Madhyamik Question Papers

ইতিহাস Model Question Paper 4 (2026) এর উত্তর – Class 10 WBBSE

History
History Model Question Paper 4 2026 Answer Thumbnail

আপনি কি ২০২৬ সালের মাধ্যমিক ইতিহাস Model Question Paper 4 এর সমাধান খুঁজছেন? তাহলে আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন। এই আর্টিকেলে আমরা WBBSE-এর ইতিহাস ২০২৬ মাধ্যমিক ইতিহাস Model Question Paper 4-এর প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক ও বিস্তৃত সমাধান উপস্থাপন করেছি।

প্রশ্নোত্তরগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা সহজেই পড়ে বুঝতে পারে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যবহার করতে পারে। ইতিহাস মডেল প্রশ্নপত্র ও তার সমাধান মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ও সহায়ক।

MadhyamikQuestionPapers.com, ২০১৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষার সমস্ত প্রশ্নপত্র ও সমাধান সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করে আসছে। ২০২৬ সালের সমস্ত মডেল প্রশ্নপত্র ও তার সঠিক সমাধান এখানে সবার আগে আপডেট করা হয়েছে।

আপনার প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করতে এখনই পুরো প্রশ্নপত্র ও উত্তর দেখে নিন!

Download 2017 to 2024 All Subject’s Madhyamik Question Papers

View All Answers of Last Year Madhyamik Question Papers

যদি দ্রুত প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজতে চান, তাহলে নিচের Table of Contents এর পাশে থাকা [!!!] চিহ্নে ক্লিক করুন। এই পেজে থাকা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর Table of Contents-এ ধারাবাহিকভাবে সাজানো আছে। যে প্রশ্নে ক্লিক করবেন, সরাসরি তার উত্তরে পৌঁছে যাবেন।

Questions

বিভাগ-ক

১ সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো:

১.১ ভারতের প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র হল

(ক) সমাচার দর্পণ,
(খ) বেঙ্গল গেজেট,
(গ) সংবাদ প্রভাকর,
(ঘ) দিগ্দর্শন

উত্তর: (খ) বেঙ্গল গেজেট

১.২ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের মনোভাব জানার জন্য প্রধান ঐতিহাসিক উপাদান

(ক) সাময়িকপত্র,
(খ) সরকারি নথি,
(গ) সংবাদপত্র,
(ঘ) স্মৃতিকথা

উত্তর: (খ) সরকারি নথি

১.৩ জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইন্সটিটিউশন প্রতিষ্ঠা করেন-

(ক) আলেকজান্ডার ডাফ,
(খ) ডেভিড হেয়ার,
(গ) উইলিয়ম কেরি,
(ঘ) ড্রিংকওয়াটার বিটন

উত্তর: (ক) আলেকজান্ডার ডাফ

১.৪ নববিধান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-

(ক) দয়ানন্দ সরস্বতী,
(খ) কেশবচন্দ্র সেন,
(গ) স্বামী বিবেকানন্দ,
(ঘ) মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর

উত্তর: (খ) কেশবচন্দ্র সেন

১.৫ নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করেন-

(ক) মাইকেল মধুসূদন দত্ত,
(খ) দীনবন্ধু মিত্র,
(গ) জেমস লঙ,
(ঘ) জেমস মিল

উত্তর: (ক) মাইকেল মধুসূদন দত্ত

১.৬ সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের একজন নেতা হলেন-

(ক) ভবানী পাঠক,
(খ) জোয়া ভগত,
(গ) বিরসা মুন্ডা,
(ঘ) বিদ্যাধর মহাপাত্র

উত্তর: (ক) ভবানী পাঠক

১.৭ আনন্দমঠ উপন্যাসের পটভূমি-

(ক) ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ,
(খ) নীল বিদ্রোহ,
(গ) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ,
(ঘ) পাবনা বিদ্রোহ

উত্তর: (গ) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ

১.৮. ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবসান ঘটে –

(ক) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে,
(খ) ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে,
(গ) ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে,
(ঘ) ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে

উত্তর: (খ) ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে

১.৯ বাংলার প্রথম ‘ফিল্ড জার্নালিস্ট’ নামে কে পরিচিতি পান?-

(ক) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়,
(খ) শিশিরকুমার ঘোষ,
(গ) কালীপ্রসন্ন সিংহ,
(ঘ) অক্ষয়কুমার দত্ত

উত্তর: (খ) শিশিরকুমার ঘোষ

১.১০ ‘খল ব্রাহ্মণ’ চিত্রের চিত্রকর হলেন-

(ক) নন্দলাল বসু,
(খ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর,
(গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,
(ঘ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

উত্তর: (ঘ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

১.১১ ‘দিগ্দর্শন’-এর সম্পাদক ছিলেন-

(ক) উইলিয়ম কেরি,
(খ) জোসুয়া মার্শম্যান,
(গ) ফেলিক্স কেরি,
(ঘ) জন ক্লার্ক মার্শম্যান

উত্তর: (ঘ) জন ক্লার্ক মার্শম্যান

১.১২ কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন-

(ক) সত্যেন্দ্রনাথ বসু,
(খ) আশুতোষ মুখার্জি,
(গ) মহেন্দ্রলাল সরকার,
(ঘ) নীলরতন সরকার

উত্তর: (খ) আশুতোষ মুখার্জি

১.১৩ মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন না-

(ক) অবনী মুখার্জি,
(খ) শিবনাথ ব্যানার্জি,
(গ) মুজফ্ফর আহমেদ,
(ঘ) বেঞ্জামিন ব্র্যাডলি

উত্তর: (ক) অবনী মুখার্জি

১.১৪ তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন

(ক) রামচন্দ্র বেরা,
(খ) সতীশচন্দ্র সামন্ত,
(গ) অবনী মুখার্জি,
(ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল

উত্তর: (খ) সতীশচন্দ্র সামন্ত

১.১৫ কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল

(ক) কলকাতায়,
(খ) দিল্লিতে,
(গ) বোম্বাইতে,
(ঘ) মাদ্রাজে

উত্তর: (গ) বোম্বাইতে

১.১৬ মাদ্রাজে ‘আত্মসম্মান আন্দোলন’ শুরু করেন-

(ক) রামস্বামী নাইকার,
(খ) নারায়ণ গুরু,
(গ) ভীমরাও আম্বেদকর,
(ঘ) গান্ধিজি

উত্তর: (ক) রামস্বামী নাইকার

১.১৭ নারী সত্যাগ্রহ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন-

(ক) ঊর্মিলা দেবী,
(খ) সুনীতি দেবী,
(গ) বাসন্তী দেবী,
(ঘ) লীলা নাগ

উত্তর: (গ) বাসন্তী দেবী

১.১৮ ‘ভারতের বুলবুল’ বলা হয়

(ক) কল্পনা দত্তকে,
(খ) তরু দত্তকে,
(গ) সরোজিনী নাইডুকে,
(ঘ) মাতঙ্গিনী হাজরাকে

উত্তর: (গ) সরোজিনী নাইডুকে

১.১৯ গোয়া ভারতভুক্ত হয়-

(ক) ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে,
(খ) ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে,
(গ) ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে,
(ঘ) ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে

উত্তর: (গ) ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে

১.২০ ‘প্রান্তিক মানব’ গ্রন্থটি রচনা করেন-

(ক) প্রফুল্লকুমার রায়,
(খ) মণিকুন্তলা সেন,
(গ) প্রফুল্ল চক্রবর্তী,
(ঘ) প্রফুল্ল ঘোষ

উত্তর: (গ) প্রফুল্ল চক্রবর্তী

বিভাগ-খ

২. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ১৬টি প্রশ্নের উত্তর দাও)

উপবিভাগ ২.১ একটি বাক্যে উত্তর দাও :

২.১.১ গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকাটি কোথা থেকে প্রকাশিত হত? ME-23, 19

উত্তর: “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা” পত্রিকাটি প্রথমে কলকাতা থেকে এবং পরবর্তীতে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি থেকে প্রকাশিত হতো।

২.১.২ ‘ফরাজি’ শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: ফরাজি’ শব্দটি আরবি থেকে এসেছে, যার মানে হল ইসলামে যেসব কাজ পালন করা অত্যাবশ্যক।

২.১.৩ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) সময় গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন?

উত্তর: মহাবিদ্রোহের সময় ভারতের গভর্নর-জেনারেল ছিলেন লর্ড ক্যানিং।

২.১.৪ ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ কে প্রতিষ্ঠা করেন?

উত্তর: ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠা করেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

২.২ ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো:

২.২.১ স্যামুয়েল বোর্ন ও লালা দীনদয়াল ছিলেন ভারতের দুজন চিত্রশিল্পী।

উত্তর: ভুল

২.২.২ বিরসা মুন্ডার উপাস্য সিং বোঙা ছিলেন মুন্ডাদের সূর্যদেবতা।

উত্তর: ঠিক

২.২.৩ কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে (১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ) সভাপতি ছিলেন জওহরলাল নেহরু।

উত্তর: ঠিক

২.২.৪ বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ছিলেন বাসন্তী দেবী। ME-’19

উত্তর: ভুল

উপবিভাগ ২.৩ ‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও:

‘ক’ স্তম্ভ‘খ’ স্তম্ভ
২.৩.১ তত্ত্ববোধিনী সভা(১) স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জি
২.৩.২ প্রতাপাদিত্য চরিত্র(২) পুনা চুক্তি (১৯৩২) ΜΕ -’18
২.৩.৩ হাওড়া ব্রিজ(৩) রামরাম বসু
২.৩.৪ ড. আম্বেদকর(৪) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর

উত্তর: 

‘ক’ স্তম্ভ‘খ’ স্তম্ভ
২.৩.১ তত্ত্ববোধিনী সভা(৪) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
২.৩.২ প্রতাপাদিত্য চরিত্র(৩) রামরাম বসু
২.৩.৩ হাওড়া ব্রিজ(১) স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জি
২.৩.৪ ড. আম্বেদকর(২) পুনা চুক্তি (১৯৩২)

উপবিভাগ ২.৪ প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখা মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত করো ও নামাঙ্কিত করো:

২.৪.১ বারাণসী
২.৪.২ মুন্ডা বিদ্রোহের এলাকা রাঁচি
২.৪.৩ মহাবিদ্রোহের একটি কেন্দ্র – কানপুর ME-24, ’22
২.৪.৪ গোয়া

উপবিভাগ ২.৫ নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন করো:

২.৫.১ বিবৃতি: নিম্নবর্গীয় ইতিহাসচর্চা ইতিহাসের প্রাচীন প্রচলিত ধারণার বিরোধী।

ব্যাখ্যা ১: নিম্নবর্গীয় ইতিহাস সাধারণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবদানের ওপর আলোকপাত করে।

ব্যাখ্যা ২: ইতিহাসের প্রচলনে নিম্নবর্গীয়দের গুরুত্বহীনতাকে প্রকাশ করে।

ব্যাখ্যা ৩: নিম্নবর্গীয় ইতিহাসচর্চা প্রাচীন ইতিহাসে প্রচলিত ছিল।

উত্তর: ব্যাখ্যা ২: ইতিহাসের প্রচলনে নিম্নবর্গীয়দের গুরুত্বহীনতাকে প্রকাশ করে।

২.৫.২ বিবৃতি: স্বামী বিবেকানন্দ ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থটি রচনা করেন। ΜΕ -’19

ব্যাখ্যা ১: তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক ভারতের ইতিহাস প্রণয়ন করা।

ব্যাখ্যা ২: তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নব্য হিন্দুধর্ম প্রচার করা।

ব্যাখ্যা ৩: তাঁর উদ্দেশ্য ছিল স্বাদেশিকতা প্রচার করা।

উত্তর: ব্যাখ্যা ১: তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক ভারতের ইতিহাস প্রণয়ন করা।

২.৫.৩ বিবৃতি: বারদৌলির মহিলারা বল্লভভাই প্যাটেলকে সর্দার উপাধিতে ভূষিত করে।

ব্যাখ্যা ১: তিনি বড়ো মাপের কংগ্রেস নেতা ছিলেন।

ব্যাখ্যা ২: তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বে বারদৌলির মহিলারা অভিভূত হয়েছিলেন।

ব্যাখ্যা ৩: তিনি মহাত্মা গান্ধির অনুগামী ছিলেন।

উত্তর: ব্যাখ্যা ২: তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বে বারদৌলির মহিলারা অভিভূত হয়েছিলেন।

২.৫.৪ বিবৃতি: সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে ‘লৌহমানব’ বলা হয়।

ব্যাখ্যা ১: তিনি ভারত সীমান্তে লোহার তারের বেড়া দিয়েছিলেন।

ব্যাখ্যা ২: তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতভুক্ত করেন।

ব্যাখ্যা ৩: তিনি বারদৌলি সত্যাগ্রহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

উত্তর: ব্যাখ্যা ২: তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতভুক্ত করেন।

বিভাগ-গ

৩. দুটি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (যে-কোনো ১১টি)

৩.১ ইতিহাসচর্চা (Historiography) বলতে কী বোঝো?

উত্তর: ইতিহাসচর্চা বা Historiography বলতে ইতিহাস লেখার পদ্ধতি, তত্ত্ব ও ইতিহাসের ব্যাখ্যাকে বোঝায়। এটি শুধুমাত্র ঐতিহাসিক ঘটনাবলির বর্ণনা নয়, বরং কীভাবে, কেন এবং কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস রচনা করা হয় তার অধ্যয়ন। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়, ফলে ইতিহাস সম্বন্ধে ধারণা বদলায় – এই পরিবর্তনশীল ধারণা ও বিশ্লেষণেরই রূপ হল ইতিহাসচর্চা।

৩.২ সংবাদপত্র এবং সাময়িকপত্রের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: সংবাদপত্র এবং সাময়িকপত্রের মধ্যে পার্থক্য নিম্নরূপ –

সংবাদপত্রসাময়িকপত্র
দৈনিক বা প্রত্যহ প্রকাশিত হয়।নির্দিষ্ট ব্যবধানে প্রকাশিত হয়; যেমন: সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বার্ষিক।
দৈনিক ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিবেদন মূলক বিবরণ থাকে।বিশেষ কোনো বিষয়ে বিনোদনমূলক ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা থাকে।
এটি মূলত সংবাদ ও তথ্যনির্ভর।এটি বিশ্লেষণ ও বিনোদন কেন্দ্রিক।
৩.৩ মধুসূদন গুপ্ত স্মরণীয় কেন?‘ ME-’19

উত্তর: ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে প্রথম বাঙালি ছাত্ররূপে মৃতদেহ কাটা বা শব ব্যবচ্ছেদ করেন। সামাজিক কুসংস্কার ও জাতিচ্যুত হওয়ার ভয়কে অগ্রাহ্য করে এই সাহসিক কাজটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। তিনি ‘লণ্ডন ফার্মাকোপিয়া’ ও ‘অ্যানাটমি’ গ্রন্থ দুটি বাংলায় অনুবাদ করেন। এর ফলে ভারতে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার চর্চা বাংলাভাষী শিক্ষার্থীদের জন্য সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। সুতরাং, বাংলায় শবব্যবচ্ছেদের পথিকৃৎ এবং চিকিৎসা শিক্ষাকে বাংলায় সম্প্রসারিত করার জন্য মধুসূদন গুপ্ত চিরস্মরণীয়।

৩.৪ ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ গ্রন্থ থেকে বাবুসমাজ সম্পর্কে কী জানা যায়? ΜΕ-’22, ’19

উত্তর: “হুতোম প্যাঁচার নকশা” গ্রন্থ থেকে বাবুসমাজ সম্পর্কে নিম্নলিখিত তথ্যগুলো জানা যায়:

উদ্ভব ও পরিচয় – উনিশ শতকের কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এক বিশেষ ধনী সম্প্রদায় হিসেবে বাবুসমাজের উদ্ভব ঘটে।

চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য – তারা ছিল হঠাৎ ফুলে-ফেঁপে ওঠা ধনী। নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে ব্যস্ত ছিল। তাদের অর্থোপার্জনের পদ্ধতি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ; জালজোচ্চুরি বা ফন্দিফিকিরের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করত।

অর্থব্যয়ের ক্ষেত্র – বাবুরা বাইজি নাচ, পায়রা ও বুলবুলি পোষা, বিড়ালের বিয়ে ইত্যাদি অবান্তর ও বিলাসী কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় করত।

লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি – লেখক কালীপ্রসন্ন সিংহ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমে তাদের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন এবং তাদের সঠিক পথে আনার চেষ্টা করেছেন।

৩.৫ মুন্ডা বিদ্রোহের প্রধান লক্ষ্য কী ছিল?

উত্তর: অরণ্যবাসী মুন্ডাদের বিদ্রোহের পিছনে প্রধান লক্ষ্য ছিল নিম্নরূপ –

ভূমি অধিকার পুনরুদ্ধার (Restoration of Land Rights) – ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি প্রথার কারণে মুন্ডাদের traditional ‘খুৎকাঠি’ ভূমি ব্যবস্থা (communitarian land ownership) ধ্বংস হয়েছিল। তারা তাদের পূর্বপুরুষের জমি ফিরে পেতে চেয়েছিল।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি (Social and Cultural Liberation) – তারা ‘দিকু’ (বহিরাগত ব্যবসায়ী, মহাজন) এবং ব্রিটিশ শাসনের শোষণমূলক ব্যবস্থা থেকে মুক্তি চেয়েছিল, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব ও সাংস্কৃতিকভাবে হুমকির মুখে ফেলেছিল।

নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা কায়েম (Establishment of Self-rule) – বিদ্রোহের নেতা বীরসা মুন্ডার নেতৃত্বে তারা একটি মুন্ডা রাজ্য বা ‘মুন্ডা রাজ’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, যেখানে তাদের নিজস্ব আইন ও শাসন ব্যবস্থা কার্যকর হবে।

৩.৬ ‘বে-এলাকা চাষ’ বা ‘রায়তি চাষ’ বলতে কী বোঝো?

উত্তর: বে-এলাকা চাষ বা রায়তি চাষ – নীলচাষের একটি পদ্ধতি যেখানে নীলকররা চাষিদের তাদের নিজস্ব জমিতে নীল চাষ করানোর জন্য অগ্রিম টাকা বা দাদন দিত। এই ব্যবস্থাকে ‘রায়তি চাষ’, ‘দাদনী চাষ’ বা ‘বে-এলাকা চাষ’ নামে পরিচিত ছিল। এখানে নীলকররা সরাসরি জমির মালিকানা বা ভাড়া নিত না, বরং চাষির জমিতেই নীল উৎপাদন করত এবং এর বিনিময়ে চাষিদের অগ্রিম অর্থ প্রদান করত।

৩.৭ ব্যঙ্গচিত্র আঁকা হয় কেন?

উত্তর: ব্যঙ্গচিত্র আঁকার কারণ –

(i) ব্যঙ্গচিত্র চিত্র শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা, যার মূল উদ্দেশ্য হলো তির্যক ও ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে সমাজ ও ধর্মে প্রচলিত কুসংস্কার, ত্রুটি ও বিচ্যুতিগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা।

(ii) প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করার পরিবর্তে অনেক সময় উপহাস ও বিদ্রুপাত্মক সমালোচনার মাধ্যম হিসেবে ব্যঙ্গচিত্র আঁকা হয়।

(iii) কোনো জটিল বা গুরুগম্ভীর বিষয় বা ঘটনাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য, আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক করে তোলার জন্যও ব্যঙ্গচিত্রের ব্যবহার করা হয়।

৩.৮ ভারতসভা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল? ΜΕ -’22, ’18

উত্তর: ভারতসভা ছিল উনিশ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠন। এটি ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলি ছিল নিম্নরূপ –

দেশে জনমত গঠন করা – ব্রিটিশ শাসনের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে এবং দেশের সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করা।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ করা – এটি একটি সর্বভারতীয় চরিত্র অর্জনের চেষ্টা করেছিল এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে একই মঞ্চে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।

হিন্দু-মুসলমানের মৈত্রীর প্রসার ঘটানো – ধর্ম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়কে একত্রিত করে একটি সমন্বিত জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল।

রাজনৈতিক আন্দোলনে অশিক্ষিত মানুষদের যোগদানের ব্যবস্থা করা – ভারতসভা শুধু শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষকেও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশীদার বানানোর চেষ্টা চালায়।

৩.৯ বাংলা ছাপাখানার ইতিহাসে বটতলা প্রকাশনার গুরুত্ব কী?

উত্তর: বাংলা ছাপাখানার ইতিহাসে বটতলা প্রকাশনার গুরুত্ব নিম্নরূপ –

ঐতিহাসিক তথ্যের আকর – বটতলা থেকে প্রকাশিত পাঁচালি, পুঁথি, কাব্য, রোম্যান্স, ভাঁড়ের গান ইত্যাদি সাহিত্য উনিশ শতকের কলকাতার জীবনযাত্রা, বাবু সংস্কৃতি, সমাজচিত্র ও লোকজ বিশ্বাস সম্পর্কে অসামান্য ও বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করে। এটি এক্ষেত্রে একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে কাজ করে।

সামাজিক ইতিহাস চর্চার উপাদান – বটতলা সাহিত্য কেবল মনের তৃপ্তির জিনিসই ছিল না, এটি উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক ইতিহাস রচনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য উপাদান। এর মাধ্যমে সমকালীন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির রুচি, মূল্যবোধ ও জীবনধারা সম্পর্কে জানা যায়।

গণশিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা – সস্তা দামে ও সহজলভ্য ভাষায় বই ছাপানোর মাধ্যমে বটতলা প্রকাশনা তৎকালীন গণশিক্ষার বিস্তারে একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এটি সাধারণ মানুষকে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে এবং সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী করতে সহায়তা করেছিল।

৩.১০ জাতীয় শিক্ষা পরিষদের কর্মসূচি কী ছিল? ΜΕ -’24, ’18

উত্তর: জাতীয় শিক্ষা পরিষদের কর্মসূচিগুলি ছিল – 

  1. জাতীয় শিক্ষানীতির উপর প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।
  2. মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের উপর গুরুত্ব আরোপ।
  3. কারিগরি শিক্ষার প্রসারের উপর জোর দেওয়া।
৩.১১. বাবা রামচন্দ্র কে ছিলেন?

উত্তর: বাবা রামচন্দ্র ছিলেন ভারতের যুক্তপ্রদেশে (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) অসহযোগ আন্দোলনের সময়কালের একজন বিশিষ্ট কৃষক নেতা। তিনি প্রতাপগড়, রায়বেরিলি, সুলতানপুর ও ফৈজাবাদসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকদের সংগঠিত করে তালুকদার ও জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। যুক্তপ্রদেশের কৃষক আন্দোলনে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

৩.১২ কে, কেন র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করেন?

উত্তর: এম. এন. রায় ১৯৪০ সালে র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করেন নিম্নোক্ত প্রধান কারণগুলোর জন্য –

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির সমর্থন – তিনি বিশ্বাস করতেন যে ফ্যাসিবাদ (বিশেষ করে নাজি জার্মানি) গণতন্ত্র ও মানবতার জন্য একটি বড় হুমকি। তাই তিনি চেয়েছিলেন ভারত যেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে চলমান অসহযোগ আন্দোলন সত্ত্বেও মিত্রশক্তিকে (ব্রিটেনসহ) সমর্থন করে। তার মতে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়েও জরুরি।

যুদ্ধোত্তর গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের লক্ষ্য – রায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ভারতে একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি চেয়েছিলেন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গণতান্ত্রিক নীতির ভিত্তিতে পুনর্গঠিত হোক।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ থেকে বিচ্যুতি – এর আগে রায় একজন বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা ছিলেন। কিন্তু তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট মডেল ও স্ট্যালিনের নীতির সমালোচনা করতে থাকেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে ঐতিহ্যবাহী কমিউনিস্ট দলগুলো গণতন্ত্রকে গুরুত্ব দেয় না। তাই তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, যা মার্কসবাদী আদর্শ থেকে আলাদা হয়ে গণতন্ত্র, মানবতাবাদ ও যুক্তিবাদ-এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হবে।

৩.১৩ রশিদ আলি দিবস কেন পালিত হয়েছিল?

উত্তর: ১৯৪৬ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি দিল্লির লালকেল্লায় ব্রিটিশ সরকার আজাদ হিন্দ ফৌজের অফিসার ক্যাপ্টেন রশিদ আলির কোর্ট মার্শাল করে তাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। এই রায়ের তীব্র প্রতিবাদে ১১ই ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ছাত্র লিগের ডাকে একটি ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়। ইংরেজ পুলিশ সেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে গুলি চালালে ৪৮ জন ছাত্র নিহত এবং ৩০০-রও বেশি ছাত্র আহত হন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাংলায় ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি করে। এই পুলিশি বর্বরতার প্রতিবাদ এবং ক্যাপ্টেন রশিদ আলির সমর্থনে পরের দিন, অর্থাৎ ১২ই ফেব্রুয়ারি (১৯৪৬), সমগ্র কলকাতায় “রশিদ আলি দিবস” পালন করা হয়। এ দিন কলকাতায় সর্বাত্মক ধর্মঘট (হরতাল) পালিত হয়েছিল।

৩.১৪ ভাইকম সত্যাগ্রহ কী? ME-’17

উত্তর: ভাইকম সত্যাগ্রহ ছিল কেরালার ভাইকমে অবস্থিত শ্রীভাইকম মহাদেব মন্দিরে দলিত সম্প্রদায় (বিশেষ করে এজাভা ও পুলায়া) -এর প্রবেশাধিকারের দাবিতে সংঘটিত একটি অহিংস আন্দোলন। এই সত্যাগ্রহ ১৯২৪ সালে শুরু হয় এবং শ্রীনারায়ণ গুরু ও টি. কে. মাধবনের মতো নেতাদের নেতৃত্বে এটি সংগঠিত হয়। মূলত মন্দিরের চারপাশের রাস্তায় দলিতদের চলাচলের অধিকারের জন্য এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে, যা পরবর্তীতে মন্দিরে প্রবেশের অধিকারের জন্য আন্দোলনের রূপ নেয়। মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ ভারত সফরকালে এই আন্দোলনে সমর্থন দেন এবং তার অহিংস নীতির সাথে এটি পরিচালিত হয়। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন সফল হয় এবং দলিতরা মন্দিরে প্রবেশের অধিকার অর্জন করে।

৩.১৫ ১৯৫০ সালে কেন নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল?

উত্তর: ১৯৫০ সালে নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় মূলত ভারত ভাগোত্তরকালে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ করা, উভয় দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ), পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর স্থানান্তর ও পুনর্বাসনের সমস্যা সমাধানের জন্য।

৩.১৬. LOC (Line of Control) কী? ME-’17

উত্তর: LOC (Line of Control) হল একটি নিয়ন্ত্রণ রেখা, যা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বর্তমান কার্যকরী সীমানা নির্দেশ করে। এটি মূলত জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলটিকে ভারত-শাসিত ও পাকিস্তান-শাসিত অংশে বিভক্ত করেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর, কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং স্বাধীনতা চাইলেও পাকিস্তান-সমর্থিত সেনারা কাশ্মীর আক্রমণ করে।এই আক্রমণের জবাবে মহারাজা ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে ভারত সেনা প্রেরণ করে।এর ফলশ্রুতিতে ১৯৪৭-৪৮ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ হয়।জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে ১৯৪৯ সালে যুদ্ধবিরতি হয় এবং এই যুদ্ধবিরতি রেখাই পরবর্তীতে LOC হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭২ সালের শিমলা চুক্তিতে এই রেখাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে “লাইন অফ কন্ট্রোল” (LOC) নাম দেওয়া হয়।

বিভাগ-ঘ

৪. সাত বা আটটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)

উপবিভাগ ঘ.১

৪.১ শ্রীরামকৃষ্ণের ‘সর্বধর্মসমন্বয়’-এর আদর্শ ব্যাখ্যা করো। ΜΕ -’20

উত্তর: মূল ধারণা – শ্রীরামকৃষ্ণের ‘সর্বধর্মসমন্বয়’ হল একটি আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক আদর্শ যা সকল ধর্মকে ঈশ্বরলাভের সমানভাবে বৈধ পথ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। তাঁর বিখ্যাত উক্তি “যত মত, তত পথ” এই আদর্শের মর্মকথকেই প্রকাশ করে।

ব্যক্তিগত সাধনার ভিত্তি – এই আদর্শটি তাঁর নিজস্ব জীবনানুভূতি ও সরাসরি আধ্যাত্মিক সাধনার ফল ছিল। তিনি শাক্ত, বৈষ্ণব, অদ্বৈত বেদান্ত, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম—বিভিন্ন পথ অনুসরণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে সকল পথের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন।

মৌলিক নীতিসমূহ –

সকল ধর্মের অন্তর্নিহিত একতা – বিভিন্ন ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসপদ্ধতি ভিন্ন হলেও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য একই সর্বোচ্চ সত্যের সাক্ষাৎলাভ।

ঈশ্বরপ্রাপ্তিতে সহজ ও সরল পথ – তিনি জোর দিয়েছিলেন যে ঈশ্বরলাভের জন্য পাণ্ডিত্য বা কঠোর ত্যাগের প্রয়োজন নেই; সরল ও আন্তরিক ভক্তি-ই যথেষ্ট।

মানবসেবাই ঈশ্বরসেবা – তিনি “যত্র জীব, তত্র শিব” (যেখানে জীব, সেখানেই শিব) এই বাণী প্রচার করে মানবসেবাকে ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় সেবা রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন।

সহিষ্ণুতা ও সমন্বয় – ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে তাঁর আদর্শ ছিল সহিষ্ণুতা, শ্রদ্ধা ও সমন্বয়ের।

প্রভাব ও বাস্তবায়ন – শ্রীরামকৃষ্ণের এই বিমূর্ত আদর্শকে তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন -এর মাধ্যমে একটি মূর্ত রূপ দান করেন, যা ধর্মীয় সম্প্রীতি, সমাজসেবা ও মানবকল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। এই আদর্শ জাতিপাত ও ধর্মীয় ভেদাভেদ দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

সারসংক্ষেপে, শ্রীরামকৃষ্ণের ‘সর্বধর্মসমন্বয়’-এর আদর্শ হল সকল ধর্মের মৌলিক ঐক্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা এক সর্বজনীন, মানবতাবাদী ও ব্যবহারিক জীবনদর্শন।

৪.২ ভারতে বেসরকারি উদ্যোগে কীভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে?

উত্তর: ভূমিকা – ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি ব্যক্তি ও সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ডেভিড হেয়ার, জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন প্রমুখ ব্যক্তি এবং বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারিরা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।

রামমোহন রায়ের উদ্যোগ – রাজা রামমোহন রায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের জন্য জোরালো ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৮১৫ সালে ‘অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা নেন। এছাড়া, ১৮১৩ সালের সনদ আইনের মাধ্যমে শিক্ষাখাতে বরাদ্দকৃত ১ লক্ষ টাকা পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য ব্যয় করার দাবি জানান তিনি।

রাধাকান্ত দেবের উদ্যোগ – রাজা রাধাকান্ত দেব নারী শিক্ষার প্রসারে বিশেষ উদ্যোগ নেন। তিনি ১৮২২ সালে ‘স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক’ নামক একটি বই প্রকাশ করেন এবং ১৮৫৩ সালে ‘হিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজ’-এর পরিচালন সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগ – ডেভিড হেয়ার তাঁর ব্যক্তিগত অর্থ পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে বিনিয়োগ করেন। তাঁর উদ্যোগে ১৮১৭ সালে ‘হিন্দু কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া, তিনি ‘স্কুল বুক সোসাইটি’ (১৮১৭) এবং ‘পটলডাঙ্গা একাডেমি’ (১৮১৮) প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে হেয়ার স্কুল নামে পরিচিতি পায়।

বেথুনের উদ্যোগ – জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ১৮৪৯ সালে ‘হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়’ (পরবর্তীতে বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন এবং একটি মহিলা কলেজের গোড়াপত্তন করেন, যা বর্তমানে বেথুন কলেজ নামে পরিচিত।

বিদ্যাসাগরের উদ্যোগ – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার প্রসারে অসামান্য অবদান রাখেন। তিনি বেথুনের সহযোগী হিসেবে হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া, তিনি ১৮৫৮ সালে নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৮৭২ সালে ‘মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন’ (বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ) স্থাপন করেন।

খ্রিস্টান মিশনারিদের উদ্যোগ – খ্রিস্টান মিশনারিরা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক অবদান রাখেন। তারা ‘ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি’ (১৮১৯), ‘ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল’ (১৮২৮) প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এ ক্ষেত্রে রবার্ট মে, মিস কুক, মেরি উইলসন, মেরি কার্পেন্টার প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

অন্যান্য উদ্যোগ – শেরবোন কর্তৃক জোড়াসাঁকোতে ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপন এবং গৌরমোহন আঢ্যের ‘ওরিয়েন্টাল সেমিনারি’ (১৮২৮) প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগগুলোও পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

উপসংহার – বেসরকারি উদ্যোগ ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে। শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর অবদানের ফলে পাশ্চাত্য শিক্ষা দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা হয়।

উপবিভাগ ঘ.২

৪.৩ ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি কীভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিস্তারে সহায়তা করেছিল?

উত্তর: “আনন্দমঠ” উপন্যাসটি নিম্নলিখিত উপায়ে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিস্তারে সহায়তা করেছিল:

জাতীয় চেতনার প্রতীক রূপে দেশমাতৃকা – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় “আনন্দমঠ” উপন্যাসে জন্মভূমিকে ‘মাতৃরূপে’ কল্পনা করে দেশপ্রেমকে ধর্ম ও দেশসেবাকে পূজার সমতুল্য করে তোলেন। এটি দেশবাসীর মনে জাতীয়তাবাদী চেতনার একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে দেয়।

বন্দেমাতরম্ মন্ত্রের প্রচলন – এই উপন্যাসে “বন্দেমাতরম্” সঙ্গীতটি প্রথম প্রকাশিত হয়, যা পরবর্তীতে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলমন্ত্র ও প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। এটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করে।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও ত্যাগের আদর্শ – সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য ত্যাগ ও সংগ্রামের আদর্শ ফুটে উঠেছে। এটি যুবসমাজকে স্বদেশপ্রেম, ত্যাগ ও সেবার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করে।

স্বদেশ প্রেমের গীতা – “আনন্দমঠ”কে ‘স্বদেশ প্রেমের গীতা’ আখ্যা দেওয়া হয়, কারণ এটি দেশপ্রেমের একটি দার্শনিক ও ব্যবহারিক ভিত্তি প্রদান করে, যা জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী করে।

সামগ্রিকভাবে, “আনন্দমঠ” উপন্যাসটি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ দেখানোর পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে একটি সাংগঠনিক ও আদর্শিক রূপ দান করে, যা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গভীর প্রভাব ফেলে।

৪.৪ টীকা লেখো: ভারতসভা।

উত্তর: ভারতসভা প্রতিষ্ঠা – ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে কলকাতায় ভারতসভা প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভারতসভার উদ্দেশ্য – ভারতসভার মূল উদ্দেশ্যগুলি ছিল নিম্নরূপ –

ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার প্রসার ঘটানো। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসনতান্ত্রিক ও সামাজিক সংস্কারের দাবি তুলে ধরা। সারা ভারতের বিভিন্ন স্থানের নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন ও জাতীয় একতা গড়ে তোলা। সরকারের কাছে জনগণের অভাব-অভিযোগ ও দাবি-দাওয়া পেশ করা। কৃষক ও শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি ঘটানো।

কার্যাবলি – ভারতসভা ছিল একটি গণভিত্তিক সংগঠন। এটি জনসভা আয়োজন, বক্তৃতা দেওয়া এবং সরকারের কাছে স্মারকলিপি পাঠানোর মাধ্যমে তার লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করত। এটি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পথ প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মূল্যায়ন – ভারতসভা ছিল বাংলায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম প্রকৃত রাজনৈতিক সংগঠনগুলির মধ্যে একটি, যা শুধুমাত্র জমিদার বা ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের নিয়ে গঠিত ছিল এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছিল। এই সভা পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।

উপবিভাগ ঘ.৩

৪.৫ একা আন্দোলনের একটি সমালোচনামূলক বিবরণ দাও। ME-’24

উত্তর: ভূমিকা – অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে উত্তরপ্রদেশে (তৎকালীন যুক্তপ্রদেশ) ১৯২১-২২ সালে একটি বিস্ফোরক কৃষক আন্দোলনের সূচনা হয়, যা ইতিহাসে “একা আন্দোলন” বা “একা বিদ্রোহ” নামে পরিচিত। সমাজের নিম্নবর্গের, বিশেষত অহীর ও কুরমি সম্প্রদায়ের, কৃষকরা মাদারি পাশির নেতৃত্বে এই জঙ্গি আন্দোলন গড়ে তোলে।

একা আন্দোলনের কারণ –

একা আন্দোলনের মূল কারণগুলি ছিল নিম্নরূপ –

১. কৃষকদের উপর নির্ধারিত খাজনার অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ হারে নতুন কর চাপিয়ে দেওয়া।

২. খাজনা আদায়ের নামে জমিদার ও তালুকদারদের দ্বারা কৃষকদের ওপর চালিত সীমাহীন অত্যাচার ও নিপীড়ন।

৩. জমিদারের জমি ও খামারে কৃষকদের বেগার বা বিনা মজুরিতে শ্রম দিতে বাধ্য করা।

৪. তালুকদার ও জমিদারদের দ্বারা কৃষকদের ওপর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অকথ্য অত্যাচার।

আন্দোলনের বিস্তার –

১৯২১ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগ থেকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধে যুক্তপ্রদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল, বিশেষত হরদোই, বারাবাঁকি, সীতাপুর এবং বাহরাইচ জেলায় এই আন্দোলন দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

কৃষকদের শপথগ্রহণ –

আন্দোলনের সূচনালগ্নে কংগ্রেস ও খিলাফত নেতারা এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন। মাদারি পাশি এবং বাবা গরিবদাস-এর নেতৃত্বে আন্দোলনকারী কৃষকরা একটি শপথ গ্রহণ করে, যার মূল বিন্দু ছিল –

১. সরকারি নির্ধারিত বা নথিভুক্ত খাজনা ছাড়া কোনো অতিরিক্ত কর বা খাজনা দেওয়া হবে না।

২. অপরাধীদের কোনো প্রকার সাহায্য করা হবে না।

৩. বেগার শ্রম দেওয়া হবে না।

৪. জমি থেকে উৎখাত হলেও জমি ছেড়ে যাওয়া হবে না।

৫. কৃষক পঞ্চায়েতের সকল সিদ্ধান্ত মেনে চলা হবে।

আন্দোলনকারীদের হিংস্র কার্যকলাপ ও আন্দোলনের পরিণতি –

শীঘ্রই একা আন্দোলনকারীরা কংগ্রেস ও খিলাফত নেতাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে তাদের নিজস্ব সহিংস পথ অনুসরণ করতে থাকে। তারা সরকারি খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়, জমিদার ও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায় এবং কুমায়ুন অঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অগ্নিসংযোগ ঘটায়। আন্দোলনের নেতা মাদারি পাশি এক ব্রিটিশ জেলাশাসককে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এই সহিংস রূপের কারণে কংগ্রেসের জাতীয় নেতৃত্ব আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখেন। শেষ পর্যন্ত ১৯২২ সালে সরকার কঠোর দমননীতির মাধ্যমে এই আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে দমন করে।

সমালোচনামূলক উপসংহার –

একা আন্দোলন ছিল তার সূচনায় একটি ন্যায়সঙ্গত কৃষক বিদ্রোহ, যা শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিল। তবে আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে এর সহিংসতা ও উগ্রতা এটির পতনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত অসন্তোষকে একটি সুসংহত ও অহিংস কৌশলে রূপ দিতে না পারাই এই আন্দোলনের একটি বড় ব্যর্থতা ছিল। ঐতিহাসিক এরিক হবসবম তাঁর “প্রিমিটিভ রেবেলস” গ্রন্থে এই ধরনের বিদ্রোহগুলিকে “সামাজিক দস্যুতা” (Social Banditry) আখ্যা দিয়েছেন। একা আন্দোলনও সেই ধারারই একটি উদাহরণ, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ হিংসাত্মক পথে প্রকাশ পায়, কিন্তু একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর অভাব এবং কৌশলগত দুর্বলতার কারণে তা শেষপর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এটি উপনিবেশিক ভারতের কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসে একটি জটিক ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

৪.৬ আইন অমান্য আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা কীরূপ ছিল?

উত্তর: আইন অমান্য আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য কিন্তু অসংগঠিত ও স্বতঃস্ফূর্ত। আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে (১৯৩০-৩১) তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করলেও দ্বিতীয় পর্যায়ে (১৯৩২-৩৪) তাদের অংশগ্রহণ হ্রাস পায়।

প্রধান ভূমিকা –

মহারাষ্ট্র – শোলাপুরের বস্ত্রশিল্পের শ্রমিকরা গান্ধিজির গ্রেফতারের প্রতিবাদে ধর্মঘট করে এবং স্থানীয় প্রশাসন কার্যত অচল করে দেয়। বোম্বাইয়ের রেলওয়ে শ্রমিকরাও সক্রিয় অংশ নেয়।

বাংলা – কলকাতা, হাওড়া ও বালির পাটকল ও পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট করে এবং সরকারকে সৈন্য মোতায়েন করতে বাধ্য করে।

অন্যান্য অঞ্চল – করাচি বন্দর, মাদ্রাজের বস্ত্রশিল্প ও বিহারের খনিজ শিল্পের শ্রমিকরা সীমিত আকারে আন্দোলনে যোগ দেয়।

সীমাবদ্ধতা – শ্রমিকদের দাবিগুলো কংগ্রেসের ১১ দফা দাবিতে উপেক্ষিত হওয়ায় তাদের আগ্রহ ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় কমিউনিস্ট নেতাদের কারাবরণের ফলে শ্রমিক সংগঠনগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। গান্ধি-আরউইন চুক্তির ফলে আন্দোলন মাঝপথে স্থগিত হলে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে মনোবল ভেঙে পড়ে। সুতরাং, শ্রমিক শ্রেণি প্রথমদিকে আন্দোলনকে গতিশীল করলেও সংগঠন ও নীতিগত সমর্থনের অভাবে তাদের অংশগ্রহণ স্থায়ী ও সর্বাত্মক রূপ নিতে পারেনি।

উপবিভাগ ঘ.৪

৪.৭ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের যোগদানের চরিত্র বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: ভূমিকা – ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে শুরু হওয়া স্বদেশি আন্দোলন প্রথমদিকে ছিল নিয়মতান্ত্রিক। কিন্তু এই পথে সাফল্য না মিললে বাংলার যুবসমাজ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই আন্দোলনে নারীরাও সক্রিয় ও গৌণ—উভয় ভূমিকায় অংশ নেন।

বিপ্লববাদ প্রচারে নারী – স্বদেশি যুগে সরলাদেবী চৌধুরানী তাঁর বাড়িতে আখড়া খুলে যুবক-যুবতীদের অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ দেন। ভগিনী নিবেদিতা বিপ্লবীদের গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শেখার জন্য বই দিয়ে ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করে বিপ্লববাদ ছড়াতে সাহায্য করেন।

বিশিষ্ট নারী বিপ্লবীদের ভূমিকা –

ভগিনী নিবেদিতা – তিনি বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ও অনুশীলন সমিতিকে ম্যাৎসিনি, ক্রপটকিনের বই দিয়ে গেরিলা যুদ্ধের ধারণা দেন।

লীলা নাগ – ১৯২৩ সালে ‘দীপালি সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করে নারীদের সংগঠিত করেন এবং বিপ্লবী শ্রীসংঘের সদস্য হন।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার – সূর্য সেনের নেতৃত্বে ১৯৩২ সালে পাহাড়তলি ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করেন এবং আত্মহত্যা করে প্রথম নারী শহিদ হন।

কল্পনা দত্ত – চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পরিকল্পনায় অংশ নেন, পরে গ্রেফতার হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করেন।

নারীদের কার্যকলাপের ধরন – নারীরা সরাসরি সশস্ত্র অপারেশনে অংশ নিতেন (যেমন—বীণা দাস গভর্নর জ্যাকসকে গুলি করেন; শান্তি-সুনীতি স্টিভেনসকে হত্যা করেন)। অনেক নারী অস্ত্র মজুদ, বিপ্লবীদের আশ্রয়দান ও অর্থ সংগ্রহ ইত্যাদি গৌণ কাজেও যুক্ত ছিলেন (মনোরমা দেবী, ব্রহ্মময়ী সেন প্রমুখ)।

মূল্যায়ন – ঊনবিংশ-বিংশ শতকের রক্ষণশীল সমাজে নারীরা পারিবারিক ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে সীমিত আকারে হলেও সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ইতিহাস রচনা করেছেন। তাঁদের অংশগ্রহণ শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামেই নয়, নারী জাগরণেরও অন্যতম অধ্যায়।

৪.৮ ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে মাস্টারদা সূর্য সেনের ভূমিকা লেখো।

উত্তর: ভূমিকা – বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে মাস্টারদা সূর্য সেন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রদ্ধেয় নাম। চট্টগ্রামের একটি জাতীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় তিনি ‘মাস্টারদা’ উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ছিলেন এক নির্ভীক বিপ্লবী যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা করেছিলেন, যার সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শন হলো ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঐতিহাসিক ঘটনা।

মাস্টারদা সূর্য সেনের ভূমিকা ও বৈপ্লবিক কার্যকলাপ –

বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলা – সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন উৎখাতের লক্ষ্যে সূর্য সেন ১৯২৮ সালে ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ নামক একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। তিনি অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, অম্বিকা চক্রবর্তী, নির্মল সেন প্রমুখ তরুণ বিপ্লবীকে নিজের অধীনে সংগঠিত করেন।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (১৮ এপ্রিল, ১৯৩০) – এটি ছিল মাস্টারদার পরিকল্পিত সবচাইতে সাহসী ও বিখ্যাত অভিযান। এই দিন রাতে তিনি তার সহযোগী বিপ্লবীদের নিয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ লাইনস অস্ত্রাগার, ইউরোপীয় ক্লাবের টেলিফোন এক্সচেঞ্জ এবং অক্সিলারি ফোর্সের অস্ত্রাগার একসাথে আক্রমণ করে লুণ্ঠন করেন। এর মাধ্যমে তারা চট্টগ্রামকে কিছু সময়ের জন্য ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হন।

জালালাবাদের পাহাড়ের যুদ্ধ (২২ এপ্রিল, ১৯৩০) – অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বিপ্লবীদের ঘেরাও করে। সূর্য সেন ও তার সঙ্গীরা জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নেন। সেখানে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে তাদের তীব্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বহু ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হয় এবং ১১ জন বীর বিপ্লবী শহীদ হন।

ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ – মাস্টারদার অনুপ্রেরণায় ও পরিকল্পনায় তারই প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির সদস্যরা ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করে, যার প্রবেশদ্বারে ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’ লিখিত সাইনবোর্ড টাঙানো ছিল। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে এই আক্রমণ সফল হয়, তবে শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতা বন্দী হওয়া এড়াতে পটাশিয়াম সায়ানাইড খিয়ে আত্মাহুতি দেন।

অন্তর্ধান ও শেষ জীবন – ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে মাস্টারদা দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে থাকতে সক্ষম হন। কিন্তু শেষপর্যন্ত ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি একজন গদবাধঁ বিশ্বাসঘাতকের কারণে তিনি ধরা পড়েন। তার উপর মামলা চলার পর ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি তাকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেওয়া হয় এবং সেই বছরই ১২ জানুয়ারি (কোনো কোনো সূত্রমতে ১৩ জানুয়ারি) তিনি ফাঁসিতে ঝুলে মৃত্যুবরণ করেন।

উপসংহার – মাস্টারদা সূর্য সেন ছিলেন বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের এক প্রবাদপুরুষ। তার নেতৃত্বে সংঘটিত চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন কেবল একটি সশস্ত্র অপারেশনই ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ ও স্বাধীনতার ডাক। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার জালালাবাদের যুদ্ধকে “প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রথম দৃষ্টান্ত” বলে আখ্যায়িত করেছেন। মাস্টারদার আত্মত্যাগ ও সাহস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

বিভাগ-ঙ

৫. পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে যে-কোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর দাও:

৫.১ উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের চরিত্র ও প্রকৃতি আলোচনা করো।

উত্তর: উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ ছিল একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলন, যার চরিত্র ও প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। এর মূল বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি নিম্নরূপ –

চরিত্র ও প্রকৃতি –

শহরকেন্দ্রিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির আন্দোলন – এই জাগরণ মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, ধনী ব্যবসায়ী ও জমিদার শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই আন্দোলন থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। অধ্যাপক অনিল শীল একে “এলিটিস্ট আন্দোলন” বলে চিহ্নিত করেছেন।

ব্রিটিশ প্রভাব ও নির্ভরতা – এই জাগরণ পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ব্রিটিশ উদারনীতির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের মঙ্গলের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করতেন।

ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা – এটি মূলত হিন্দু সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং অনেকক্ষেত্রে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদের রূপ নেয়। ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের ভূমিকা গৌণ ছিল।

তিনটি প্রধান ধারা –

প্রাচ্য পুনরুজ্জীবনবাদী ধারা – রাধাকান্ত দেব, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার প্রমুখের নেতৃত্বে, যারা হিন্দু ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনে বিশ্বাসী ছিলেন।

পাশ্চাত্য যুক্তিবাদী ধারা – “নব্যবঙ্গ” গোষ্ঠীর নেতৃত্বে, যারা পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ ও মূল্যবোধের সম্পূর্ণ গ্রহণে আগ্রহী ছিলেন।

সমন্বয়বাদী ধারা – রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে, যারা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সর্বোত্তম উপাদানগুলির সমন্বয় কামনা করতেন।

বিতর্ক –

এই আন্দোলনকে “নবজাগরণ” আখ্যা দেওয়া নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে –

সমর্থকদের যুক্তি – যদুনাথ সরকার ও সুশোভন সরকার প্রমুখ একে নবজাগরণ বলে স্বীকার করেন। সরকার মনে করেন এটি ইউরোপীয় নবজাগরণের চেয়েও বেশি বৈপ্লবিক ছিল।

বিরোধীদের যুক্তি – অশোক মিত্র, বিনয় ঘোষ, সুপ্রকাশ রায় প্রমুখ একে “নবজাগরণ” বলে স্বীকার করেন না। তাদের মতে – এটি ছিল শহরকেন্দ্রিক ও পরজীবী ভূস্বামী শ্রেণির আন্দোলন। বিনয় ঘোষ একে “ঐতিহাসিক প্রবঞ্চনা” বলে অভিহিত করেন। ইউরোপের স্বাধীন বুর্জোয়া শ্রেণির বিপরীতে বাংলার নবজাগরণ ছিল ব্রিটিশ-পোষিত ও নির্ভরশীল।

উপসংহার – উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ ছিল একটি সীমিত, শহুরে, শিক্ষিত শ্রেণির বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ, যা সমাজের বৃহত্তর অংশকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। এটি প্রগতিশীল সংস্কার ও আধুনিকীকরণের সূচনা করলেও এর চরিত্র ছিল জটিল এবং এটি ইউরোপীয় নবজাগরণ থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন প্রকৃতির।

৫.২ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে ‘স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ’ বলা যায় কি? ΜΕ-’14

উত্তর: ভূমিকা – বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী বিনায়ক দামোদর সাভারকর তাঁর ‘The Indian War of Independence’ গ্রন্থে ১৮৫৭ -এর বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলা যায় কি না তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।

‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলা যায় কি –

পক্ষে যুক্তি – বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী বিনায়ক দামোদর সাভারকর ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে দাবি করেন। তাঁর মতে, এই বিদ্রোহে সিপাহিদের নেতৃত্বে ভারতীয়রা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে শামিল হয়েছিল। তাঁর এই মত সমর্থন করেছেন অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক সুশোভন সরকার, পি সি যোশি প্রমুখ। অধ্যাপক সুশোভন সরকারের মতে, ইটালির কার্বোনারি আন্দোলনকে যদি মুক্তিযুদ্ধ বলা যায়, তাহলে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকেও ভারতের মুক্তিযুদ্ধ বলা যাবে। অধ্যাপক পি সি যোশি তাঁর ‘1857 in Our History’ গ্রন্থে ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলেছেন।

বিপক্ষে যুক্তি – সুরেন্দ্রনাথ সেন, রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ ঐতিহাসিক ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে ভারতের স্বাধীনতার যুদ্ধ বলতে নারাজ। সুরেন্দ্রনাথ সেন তাঁর ‘Eighteen Fifty Seven’ গ্রন্থে বলেছেন যে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে কখনোই স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা যায় না। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর ‘History of Freedom Movement in India’ গ্রন্থে বলেছেন যে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে প্রথম ভারতীয় সংগ্রাম বা স্বাধীনতার যুদ্ধ কোনোটাই বলা যায় না। প্রকৃতপক্ষে মাতৃভূমিকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য যে সর্বজনীন আদর্শ ও লক্ষ্য থাকা দরকার তা ১৮৫৭-র বিদ্রোহে ছিল না।

মূল্যায়ন – উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ না বলা গেলেও স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি তৈরিতে এই বিদ্রোহ যে সহায়তা করেছিল এ কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

৫.৩ বিংশ শতকের ভারতে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের ভূমিকা আলোচনা করো। ΜΕ-’18

উত্তর: ভূমিকা – বিংশ শতকের শুরু থেকেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন কেবলমাত্র একটি জাতীয়তাবাদী সংগ্রামই ছিল না, বরং এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের আধারও হয়ে উঠেছিল। রুশ বিপ্লবের (১৯১৭) প্রভাবে উদ্ভূত বামপন্থী আদর্শ এই আন্দোলনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। বামপন্থীরা তাদের সংগ্রামকে কেবল ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং তারা একটি শোষণমুক্ত সাম্যবাদী সমাজ গঠনের লক্ষ্যেও অগ্রসর হয়। শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করে তারা উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের ভিতকে ব্যাপক ও গণভিত্তিক করে তোলে।

বামপন্থী দল ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠা –

১৯২০ সালে মানবেন্দ্রনাথ রায়, অবনী মুখার্জি প্রমুখের নেতৃত্বে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম গোড়াপত্তন ঘটে। ১৯২৫ সালে কানপুরে সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার, হসরৎ মোহানি প্রমুখ নেতাদের উদ্যোগে বিভিন্ন কমিউনিস্ট গোষ্ঠীকে একত্রিত করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।

উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের ভূমিকা –

গণসংগঠন গড়ে তোলা – বামপন্থীরা শিল্প শ্রমিকদের সংগঠিত করতে গিরনি কামগার ইউনিয়ন (১৯২৮), সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC) ইত্যাদি গড়ে তোলেন। কৃষকদের সংগঠিত করতে তারা অখিল ভারতীয় কিষান সভা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে কৃষক আন্দোলনের একটি শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হয়। ছাত্রদের মধ্যে কাজ করার জন্য সারা ভারত ছাত্র ফেডারেশন (AISF) গঠন করা হয়।

মতাদর্শগত সংগ্রাম ও প্রচার – ‘পূর্ণ স্বরাজ’-এর দাবি জাতীয় আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দাবি হয়ে উঠতে বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কংগ্রেসের অভ্যন্তর থেকে তারা ক্রমাগত এই দাবি উত্থাপন করতে থাকেন, যা ১৯২৯ সালের লাহোর কংগ্রেসে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব হিসেবে গৃহীত হয়। ‘লাঙল’, ‘গণবাণী’, ‘ক্রান্তি’, ‘কীর্তি’ ইত্যাদি পত্রিকা ও সাময়িকীর মাধ্যমে তারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও সাম্যবাদী চিন্তাধারা ব্যাপক হারে ছড়িয়ে দেন।

প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ও ব্রিটিশ দমননীতি –

সাইমন কমিশন বয়কট – ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বয়কট আন্দোলনে বামপন্থী নেতা-কর্মীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

শ্রমিক আন্দোলন – টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি, বঙ্গীয়-নাগপুর রেলওয়ে সহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সংগঠিত বড়ো ধর্মঘটগুলিতে বামপন্থীদের নেতৃত্ব ছিল।

ব্রিটিশ দমননীতি ও মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা – বামপন্থী আন্দোলন দমনের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯২৯ সালে ৩১ জন prominent বামপন্থী নেতাকে (এস.এ. ডাঙ্গে, মুজফফর আহমেদ, পি.সি. জোশি প্রমুখ) গ্রেপ্তার করে বেআইনি ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে। ১৯৩৪ সালে সরকার ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

কংগ্রেসের অভ্যন্তরে কাজ ও কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি – দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর অনেক বামপন্থী নেতা কংগ্রেসের মধ্যে থেকে কাজ চালিয়ে যান। ১৯৩৪ সালে গঠিত কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি (CSP)-এর মাধ্যমে তারা কংগ্রেসের অভ্যন্তরে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হন এবং শ্রমিক-কৃষকদের ইস্যুগুলোকে জাতীয় আন্দোলনের মূলস্রোতে নিয়ে আসেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভারত ছাড়ো আন্দোলন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে প্রথমদিকে বামপন্থীরা যুদ্ধকে ‘সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে বিরোধিতা করেন। কিন্তু ১৯৪১ সালে নাৎসি জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে তাদের নীতি পরিবর্তন হয় এবং তারা যুদ্ধকে ‘জনগণের যুদ্ধ’-এ পরিণত করার আহ্বান জানান। এই অবস্থানের কারণে ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনে’ তারা আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ করেনি, যা জাতীয়ist নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের একটি বড় মতভিন্নতা তৈরি করে।

সশস্ত্র কৃষক সংগ্রাম – স্বাধীনতার ঠিক পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে বামপন্থীরা বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সশস্ত্র কৃষক সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন, যেগুলো ছিল প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশবিরোধী ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণবিরোধী যুদ্ধ। তেলেঙ্গানা সশস্ত্র সংগ্রাম (১৯৪৬-৫১) ছিল ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৃষক বিদ্রোহ, যেখানে জমিদারি ও নিযামের শাসনের বিরুদ্ধে কৃষকরা অস্ত্র ধারণ করেছিল। তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬-৪৭) বাংলার ভাগচাষি কৃষকদের একটি বৃহৎ আন্দোলন ছিল, যেখানে ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ দাবি করা হয়।

নৌবিদ্রোহে ভূমিকা – ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহে কমিউনিস্ট নেতাকর্মীরা বিদ্রোহী নাবিকদের সঙ্গে সংযোগ রাখেন এবং বিদ্রোহের পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।

মূল্যায়ন – বিংশ শতকের ভারতে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। তারা জাতীয় আন্দোলনের লক্ষ্যকে কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটি জড়িত করেছিলেন। শ্রমিক ও কৃষকদের একটি বিশাল অংশকে সংগঠিত করে তারা আন্দোলনের ভিত্তিকে বিস্তৃত করেছিলেন। যদিও কংগ্রেসের মতো গণসংগঠনের তুলনায় তাদের সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত ছিল, তবুও তাদের মতাদর্শগত অবদান, সংগঠন দক্ষতা এবং প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তেলেঙ্গানা, তেভাগার মতো সংগ্রামগুলি ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাদের অনন্য অবদানের স্বাক্ষর রেখেছে।


MadhyamikQuestionPapers.com এ আপনি অন্যান্য বছরের প্রশ্নপত্রের ও Model Question Paper-এর উত্তরও সহজেই পেয়ে যাবেন। আপনার মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কেমন লাগলো, তা আমাদের কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আরও পড়ার জন্য, জ্ঞান অর্জনের জন্য এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য MadhyamikQuestionPapers.com এর সাথে যুক্ত থাকুন।

Tag Post :
Share This :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *