিত্য ও মনস্তত্ত্ববিদ্যার মতো বিভিন্ন শাস্ত্রের তত্ত্ব ও পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এই আন্তঃশাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসের বোঝাপড়াকে আরও সমৃদ্ধ ও গভীর করেছে।

স্থানীয় ও আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ – এই ইতিহাসচর্চা বৃহৎ রাষ্ট্রীয় কাহিনির বদলে স্থানীয় ও আঞ্চলিক ইতিহাস, স্থানীয় দলিলপত্র, মৌখিক সাক্ষ্য এবং লোককাহিনির উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করে। এর ফলে স্থানীয় সমাজের নিজস্ব গতিশীলতা ও বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে।

সংস্কৃতি ও মানসিকতার ইতিহাস – নতুন সামাজিক ইতিহাস শুধু বস্তুগত অবস্থাই নয়, মানুষের চিন্তা-ভাবনা, বিশ্বাস, মানসিকতা (Mentalities) এবং সাংস্কৃতিক অভ্যাসের ইতিহাস নিয়েও আলোচনা করে। এটি বিশ্লেষণ করে যে কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়কাল-এ মানুষ তাদের জগৎকে অনুভূত করত।

উপসংহার – নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চা ইতিহাসের পরিধিকে বিপুলভাবে প্রসারিত করেছে। এটি ইতিহাসকে একান্তভাবে ‘উপরিতলার’ ঘটনার বর্ণনা না রেখে সমাজের ‘নিচুতলার’ মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিলে পরিণত করেছে। এর মাধ্যমে ইতিহাসচর্চা একটি সর্বাঙ্গীন ও গণতান্ত্রিক রূপ লাভ করেছে, যা কিনা অতীতকে বুঝতে আমাদের জন্য একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।

৪.২ দুটি উদাহরণের সাহায্যে আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদানরূপে আত্মজীবনীমূলক রচনার ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: ইতিহাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আত্মজীবনীমূলক রচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উপাদান। এটি কেবলমাত্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণই নয়, বরং তা সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতকে বুঝতে অমূল্য সূত্র প্রদান করে। আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনায় এর ভূমিকা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নিম্নে দুটি উদাহরণের সাহায্যে এটি বিশ্লেষণ করা হল –

জওহরলাল নেহেরুর ‘অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ (An Autobiography) –

জওহরলাল নেহেরুর আত্মজীবনী কেবল তাঁর ব্যক্তিগত গল্প নয়, এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি প্রামাণ্য দলিল। এই রচনার মাধ্যমে আমরা যে ঐতিহাসিক উপাদানগুলি পাই –

জাতীয় আন্দোলনের অন্তর্দৃষ্টি – এই বইটি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, বিভিন্ন নেতার মধ্যে মতপার্থক্য, এবং গান্ধীজির নেতৃত্বের প্রতি নেহেরুর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়া দেয়। এটি আমাদের দেখায় কীভাবে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ভিন্নমত ও কৌশলগত বিতর্কের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।

একজন জাতীয়তাবাদীর মানসিক বিবর্তন – নেহেরুর লেখায় তাঁর আদর্শগত রূপান্তর স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে – একজন উদারপন্থী মানবতাবাদী থেকে সমাজতান্ত্রিক চিন্তায় প্রবেশ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে তাঁর অটল বিশ্বাস এবং আধুনিক ভারতের জন্য তাঁর দর্শন (“আধুনিকতার ধর্ম”)। এটি আমাদের শুধু ঘটনার তারিখই জানায় না, বরং সেই ঘটনাগুলিকে চালিত করা চিন্তাভাবনাকেও বুঝতে সাহায্য করে।

সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রসঙ্গ – বইটিতে ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক শোষণ, কৃষকদের দুরবস্থা এবং ভারতের দারিদ্র্যের চিত্র বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। এটি ঐ সময়ের ভারতের একটি সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপন করে।

বাবা সাএব আম্বেদকরের ‘ওয়েটিং ফর আ ভিসা’ (Waiting for a Visa) –

ড. ভীমরাও আম্বেদকরের এই আত্মজীবনীমূলক রচনা, যদিও সংক্ষিপ্ত, তা হল ভারতের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী উৎস। এটি শুধু একজন ব্যক্তির সংগ্রামের গল্প নয়, বরং সমগ্র অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের যন্ত্রণার একটি প্রতিনিধিত্বমূলক দলিল।

বর্ণব্যবস্থার বাস্তব চিত্র – এই রচনায় বর্ণিত ব্যক্তিগত ঘটনাগুলি (যেমন স্কুলে পানির পাত্র স্পর্শ করতে না পারা, ঘোড়ার গাড়ি চালক হওয়া সত্ত্বেও গাড়ি চালানোর অনুমতি না পাওয়া) ব্রিটিশ দলিল বা সরকারি রিপোর্টে পাওয়া যায় না। এটি সরাসরি বর্ণবৈষম্যের নির্মম বাস্তবতাকে উন্মোচিত করে।

সামাজিক ইতিহাসের উৎস – এটি ঐতিহাসিকদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান কারণ এটি শাসক শ্রেণির নয়, বরং একটি নিপীড়িত সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। এটি “উপরে থেকে দেখা ইতিহাস”-এর বিপরীতে “নিচে থেকে দেখা ইতিহাস” বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক।

আম্বেদকরের রাজনৈতিক চেতনার উৎস – এই আত্মজীবনী থেকে বোঝা যায় কেন আম্বেদকর সংবিধানে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার অধিকারের উপর এত জোর দিয়েছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই তাঁর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চিন্তাভাবনার ভিত্তি তৈরি করেছিল।

উপসংহার – উপর্যুক্ত উদাহরণ দুটি থেকে স্পষ্ট যে, আত্মজীবনীমূলক রচনা আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার একটি অপরিহার্য উপাদান। এটি শুধু তথ্যই সরবরাহ করে না, সেই তথ্যকে একটি মানবিক ও আবেগপূর্ণ প্রেক্ষিত দেয়। এটি আমাদেরকে কেবলমাত্র “কী ঘটেছিল” তা নয়, বরং “কেন ঘটেছিল” এবং “সেটা অভিজ্ঞকারী মানুষের কাছে কেমন লাগছিল” তা বুঝতে সাহায্য করে। এই রচনাগুলি ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে ত্রিমাত্রিক রূপ দান করে এবং ইতিহাসকে শুষ্ক তথ্যের সমাহার না হয়ে জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিক করে তোলে।

উপবিভাগ ঘ.২

৪.৩ সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের কারণগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের কারণ নিম্নে আলোচনা করা হল –

ভূমিকা – মুঘল যুগের শেষদিকে ভারতের বিভিন্ন ভ্রাম্যমান সন্ন্যাসী ও ফকির সম্প্রদায় বাংলা ও বিহারের নানা অংশে স্থায়ীভাবে বসবাস করত। ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ‘গিরি’ ও ‘দশনামী’ সম্প্রদায়ভুক্ত সন্ন্যাসী এবং ‘মাদারি’ সম্প্রদায়ভুক্ত ফকিরদের নেতৃত্বে যে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল, তা সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহের পিছনে নিম্নলিখিত কারণগুলি বিশেষভাবে দায়ী ছিল –

রাজস্বের চাপ – ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উচ্চহারে রাজস্ব বৃদ্ধি করায় কৃষিজীবী সন্ন্যাসী ও ফকিররা করভারে জর্জরিত হয়ে পড়ে। এছাড়াও, কোম্পানির কর্মচারীরা প্রায়ই ব্যবসায়ী সন্ন্যাসী-ফকিরদের কাছ থেকে রেশম বা রেশমজাত পণ্য বলপূর্বক ছিনিয়ে নিত, যা তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়।

ইজারাদারি শোষণ – সন্ন্যাসী-ফকিরদের একটি বড়ো অংশ কৃষিজীবী ছিল। কোম্পানির ইজারাদাররা অধিক খাজনা আদায়ের জন্য এদের ওপর চরম শোষণ চালাত, যা কৃষকদের ক্ষিপ্ত করে তোলে।

তীর্থকর আরোপ ও ধর্মীয় বিধিনিষেধ – সন্ন্যাসীরা নিয়মিত দলবদ্ধভাবে তীর্থযাত্রা করত। ব্রিটিশ সরকার তাদের ওপর তীর্থকর ধার্য করে এবং ফকিরদের দরগায় যেতেও বাধা দেয়। এটি তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে অনুভূত হয়।

শারীরিক নির্যাতন ও হত্যা – ব্রিটিশ সরকার ও তাদের এজেন্টরা সন্ন্যাসী ও ফকিরদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাত এবং অনেকক্ষেত্রে নির্মমভাবে হত্যা করত।

জমিদারদের আর্থিক অবস্থার বিপন্নতা – পূর্বে সন্ন্যাসী-ফকিররা জমিদারদের কাছ থেকে নিয়মিত দান বা অর্থসাহায্য পেত। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার জমিদারদের ওপর অতিরিক্ত কর চাপালে তাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে জমিদাররা আর আগের মতো সাহায্য করতে পারতেন না। এর ফলে সন্ন্যাসী-ফকিরদের জীবনযাত্রা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠলে তারা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।

অর্থনৈতিক অবরোধ – সন্ন্যাসী-ফকিররা একস্থান থেকে অন্যস্থানে ভ্রমণ করে এবং বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য করত। ব্রিটিশ শাসন তাদের এই চলাচলের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করে, যা তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করে।

উপসংহার – এই সমস্ত কারণগুলি একত্রিত হয়ে একটি বিস্তৃত কৃষক-বিদ্রোহের রূপ নেয়, যা সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ নামে ইতিহাসে পরিচিত। এটি ছিল মূলত ব্রিটিশ শাসন ও তাদের অর্থনৈতিক শোষণ নীতির বিরুদ্ধে একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া।

৪.৪ টীকা লেখো: ফরাজি আন্দোলন।

উত্তর: ভূমিকা – উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলায় সংঘটিত ফরাজি আন্দোলন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও আর্থ-সামাজিক আন্দোলন। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে হাজি শরিয়তউল্লাহ এই আন্দোলনের সূচনা করেন। “ফরাজি” শব্দের অর্থ “ইসলামের বাধ্যতামূলক কর্তব্য”।

উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য – ইসলামের মৌলিক ও বিশুদ্ধ আদর্শ পুনরুদ্ধার করা। ব্রিটিশ শাসিত ভারতকে “দার-উল-হারব” (শত্রু-অধিকৃত এলাকা) ঘোষণা করে এটিকে “দার-উল-ইসলাম” (শান্তির এলাকা)-এ রূপান্তরিত করা। অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।

বিস্তার – হাজি শরিয়তউল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দুদু মিয়া (মুহাম্মদ মুহসিন) আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি “ফরাজি-ই-খিলাফত” নামে একটি সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তোলেন এবং বাংলাকে বিভিন্ন “হল্কা” (জেলা)-এ বিভক্ত করে প্রতিটিতে একজন “খলিফা” নিয়োগ করেন। লক্ষাধিক কৃষক, কারিগর ও যুবক এই আন্দোলনে যোগ দেয়।

দুদু মিয়ার ভূমিকা – দুদু মিয়া জমিদারি প্রথার বিরোধিতা করেন এবং ঘোষণা করেন, “জমি আল্লাহর দান, তাই জমির উপর কর্তৃত্ব মানুষের নয়”। তাঁর নেতৃত্বে ফরাজিরা জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালায়।

দমন ও পতন – ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৭ সালে দুদু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে এবং ১৮৬২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে।

মূল্যায়ন – ফরাজি আন্দোলন ছিল ধর্মীয় আবরণে একটি কৃষক-বিদ্রোহ। ড. অভিজিৎ দত্ত-এর মতে, এটি “জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি পূর্ণরূপ”।

উপসংহার – ফরাজি আন্দোলন বাংলার কৃষক সমাজের স্বাধিকার চেতনা ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের এক অগ্রগামী অধ্যায়।

উপবিভাগ ঘ.৩

৪.৫ শ্রীরামপুর মিশন প্রেস কীভাবে একটি অগ্রণী মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল? ΜΕ -’18

উত্তর: শ্রীরামপুর মিশন প্রেস একটি অগ্রণী মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পেছনে নিম্নলিখিত কারণগুলি উল্লেখযোগ্য –

প্রতিষ্ঠাতাদের দূরদৃষ্টি ও উদ্যোগ – ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরি, জোশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ড – এই ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’র যৌথ উদ্যোগে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় এটি এশিয়ার বৃহত্তম ছাপাখানায় পরিণত হয়।

বহুভাষিক ও ব্যাপক মুদ্রণ কর্মসূচি – এই প্রেস থেকে বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দি, অসমিয়া, ওড়িয়া, মারাঠি সহ মোট ৪৫টি ভাষায় ২,১২,০০০-এরও বেশি বই মুদ্রিত হয়, যা তৎকালীন বিশ্বে একটি রেকর্ডসৃষ্টিকারী অর্জন ছিল।

বৈচিত্র্যময় প্রকাশনা –

  1. ধর্মীয় গ্রন্থ – বাইবেলের বাংলা ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ।
  2. প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য – রামায়ণ, মহাভারত, হিতোপদেশ, বত্রিশ সিংহাসন।
  3. পাঠ্যপুস্তক – স্কুল বুক সোসাইটি ও ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের বই।
  4. সংবাদপত্র – প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক ‘সমাচার দর্পণ’ ও প্রথম বাংলা মাসিক ‘দিগদর্শন’।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ – পঞ্চানন কর্মকারের মতো দক্ষ কর্মীদের যুক্ত হওয়ায় ছাপার কাজে গতি ও মান দুই বৃদ্ধি পায়।

শিক্ষা ও সমাজসচেতনতা প্রসার – সুলভ মূল্যে বা বিনামূল্যে বই বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে সমাজসচেতনতা সৃষ্টি – এই দ্বৈত ভূমিকার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। এই সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই শ্রীরামপুর মিশন প্রেস কেবল একটি ছাপাখানা না থেকে একটি অগ্রণী সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

৪.৬ টীকা লেখো: কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ।

উত্তর: ভূমিকা – কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ হল কলকাতার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিজ্ঞান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯১৪ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এই নামেই পরিচিতি লাভ করে।

প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা – ১৯১৪ সালের ২৭ মার্চ কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।

প্রতিষ্ঠায় অন্যান্যদের অবদান – এই কলেজ প্রতিষ্ঠায় অন্যান্য ব্যক্তিবর্গও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। ব্যারিস্টার স্যার তারকনাথ পালিত ও ব্যারিস্টার স্যার রাসবিহারী ঘোষ সাড়ে সাঁত্রিশ লক্ষ টাকা ও জমি দান করেন। মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী পদার্থবিদ্যা বিভাগের যন্ত্রপাতি দান করেন। এছাড়াও রানি বাগেশ্বরী ও গুরুপ্রসাদ সিং অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান করেন।

পঠনপাঠন – পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যা প্রভৃতি বিষয় এখানে পড়ানো হত। ১৯১৫ সালে রসায়ন বিভাগ, ১৯১৬ সালে বিশুদ্ধ পদার্থবিদ্যা ও ফলিত গণিত বিভাগ, ১৯১৮ সালে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ এবং ১৯১৯ সালে প্রাণীবিদ্যা বিভাগ চালু হয়। এই কলেজের শিক্ষকতা করেছেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সি. ভি. রমন, মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো খ্যাতনামা বিজ্ঞানীরা। মেধাবী ছাত্রদের জন্য বৃত্তিরও ব্যবস্থা ছিল।

উপসংহার – ভারতবর্ষে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ও বিকাশে কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ এক অগ্রণী ও পথপ্রদর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

উপবিভাগ ঘ.৪

৪.৭ কীভাবে হায়দরাবাদ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল?

উত্তর: ভূমিকা – হায়দরাবাদ ছিল একটি বৃহৎ দেশীয় রাজ্য, যার অধিকাংশ জনগণ হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও শাসক ছিলেন মুসলিম নিজাম। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর, ভারত সরকার হায়দরাবাদকে ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নিজামের কাছে প্রস্তাব দেয়। কিন্তু নিজাম ওসমান আলি খান স্বাধীন রাজ্য হিসেবে থাকতে চেয়েছিলেন, যা ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল।

নিজামের কার্যকলাপ – নিজাম মজলিস-ইত্তিহাদ-উল-মুসলিমিন নামক একটি উগ্র সংগঠনের নেতা কাশিম রিজভির প্রভাবে পড়েন। তিনি রাজাকার নামে একটি সশস্ত্র দাঙ্গাবাহিনী গঠন করেন, যা হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চালাতে থাকে। পাকিস্তান থেকে অস্ত্র সাহায্য পেয়ে এই বাহিনী শক্তিশালী হয় এবং রিজভি মুসলিমদের জেহাদের ডাক দেন।

হায়দরাবাদে বিদ্রোহ – ১৯৪৬ সাল থেকেই নিজামের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তেলেঙ্গানার কৃষকরা আন্দোলন শুরু করে। ১৯৪৭ সালের ৭ আগস্ট হায়দরাবাদ রাজ্য কংগ্রেস সরকারের গণতন্ত্রীকরণের দাবিতে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করে, যার ফলে নিজাম ২০ হাজার সত্যাগ্রহীকে বন্দি করেন এবং পরিস্থিতি আরও সংঘাতময় হয়ে ওঠে।

হায়দরাবাদের ভারতভুক্তি – পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত সরকার নিজামকে চরমপত্র দেয় এবং রাজাকার বাহিনী ভেঙে দেওয়ার দাবি জানায়। নিজাম ভারতের দাবি প্রত্যাখ্যান করলে, ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দরাবাদে প্রবেশ করে এবং ১৮ সেপ্টেম্বর রাজ্যটি দখল করে নেয়। ১৯৪৯ সালে নিজাম ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি হায়দরাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অংশ হয়।

মূল্যায়ন – হায়দরাবাদের ভারতভুক্তি ভারতের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য ছিল। এই ঘটনাকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার জয় হিসেবেও দেখা হয়, কারণ হায়দরাবাদ ও অন্যান্য অঞ্চলের অনেক মুসলমানও নিজামের শাসনের বিরোধিতা করে ভারত সরকারকে সমর্থন করেছিলেন।

৪.৮ ভারত সরকার কীভাবে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত করার প্রশ্নটি সমাধান করেছিল?

উত্তর: সূচনা – ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে মন্ত্রীমিশনের প্রস্তাবে দেশীয় রাজ্যগুলির সমবায়ে ইউনিয়ন গঠনের কথা বলা হয় এবং সেই ইউনিয়নে যোগদান স্বেচ্ছাধীন করা হয়। এর ফলে অনেক দেশীয় রাজ্য স্বাধীন থাকার মনস্থ করায়, ভারতভুক্তি সংক্রান্ত জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়।

দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্তি প্রক্রিয়া –

সংযুক্তি দলিলের মাধ্যমে অধিকাংশ রাজ্যের অন্তর্ভুক্তি – এই সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সহযোগিতায় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং স্বরাষ্ট্রসচিব ভি. পি. মেনন একটি কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিযান চালান। তারা ‘সংযুক্তি দলিল’ (Instrument of Accession) -এর মাধ্যমে বেশিরভাগ দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নে যুক্ত করতে সক্ষম হন। এই প্রক্রিয়ায় কূটনীতি, প্রলোভন এবং কখনও কখনও হুমকির সমন্বয় করা হয়। তবে জুনাগড়, হায়দরাবাদ ও কাশ্মীর-সহ কয়েকটি রাজ্য এই প্রাথমিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

জুনাগড়ের ভারতভুক্তি – ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট জুনাগড়ের নবাব পাকিস্তানে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলে, ভারতীয় সরকার এটি মেনে নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার প্যাটেলের নির্দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী জুনাগড় দখল করে নেয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এক গণভোটের মাধ্যমে জুনাগড়ের জনগণ ভারতের পক্ষে রায় দেন এবং এটি ভারতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়।

হায়দরাবাদের ভারতভুক্তি – হায়দরাবাদের নিজাম তার স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাইলে, ভারত সরকার এটি মেনে নেয়নি। নিজাম ভারত সরকারের আল্টিমেটাম উপেক্ষা করলে, ‘অপারেশন পোলো’ নামক সামরিক অভিযান চালানো হয়। প্যাটেলের নির্দেশে জেনারেল জয়ন্তনাথ চৌধুরীর নেতৃত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দরাবাদে প্রবেশ করে এবং ১৯৪৮ সালের ১৩ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংঘটিত সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে নিজাম বাহিনীকে পরাজিত করে। এরপর হায়দরাবাদ ভারতভুক্ত হয়।

কাশ্মীরের ভারতভুক্তি – কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং প্রাথমিকভাবে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান-সমর্থিত উপজাতি বাহিনী কাশ্মীরে আক্রমণ করলে, তিনি ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করেন। এই শর্তে সাহায্য দেওয়া হয় যে, তাকে ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করতে হবে। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর মহারাজা হরি সিং ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে প্রবেশ করে। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি হলে কাশ্মীরের একটি অংশ (এক-তৃতীয়াংশ) পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, যা ‘আজাদ কাশ্মীর’ নামে পরিচিত। এভাবে নিয়ন্ত্রণ রেখা (LOC) সৃষ্টি হয়।

উপনিবেশগুলির অন্তর্ভুক্তি – ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে থাকা ইউরোপীয় উপনিবেশগুলিও ধাপে ধাপে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫৪ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে ফরাসি উপনিবেশগুলি (পন্ডিচেরি, কারাইকাল, ইয়ানাম, মাহে এবং চন্দননগর) ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যদিকে, পর্তুগিজ উপনিবেশ গোয়া, দমন ও দিউ ১৯৬১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন বিজয়’-এর মাধ্যমে মুক্ত হয়ে ভারতভুক্ত হয়।

উপসংহার – এইভাবে, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের দৃঢ় নেতৃত্ব, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ভি. পি. মেননের কূটনৈতিক দক্ষতার ফলে অসংখ্য দেশীয় রাজ্য ও উপনিবেশকে ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়। তাদের এই ঐতিহাসিক অবদান ভারতকে একটি ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

বিভাগ-ঙ

৫. পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে যে-কোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর দাও :

৫.১ নীল বিদ্রোহের কারণ ও গুরুত্ব বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: ভূমিকা – উনিশ শতকের বাংলার কৃষক-সমাজের ইতিহাসে নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০) একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলার নীলচাষিরা নীলকর ইউরোপীয় সাহেবদের অত্যাচার, শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে যে সংগঠিত বিদ্রোহের সূচনা করেছিল, তা ইতিহাসে নীল বিদ্রোহ নামে খ্যাত।

নীল বিদ্রোহের কারণ –

নীল বিদ্রোহের পিছনে নীলকর সাহেবদের শোষণ ও অত্যাচারই ছিল মুখ্য কারণ। নিম্নলিখিত কারণগুলি এই বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছিল –

নীলকর সাহেবদের অত্যাচার – নীলকররা চাষিদের ওপর চরম অত্যাচার করত। যারা নীলচাষ করতে অস্বীকার করত, তাদের তারা নীলকুঠিতে বন্দি করে রাখত, মারধর করত, লাঞ্ছিত করত এবং কৃষি সরঞ্জাম লুট করত। অনেক সময় চাষিদের ঘরবাড়ি ও ফসলের গোলায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হত। এই সব অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে চাষিরা শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ করতে বাধ্য হয়।

দাদন প্রথা – নীলকররা চাষিদের একটি ক্ষুদ্র অগ্রিম অর্থ (দাদন) দিত, যা পরে এক ভয়ঙ্কর ফাঁদে পরিণত হয়। এই দাদন গ্রহণের ফলে চাষিরা নীলকরদের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ত এবং তাদের সবচেয়ে উর্বর জমিতে নীলচাষ করতে বাধ্য হত। একবার দাদন নিলে চাষিরা আর নীলচাষ থেকে মুক্তি পেত না। এমনকি জোর করে গরু-বলদ বন্ধক রেখেও দাদন নেওয়ার ঘটনা ঘটত।

ব্রিটিশ সরকারের আইন – ১৮৩০ সালের “পঞ্চম আইন” ও “সপ্তম আইন” চাষিদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ছিল। এই আইন অনুযায়ী, দাদন নিয়ে নীলচাষ না করলে চাষিদের জেল ও জরিমানা হতে পারত। পরবর্তীতে “একাদশ আইন” পাস করে বলা হয়, নীলচাষ না করলে চাষিদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই আইনগুলি নীলকরদের অত্যাচারকে বৈধতা দিয়েছিল।

নীলচাষিদের প্রতি বিচারবিভাগীয় পক্ষপাত – নীলচাষিরা যখন নীলকরদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করত, তখন তারা কোনো ন্যায়বিচার পেত না। আদালত, পুলিশ ও প্রশাসন – সবই নীলকরদের পক্ষে থাকত। এই অবস্থায় চাষিদের কাছে বিদ্রোহই একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।

নেতৃত্বের ভূমিকা – দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাসের মতো স্থানীয় নেতাদের নেতৃত্বে নীলচাষিরা সংগঠিত হয়ে ওঠে এবং বিদ্রোহের ডাক দেয়।

নীল বিদ্রোহের গুরুত্ব –

নীল বিদ্রোহ কেবলমাত্র একটি কৃষক-বিদ্রোহই ছিল না, এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম।

নীল কমিশন গঠন – বিদ্রোহের তীব্রতায় ব্রিটিশ সরকার ১৮৬০ সালের ৩১ ডিসেম্বর “নীল কমিশন” গঠন করে। এই কমিশন নীলকরদের অত্যাচার ও শোষণের কথা স্বীকার করে এবং নীলচাষের অনিয়মের কথা প্রকাশ করে।

সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের সূচনা – নীল বিদ্রোহ ছিল বাংলার প্রথম সফল ও সংগঠিত কৃষক-বিদ্রোহ। এটি প্রমাণ করেছিল যে সংঘবদ্ধ শক্তি নিয়েই কোনো বড় শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব।

স্বতঃস্ফূর্ত গণবিদ্রোহ – এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন ছিল, যেখানে সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যোগ দিয়েছিলেন।

বাঙালির মনোবল বৃদ্ধি – নীল বিদ্রোহের সাফল্য বাংলার মানুষ, বিশেষত কৃষক সমাজের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল বৃদ্ধি করেছিল। এটি পরবর্তীকালের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করে।

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশগ্রহণ – হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্রের “নীল দর্পণ” নাটক এবং অমৃতবাজার পত্রিকার মতো সংবাদপত্র এই আন্দোলনে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক প্রভাব – দীনবন্ধু মিত্রের “নীল দর্পণ” নাটক নীলচাষিদের বেদনার কথা জনসমক্ষে তুলে ধরে এবং ইংরেজি অনুবাদ হওয়ায় আন্তর্জাতিক স্তরেও আলোড়ন সৃষ্টি করে।

উপসংহার – নীল বিদ্রোহ ছিল বাংলার কৃষকদের আত্মমর্যাদা ও অধিকার রক্ষার প্রথম সফল সংগ্রাম। এটি কেবল নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ ছিল না, বরং এটি বাংলার জনগণের মধ্যে স্বাধীনচেতা আন্দোলনের বীজ বপন করেছিল। অমৃতবাজার পত্রিকার ভাষায়, “নীল বিদ্রোহ অর্ধমৃত বাঙালির শিরায় স্বাধীনতার উষ্ণ শোণিত প্রবাহিত করেছিল।”

৫.২ উনিশ শতকে বাংলার বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশ আলোচনা করো।

উত্তর: ভূমিকা – ঊনবিংশ শতকে বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশ একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিক প্রয়োজন ও আধুনিকতার প্রভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের পথ সুগম হয়, কিন্তু ক্রমশ তা জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষে এবং একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রেরণা জোগায়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রচিত হতে থাকে।

বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান –

ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স (IACS) – ১৮৭৬ সালে ড. মহেন্দ্রলাল সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত IACS ছিল ভারতের প্রথম বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় ছাত্র-গবেষকদের জন্য বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করা। প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞানের জনপ্রিয় বক্তৃতা ও গবেষণামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করত। এর নিজস্ব পত্রিকা ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ফিজিক্স’ গবেষণাপত্র প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। সিভি রমন এখানেই তার যুগান্তকারী ‘রমন এফেক্ট’ আবিষ্কার করেন, যার জন্য তিনি ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, কে. এস. কৃষ্ণান প্রমুখ খ্যাতনামা বিজ্ঞানী এখানে গবেষণা করেছেন।

কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ – ১৯১৪ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ও তারকনাথ পালিত, রাসবিহারী ঘোষ প্রমুখের আর্থিক সহায়তায় এই কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় শিল্পোদ্যোগী হিসেবে বেঙ্গল কেমিক্যালস প্রতিষ্ঠা করে দেশকে স্বনির্ভরতার পথ দেখান। সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহার মতো বিজ্ঞানীরা এখান থেকেই উঠে এসে জাতীয় গঠনমূলক কাজে অংশ নেন।

বসু বিজ্ঞান মন্দির – ১৯১৭ সালে স্যার জগদীশচন্দ্র বসু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই ইনস্টিটিউটের মূল লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণাকে উৎসাহিত করা এবং তার সুফল সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। তিনি তার স্বনির্মিত ‘ক্রেসকোগ্রাফ’ যন্ত্রের মাধ্যমে উদ্ভিদের প্রাণ ও অনুভূতি থাকার বিষয়টি প্রমাণ করেন। রেডিও তরঙ্গ সংক্রান্ত তার গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ও এর অধীন প্রতিষ্ঠান – ১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষা পরিষদ একটি স্বদেশী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেয়। এই পরিষদের অধীনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে –

  1. বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ – ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে জাতীয়তাবাদী আদর্শে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হত। অরবিন্দ ঘোষ এর প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।
  1. বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) – ১৯০৬ সালে তারকনাথ পালিত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত BTI-তে যন্ত্রবিজ্ঞান, ফলিত রসায়ন ও ভূবিদ্যার মতো কারিগরি বিষয়ে শিক্ষাদান করা হত। প্রমথনাথ বসু এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় – ১৯১০ সালে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ এবং BTI একত্রিত হয়ে যে সংস্থার জন্ম দেয়, তা পরবর্তীকালে ১৯৫৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এটি ভারতের কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

উপসংহার – ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতকের সূচনালগ্নে প্রতিষ্ঠিত IACS, কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ, বসু বিজ্ঞান মন্দির এবং জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলির হাত ধরে বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ভিত রচিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলি কেবল জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাই করেনি, জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শাণিত করে এবং একদল মেধাবী বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করে, যাদের উত্তরসূরিরাই পরবর্তীতে ভারতকে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন।

৫.৩ বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে নারীসমাজ কীভাবে অংশগ্রহণ করেছিল? তাদের আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা কী? ME – ’19

উত্তর: ভূমিকা – ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ব্যাপক আন্দোলনে বাংলার নারীসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। গৃহকোণ থেকে বেরিয়ে তারা এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা –

প্রতীকী প্রতিবাদ ও জনসচেতনতা –

অরন্ধন ও রাখীবন্ধন – রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে ‘অরন্ধন দিবস’ পালন এবং রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে ‘রাখীবন্ধন’ উৎসবে নারীরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেন, যা হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।

মা লক্ষীর ধারণা – তারা ‘মা লক্ষী’ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন—এই রূপক প্রচার করে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন এবং ‘মায়ের কৌটোয়’ চাল ও অর্থ সংগ্রহ করে আন্দোলনের তহবিল গঠনে সহায়তা করেন।

অর্থনৈতিক প্রতিরোধ –

বয়কট আন্দোলন – নারীরা বিদেশি পণ্য বর্জনে অগ্রণী ভূমিকা নেন। তারা বিদেশি শাড়ি, চুড়ি, লবণ, মসলা ও ওষুধ বর্জন করেন এবং বিদেশি দোকানের সামনে পিকেটিং-এ অংশ নেন।

স্বদেশি প্রচার – তারা স্বদেশি দ্রব্য ব্যবহার ও তৈরির উপর জোর দেন। স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘সখী সমিতি’ এবং সরলাদেবী চৌধুরানীর ‘লক্ষীর ভাণ্ডার’ এর মতো সংগঠন স্থাপন করে স্বদেশি শিল্পের প্রসারে কাজ করেন।

সংগঠন ও মতপ্রচার –

সভা-সমিতি ও বক্তৃতা – ময়মনসিংহের নারীদের সভার মাধ্যমে শুরু করে জলপাইগুড়ির অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্ত, ময়মনসিংহের পুষ্পলতা গুপ্তা, কলকাতার হেমাঙ্গিনী দাস প্রমুখ নারী সভা-সমিতিতে যোগদান ও বক্তৃতার মাধ্যমে আন্দোলনকে প্রাণবন্ত করেন।

পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা – সরলাদেবী চৌধুরানী সম্পাদিত ‘ভারতী’, সরযুবালা দাসী সম্পাদিত ‘ভারত মহিলা’ এবং মুসলিম নারী খায়রুন্নেসার ‘নবনূর’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বদেশানুরাগ’ কবিতার মাধ্যমে তারা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

অর্থসংগ্রহ ও বিপ্লবীদের সহায়তা –

তহবিল সংগ্রহ – নারীরা স্বদেশি তহবিলে টাকা-পয়সা ও গয়না দান করেন।

বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা – ভগিনী নিবেদিতা, মুর্শিদাবাদের গিরিজাসুন্দরী, বরিশালের সরোজিনী দেবী প্রমুখ নারী গুপ্ত বিপ্লবী সমিতিগুলোকে নানাভাবে সাহায্য ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।

আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা –

সামাজিক শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা – এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের বেশিরভাগই ছিলেন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারের। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ, নিম্নবিত্ত ও মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য। খায়রুন্নেসার মতো ব্যতিক্রমী উদাহরণ খুবই কম ছিল।

নগরকেন্দ্রিক ও অভিজাত চরিত্র – আন্দোলনের নেতৃত্ব ও সক্রিয়তা মূলত কলকাতা ও অন্যান্য শহরকেন্দ্রিক এবং অভিজাত পরিবারের নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ নারীদের ব্যাপকভাবে এই আন্দোলনে টেনে আনা সম্ভব হয়নি।

পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ – নারীরা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন বটে, কিন্তু আন্দোলনের নীতি, কৌশল ও কর্মসূচি নির্ধারণে তাদের ভূমিকা ছিল গৌণ। পুরুষ নেতৃত্বই মূল পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিতেন, নারীরা তা বাস্তবায়ন করতেন।

সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত অংশগ্রহণ – নারীদের অংশগ্রহণ ছিল পূর্ব-নির্ধারিত এবং একটি সনাক্তকরণ সীমার মধ্যে আবদ্ধ। তাদের কাজকর্ম মূলত গৃহকেন্দ্রিক ও ‘নারীত্ব’-এর প্রচলিত ধারণার মধ্যেই সীমিত রাখা হয়েছিল। তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে আন্দোলন পরিচালনা করতে পারেননি।

উপসংহার – মূলত শহুরে, উচ্চবর্গীয় হিন্দু নারীদের অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ এবং পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে নারীসমাজের অংশগ্রহণ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের ভবিষ্যত ভূমিকার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এটি ছিল ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর একটি যুগান্তকারী প্রবেশ।


MadhyamikQuestionPapers.com এ আপনি অন্যান্য বছরের প্রশ্নপত্রের ও Model Question Paper-এর উত্তরও সহজেই পেয়ে যাবেন। আপনার মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কেমন লাগলো, তা আমাদের কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আরও পড়ার জন্য, জ্ঞান অর্জনের জন্য এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য MadhyamikQuestionPapers.com এর সাথে যুক্ত থাকুন।

Tag Post :
Share This :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *