আপনি কি ২০২৬ সালের মাধ্যমিক ইতিহাস Model Question Paper 5 এর সমাধান খুঁজছেন? তাহলে আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন। এই আর্টিকেলে আমরা WBBSE-এর ইতিহাস ২০২৬ মাধ্যমিক Model Question Paper 5-এর প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক ও বিস্তৃত সমাধান উপস্থাপন করেছি।
প্রশ্নোত্তরগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা সহজেই পড়ে বুঝতে পারে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যবহার করতে পারে। ইতিহাস Model Question Paper 5 প্রশ্নপত্র ও তার সমাধান মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ও সহায়ক।
MadhyamikQuestionPapers.com, ২০১৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষার সমস্ত প্রশ্নপত্র ও সমাধান সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করে আসছে। ২০২৬ সালের সমস্ত মডেল প্রশ্নপত্র ও তার সঠিক সমাধান এখানে সবার আগে আপডেট করা হয়েছে।
আপনার প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করতে এখনই পুরো প্রশ্নপত্র ও উত্তর দেখে নিন!
Download 2017 to 2024 All Subject’s Madhyamik Question Papers
View All Answers of Last Year Madhyamik Question Papers
যদি দ্রুত প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজতে চান, তাহলে নিচের Table of Contents এর পাশে থাকা [!!!] চিহ্নে ক্লিক করুন। এই পেজে থাকা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর Table of Contents-এ ধারাবাহিকভাবে সাজানো আছে। যে প্রশ্নে ক্লিক করবেন, সরাসরি তার উত্তরে পৌঁছে যাবেন।
Questions
Toggleবিভাগ-ক
১. সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো:
১.১ ‘নদীয়া কাহিনী’ গ্রন্থটি রচনা করেন –
(ক) নিখিলনাথ রায়
(খ) কুমুদরঞ্জন মল্লিক
(গ) সতীশচন্দ্র মিত্র
(ঘ) কুমুদনাথ মল্লিক
উত্তর: (ঘ) কুমুদনাথ মল্লিক
১.২ ১৯১১ সালের IFA শিল্ড বিজয়ী মোহনবাগান দলের অধিনায়ক ছিলেন –
(ক) গোষ্ঠ পাল
(খ) শিবদাস ভাদুড়ি
(গ) চুনি গোস্বামী
(ঘ) শৈলেন মান্না
উত্তর: (খ) শিবদাস ভাদুড়ি
১.৩ কলকাতা মেডিকেল কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ –
(ক) ডা. এম জে ব্রামলি
(খ) ডা. এইচ এইচ গুডিভ
(গ) ডা. এন ওয়ালিশ
(ঘ) ডা. জে. গ্রান্ট
উত্তর: (ক) ডা. এম জে ব্রামলি
১.৪ কেশবচন্দ্র সেনকে ‘ব্রহ্মানন্দ’ উপাধি দেন-
(ক) স্বামী বিবেকানন্দ
(খ) রাধাকান্ত দেব
(গ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
(ঘ) শিবনাথ শাস্ত্রী
উত্তর: (গ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
১.৫ রেনেসাঁস’ শব্দটি হল একটি –
(ক) ইংরেজি শব্দ
(খ) ফরাসি শব্দ
(গ) ইতালীয় শব্দ
(ঘ) লাতিন শব্দ
উত্তর: (খ) ফরাসি শব্দ
১.৬ কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-৩২ খ্রি) অনুষ্ঠিত হয়েছিল-
(ক) মেদিনীপুরে
(খ) ঝাড়গ্রামে
(গ) ছোটোনাগপুরে
(ঘ) রাঁচিতে
উত্তর: (গ) ছোটোনাগপুরে
১.৭ নীল বিদ্রোহের সময় ভারতের বড়োলাট ছিলেন-
(ক) ওয়ারেন হেস্টিংস
(খ) লর্ড বেন্টিঙ্ক
(গ) লর্ড ডালহৌসি
(ঘ) লর্ড ক্যানিং
উত্তর: (ঘ) লর্ড ক্যানিং
১.৮ ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি রচিত হয় –
(ক) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে
(খ) ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে
(গ) ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে
(ঘ) ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে
উত্তর: (গ) ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে
১.৯ ভারতীয় ‘জাতীয়তাবাদের পিতামহ’ নামে পরিচিত ছিলেন-
(ক) রাজনারায়ণ বসু
(খ) নবগোপাল মিত্র
(গ) কালীপ্রসন্ন সিংহ
(ঘ) মাইকেল মধুসূদন দত্ত
উত্তর: (ক) রাজনারায়ণ বসু
১.১০ পুনা সার্বজনিক সভা তৈরি করেন-
(ক) রামকৃষ্ণ ভান্ডারকর
(খ) দাদাভাই নৌরজি
(গ) মহাদেব গোবিন্দ রানাডে
(ঘ) ঈশ্বরগুপ্ত
উত্তর: (গ) মহাদেব গোবিন্দ রানাডে
১.১১ বাংলা ভাষায় প্রথম ছাপা বই হল-
(ক) বর্ণপরিচয়
(খ) এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ
(গ) মঙ্গল সমাচার মতিয়ের
(ঘ) অন্নদামঙ্গল
উত্তর: (খ) এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ
১.১২ ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ স্থাপিত হয়-
(ক) ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ২ নভেম্বর
(খ) ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ নভেম্বর
(গ) ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর
(ঘ) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ নভেম্বর
উত্তর: (গ) ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর
১.১৩ মোপালা বিদ্রোহ (১৯২১) হয়েছিল-
(ক) মালাবার উপকূলে
(খ) কোঙ্কণ উপকূলে
(গ) গোদাবরী উপত্যকায়
(ঘ) তেলেঙ্গানা অঞ্চলে
উত্তর: (ক) মালাবার উপকূলে
১.১৪ ‘শের-ই-বাংলা’ নামে পরিচিত-
(ক) মানবেন্দ্রনাথ রায়
(খ) আবুল কাশেম ফজলুল হক
(গ) কাজী নজরুল ইসলাম
(ঘ) মুজফ্ফর আহমেদ
উত্তর: (খ) আবুল কাশেম ফজলুল হক
১.১৫ কানপুরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়-
(ক) ১৯০৫ সালে
(খ) ১৯২০ সালে
(গ) ১৯২৫ সালে
(ঘ) ১৯৪২ সালে
উত্তর: (গ) ১৯২৫ সালে
১.১৬ সূর্য সেন প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবী দলের নাম ছিল-
(ক) অনুশীলন সমিতি
(খ) গদর দল
(গ) ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি
(ঘ) বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স
উত্তর: (গ) ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি
১.১৭ দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় –
(ক) কলকাতায়
(খ) ঢাকায়
(গ) বহরমপুরে
(ঘ) শিলিগুড়িতে
উত্তর: (খ) ঢাকায়
১.১৮ আইন অমান্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন-
(ক) বীণা দাস
(খ) কমলাদেবী-চট্টোপাধ্যায়
(গ) কল্পনা দত্ত
(ঘ) রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
উত্তর: (খ) কমলাদেবী-চট্টোপাধ্যায়
১.১৯ স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারতের সবচেয়ে বড়ো দেশীয় রাজ্য ছিল –
(ক) কাশ্মীর
(খ) জুনাগড়
(গ) হায়দরাবাদ
(ঘ) জয়পুর
উত্তর: (গ) হায়দরাবাদ
১.২০ ‘উদ্বাস্তু’ গ্রন্থটি লেখেন-
(ক) ক্ষেত্রমোহন গুপ্ত
(খ) হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
(গ) শঙ্খ ঘোষ
(ঘ) বুদ্ধদেব বসু
উত্তর: (খ) হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
বিভাগ-খ
২. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ১৬টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
উপবিভাগ ২.১ একটি বাক্যে উত্তর দাও:
২.১.১ ভারতের প্রথম লিখিত ইতিহাস গ্রন্থ কোনটি?
উত্তর: ভারতের প্রথম লিখিত ইতিহাস গ্রন্থ হলো রাজতরঙ্গিনী।
২.১.২ বাংলার কোন্ শতককে ‘নবজাগরণের শতক’ বলা হয়? ME-17
উত্তর: বাংলার ১৯তম শতককে ‘নবজাগরণের শতক’ বলা হয়।
২.১.৩ ‘গোরা’ উপন্যাসটি কে রচনা করেন? ME-19
উত্তর: গোরা উপন্যাসটি রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
২.১.৪ ভারতের স্বাধীনতাকালে কাশ্মীরের শাসক কে ছিলেন?
উত্তর: ভারতের স্বাধীনতার সময় কাশ্মীরের শাসক ছিলেন মহারাজা হরি সিং।
উপবিভাগ ২.২ ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো:
২.২.১ জনশিক্ষা কমিটির সভাপতি ছিলেন টমাস ব্যাবিংটন মেকলে।
উত্তর: ঠিক
২.২.২ মির নিশার আলি বাঁশের কেল্লা বানিয়েছিলেন।
উত্তর: ঠিক
২.২.৩ বাবা রামচন্দ্র ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের নেতা। ME-20
উত্তর: ভুল
২.২.৪ বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ছিলেন সরোজিনী নাইডু।
উত্তর: ভুল
উপবিভাগ ২.৩ ‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | (১) বেঙ্গল ন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ |
| ২.৩.২ শশীভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় | (২) বঙ্গদর্শন |
| ২.৩.৩ অরবিন্দ ঘোষ | (৩) হেমচন্দ্র ঘোষ |
| ২.৩.৪ বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স | (৪) ব্রাহ্মসমাজ |
উত্তর:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | (২) বঙ্গদর্শন |
| ২.৩.২ শশীভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় | (৪) ব্রাহ্মসমাজ |
| ২.৩.৩ অরবিন্দ ঘোষ | (১) বেঙ্গল ন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ |
| ২.৩.৪ বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স | (৩) হেমচন্দ্র ঘোষ |
উপবিভাগ ২.৪ প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখা মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত করো ও নামাঙ্কিত করো:
২.৪.১ বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনের একটি কেন্দ্র – বারাসত
২.৪.২ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) একটি কেন্দ্র – মিরাট
২.৪.৩ আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনাস্থল
২.৪.৪ মাদ্রাজ
উত্তর:
উপবিভাগ ২.৫ নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন করো:
২.৫.১ বিবৃতি: তিতুমির তাঁর অনুগামীদের দাড়ি রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ব্যাখ্যা ১: তিনি তাদের ছদ্মবেশ ধারণ করতে উৎসাহ দিতে চেয়েছিলেন।
ব্যাখ্যা ২: তিনি দাড়ি রাখা পছন্দ করতেন।
ব্যাখ্যা ৩: এটি ছিল তাঁর অনুগামীদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের চিহ্ন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: এটি ছিল তাঁর অনুগামীদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের চিহ্ন।
২.৫.২ বিবৃতি: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ব্যঙ্গচিত্রগুলিতে বাঙালি বাবুদের সমালোচনা করেছেন।
ব্যাখ্যা ১: বাঙালি বাবুরা পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুরাগী ছিলেন।
ব্যাখ্যা ২: বাঙালি বাবুরা শিক্ষিত ছিলেন।
ব্যাখ্যা ৩: বাঙালি বাবুরা ধনী ছিলেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ১: বাঙালি বাবুরা পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুরাগী ছিলেন।
২.৫.৩ বিবৃতি: একা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল উত্তরপ্রদেশে।
ব্যাখ্যা ১: এটি ছিল ব্যক্তিগত আন্দোলন।
ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল একটি কৃষক আন্দোলন।
ব্যাখ্যা ৩: এটি ছিল একটি শ্রমিক আন্দোলন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল একটি কৃষক আন্দোলন।
২.৫.৪ বিবৃতি: ভারতীয় নারীরা জাতীয় আন্দোলনে প্রথম অংশ নিয়েছিল বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়।
ব্যাখ্যা ১: কারণ, তারা গান্ধিজির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
ব্যাখ্যা ২: কারণ, তারা অরবিন্দ ঘোষের বিপ্লবী ভাবধারার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
ব্যাখ্যা ৩: কারণ, তারা বিদেশি দ্রব্য বর্জন করতে চেয়েছিল।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: কারণ, তারা বিদেশি দ্রব্য বর্জন করতে চেয়েছিল।
বিভাগ-গ
৩. দুটি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (যে-কোনো ১১টি)
৩.১ ‘সরকারি নথিপত্র’ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: ‘সরকারি নথিপত্র’ বলতে বোঝায় – পুলিশ বিভাগের রিপোর্ট ও জরুরি চিঠিপত্র, গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট ও বিভিন্ন তথ্য এবং সরকারি আধিকারিকদের লেখা গোপন ও প্রকাশ্য চিঠিপত্র, প্রতিবেদন, বিবরণ, সমীক্ষা, নোটিশ প্রভৃতি। এইসব নথিপত্র থেকে সরকারের মনোভাব, পদক্ষেপ, উদ্যোগ প্রভৃতি জানার পাশাপাশি ওই নির্দিষ্ট ঘটনা সম্পর্কে তথ্য, যেমন হান্টার কমিশনের রিপোর্ট থেকে শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয়, নীল কমিশনের রিপোর্ট থেকে কৃষক বিদ্রোহের কথা পাওয়া যায়। সরকারি নথিপত্রগুলি সরকারের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখা হয় বলে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গী উপেক্ষিত থাকে এবং অনেকক্ষেত্রে বিকৃত তথ্যের উপস্থাপনা ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
৩.২ ‘বঙ্গদর্শনের যুগ’ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: বঙ্গদর্শনের যুগ বলতে বোঝায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাকে, যেখানে কেবল সাহিত্য নয়, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, ধর্ম, বিজ্ঞান, কৃষি এবং বাঙালির জীবনধারার নানা দিক নিয়ে লেখা প্রকাশিত হতো। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের চর্চায় পারদর্শী ছিলেন এবং তাঁর পত্রিকা বাংলার মানসিক জাগরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিপিনচন্দ্র পাল 1870-এর দশককে ‘বঙ্গদর্শনের যুগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৩.৩ স্কুল বুক সোসাইটি কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার প্রধান কারণগুলি নিম্নরূপ –
পাঠ্যপুস্তকের অভাব দূর করা – অষ্টাদশ শতকের শেষ দিক থেকে বাংলায় বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত পাঠ্যপুস্তকের তীব্র অভাব দেখা দেয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্যই ১৮১৭ সালে ডেভিড হেয়ার কলকাতায় স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন।
পাঠ্যপুস্তক রচনা ও বিতরণ – এই সোসাইটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা, মুদ্রণ এবং স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেগুলি বিতরণ করা।
শিক্ষার মানোন্নয়নে গবেষণা – সোসাইটি শুধু বই প্রকাশেই সীমিত থাকেনি; এটি ক্ষেত্র সমীক্ষারও কাজ করত। উদাহরণস্বরূপ, ১৮১৮-১৯ সালের একটি সমীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার দুরবস্থার প্রমাণ মিলেছিল, যা পরবর্তীতে পাঠশালার উন্নতিতে সহায়ক হয়েছিল।
৩.৪ তিন আইন কী?
উত্তর: উনিশ শতকে বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ফলস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে যে বিশেষ আইনটি পাস করে, সেটিই তিন আইন নামে পরিচিত। এই আইনের তিনটি প্রধান বিধান ছিল – ১. বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধকরণ ২. বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ ৩. অসবর্ণ বিবাহকে আইনসিদ্ধ করা এই আইনটি রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগ এবং পরবর্তীতে কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ছিল।
৩.৫ চুয়াড় বিদ্রোহের (১৭৯৮-৯৯) গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর: ১৭৯৮-৯৯ সালের চুয়াড় বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসন ও শোষণ বিরোধী একটি গুরুত্বপূর্ণ আদিবাসী কৃষক বিদ্রোহ, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিম্নরূপ –
প্রশাসনিক পরিবর্তন – এই বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার বিদ্রোহ দমনে ও চুয়াড়দের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য একটি বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে। বিষ্ণুপুর শহরকে কেন্দ্র করে দুর্গম বনাঞ্চল নিয়ে ‘জঙ্গলমহল’ নামে একটি বিশেষ জেলা গঠন করা হয়।
পরবর্তী বিদ্রোহের অনুপ্রেরণা – এটি ছিল কোম্পানি শাসনের প্রথম দিকের একটি সংগঠিত আদিবাসী বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ পরবর্তীকালে সংগঠিত বিভিন্ন কৃষক ও আদিবাসী বিদ্রোহের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণাস্বরূপ হয়ে ওঠে।
জাতীয় আন্দোলনের পূর্বসূরী – চুয়াড় বিদ্রোহে জমিদার ও নিরক্ষর চুয়াড় কৃষকরা ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। তাদের এই স্বাধীকারের সংগ্রাম যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, তা প্রায় একশো বছর পরে শিক্ষিত সম্প্রদায় উপলব্ধি করেন এবং তা পরোক্ষভাবে ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয় আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্রেরণা জোগায়।
৩.৬ বিরসা মুন্ডা কে ছিলেন?
উত্তর: বিরসা মুণ্ডা ছিলেন একজন আদিবাসী মুণ্ডা নেতা এবং মুণ্ডা বিদ্রোহের (১৮৯৯-১৯০০) প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগঠিত এই বিদ্রোহের মাধ্যমে ছোটোনাগপুর অঞ্চলের আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করেছিলেন।
৩.৭ উনিশ শতকে জাতীয়তাবাদের উন্মেষে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটির কীরূপ অবদান ছিল?
উত্তর: ভূমিকা – ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে সাহিত্যের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) উপন্যাসটি একটি যুগান্তকারী অবদান রেখেছিল, যা ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় চেতনার স্ফুরণ ও সংহতি তৈরিতে সাহায্য করে।
‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের অবদান –
দেশাত্মবোধের প্রকাশ – ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও স্বদেশপ্রেমের চিত্র ফুটে উঠেছে। এটি ভারতবাসীর মনে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করতে সাহায্য করে।
বন্দেমাতরম্ মন্ত্র – এই উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত “বন্দেমাতরম্” গানটি পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের মূল মন্ত্র ও প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়। এটি দেশমাতৃকাকে উপাসনার মাধ্যমে জাতীয় একতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
সন্ন্যাসী বিদ্রোহের আদর্শ – উপন্যাসে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কাহিনির মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শ ও ত্যাগের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে, যা পরাধীন ভারতের যুবসমাজকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে।
জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রসার – ‘আনন্দমঠ’ জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে জনপ্রিয় করে তোলে এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসসহ বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী সংগঠনে এর প্রভাব লক্ষণীয় হয়।
উপসংহার – ‘আনন্দমঠ’ কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়, বরং ঊনবিংশ শতকের জাতীয় জাগরণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল। এটি ভারতীয়দের মধ্যে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে গভীর ও স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে।
৩.৮ ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট কী?
উত্তর: ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট বা দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন ছিল ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট (১৮৭৮) হল ব্রিটিশ ভারতে প্রণীত একটি আইন যা দেশীয় বা স্থানীয় ভাষার সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও দমনের উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এই আইনের প্রধান বিধানগুলি ছিল –
১. কোনো দেশীয় ভাষার সংবাদপত্র সরকার-বিরোধী কোনো সংবাদ বা রচনা প্রকাশ করলে তার সম্পাদক ও প্রকাশক শাস্তি পেতে পারতেন।
২. কোনো সরকারি কর্মচারী অনুমতি ছাড়া সংবাদপত্রে লিখতে পারতেন না।
এই আইনটি প্রণয়নের পিছনে মূল কারণ ছিল উনবিংশ শতকে দেশীয় সংবাদপত্রগুলির ব্রিটিশ সরকারের শোষণ, দেশীয় শিল্পের অবক্ষয়, দাক্ষিণাত্যের দুর্ভিক্ষ, ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ ইত্যাদির কঠোর সমালোচনা, যা সরকারকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছিল। ভাইসরয় লর্ড লিটন ১৮৭৮ সালের ১৪ই মার্চ এই আইন জারি করেন। এই আইনটি ভারতীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং এটি “কালা আইন” নামে পরিচিত হয়। ভারত সভা এই আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করে। শেষ পর্যন্ত, লর্ড রিপনের শাসনামলে ১৮৮২ সালের ২৮শে জানুয়ারি এই আইনটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
৩.৯ জাতীয় শিক্ষা পরিষদ কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণ ছিল — বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ই মার্চ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে “জাতীয় শিক্ষা পরিষদ” প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়তাবাদী সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা দানের মাধ্যমে দেশের শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী করে তোলা এবং জাতীয়স্বার্থবিরোধী ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প একটি জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। পাশাপাশি মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান, নৈতিক শিক্ষা ও জাতীয়তাবোধের প্রসার ঘটিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে একটি মহান জাতি হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।
৩.১০ উইলিয়ম কেরি স্মরণীয় কেন?
উত্তর: উইলিয়াম কেরি ছিলেন একজন বিশিষ্ট মিশনারি ও বাংলা পাঠ্যপুস্তকের পথিকৃৎ। খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারে তিনি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাংলায় খ্রিস্টান মিশনারির কাজ পরিচালনার জন্য তিনি এ দেশে আসেন। ১৮০১ সালে তিনি ‘বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা গদ্যের কথোপকথন’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন, এবং ১৮১২ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘ইতিহাসমালা’। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য উন্নয়নে তিনি অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।
৩.১১ একা আন্দোলন শুরু হয় কেন?
উত্তর: অসহযোগ আন্দোলনের সময় (১৯২১–১৯২২ খ্রিস্টাব্দে) যুক্তপ্রদেশের (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) একজন বিশিষ্ট কৃষক নেতা ছিলেন অনুন্নত সম্প্রদায়ভুক্ত মাদারি পাশি। তাঁর নেতৃত্বে যুক্তপ্রদেশের হরদই, বারাবাঁকি, সীতাপুর, বারাইচ ইত্যাদি অঞ্চলে “একা আন্দোলন” বা “একতা আন্দোলন” গড়ে ওঠে।
“একতা” বা “একা” সমাবেশে কৃষকরা কয়েকটি শপথ গ্রহণ করেছিল —
(১) তারা নির্ধারিত সময়ে কর দেবে, কিন্তু অতিরিক্ত কর প্রদান করবে না;
(২) জমি থেকে উৎখাত করা হলেও জমি ছেড়ে যাবে না;
(৩) বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দেবে না (বেগার শ্রম দান করবে না);
(৪) কোনো অপরাধীকে সাহায্য করবে না।
এই আন্দোলনে কৃষকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল মূলত অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়, অন্যায় উচ্ছেদ, বাড়তি কর চাপানো ও বেগার শ্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাস নাগাদ সরকার কঠোর দমননীতি গ্রহণ করে এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়।
৩.১২ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে দ্বিজ বলা হয় কেন?
উত্তর: “দ্বিজ” শব্দটি সংস্কৃত ভাষার, যার অর্থ “দু’বার জন্মগ্রহণকারী”। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা Communist Party of India (CPI) -কে “দ্বিজ” বলা হয়, কারণ এই দলটি দুটি পৃথক সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথমবার এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২০ সালের ১৭ই অক্টোবর, সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দ শহরে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের উদ্যোগে। দ্বিতীয়বার প্রতিষ্ঠা ঘটে ভারতের মাটিতে, ১৯২৫ সালের ২৬শে ডিসেম্বর কানপুরে—যেখানে মুজফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, সিঙ্গারাভেলু চেট্টেয়ার প্রমুখ বামপন্থী নেতা উদ্যোগী ভূমিকা নেন। দলের প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এস. বি. ঘাটে।
৩.১৩ অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
উত্তর: অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ছাত্রসমাজের উপর সরকারের দমননীতি ও ‘কার্লাইল সার্কুলার’-এর প্রতিবাদে। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বন্ধ করার জন্য বাংলার প্রধান সচিব আর. ডব্লিউ. কার্লাইল ১৯০৫ সালের ১০ অক্টোবর এক নির্দেশনামা জারি করেন, যা ‘কার্লাইল সার্কুলার’ নামে পরিচিত। এই সার্কুলার অনুযায়ী সরকার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের বৃত্তি ও বিদ্যালয়ের অনুমোদন বাতিল এবং বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করার নির্দেশ দেয়। এর ফলে বহু ছাত্র বহিষ্কৃত হয়। সরকারের এই দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে এবং বহিষ্কৃত ছাত্রদের বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে সিটি কলেজের ছাত্রনেতা শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু ১৯০৫ সালের ৪ নভেম্বর অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন।
সংক্ষেপে – অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি গঠিত হয়েছিল কার্লাইল সার্কুলারের প্রতিবাদে, ছাত্রদের স্বদেশি আন্দোলনে অংশগ্রহণে উৎসাহ দিতে, বহিষ্কৃত ছাত্রদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে এবং জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে।
৩.১৪ কবে, কাদের মধ্যে পুনা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়?
উত্তর: ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের পুণার যারবেদা সেন্ট্রাল জেলে মহাত্মা গান্ধিজি ও ড. বি. আর. আম্বেদকরের মধ্যে পুণা চুক্তি (Poona Pact) স্বাক্ষরিত হয়।
৩.১৫ দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির দলিল বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ভারত সংযুক্তিকরণ চুক্তিটি প্রণয়ন করেছিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। স্বাধীনতার পূর্বে ভারতে প্রায় ৬০১টি ক্ষুদ্র রাজ্য বিদ্যমান ছিল। এই বিচ্ছিন্ন অবস্থার ফলে সৃষ্ট নানা সমস্যা থেকে দেশকে মুক্ত করতে প্যাটেল সব রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করেন। তিনি বিভিন্ন রাজ্যের শাসকদের আহ্বান জানান যাতে তারা ভারত সংযুক্তিকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এক শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ ভারত গঠনে সহায়তা করেন। এ জন্য তাঁদের নির্দিষ্ট ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।
৩.১৬ রাজাকার বাহিনী কী?
উত্তর: দেশীয় রাজ্য হায়দরাবাদের শাসক ছিলেন নিজাম ওসমান আলি খান। হায়দরাবাদের শাসক মুসলমান হলেও এখানকার প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রজা হিন্দু ছিল এবং তারা ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার পক্ষে ছিল। এই সময়ে নিজাম ওই হিন্দু প্রজাদের দমন করার উদ্দেশ্যে একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক সশস্ত্র বাহিনী গঠন করেন, যা রাজাকার নামে পরিচিত। এই রাজাকার বাহিনী হায়দরাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকায় সন্ত্রাসের শাসন কায়েম করেছিল।
বিভাগ-ঘ
৪. সাত বা আটটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
উপবিভাগ ঘ.১
৪.১ উডের নির্দেশনামা (১৮৫৪) -কে এদেশের শিক্ষাবিস্তারের ‘মহাসনদ’ বলা হয় কেন?
উত্তর: উডের নির্দেশনামা (১৮৫৪)-কে এদেশের শিক্ষাবিস্তারের ‘মহাসনদ’ বা ‘ম্যাগনা কার্টা’ বলা হয় নিম্নলিখিত কারণে –
প্রথম সামগ্রিক শিক্ষানীতি – এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের জন্য প্রথম কোনো সুসংহত ও সামগ্রিক শিক্ষানীতি। এর আগে পর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে যা কিছু সংস্কার হয়েছিল, সেগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। উডের ডেসপ্যাচে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ কাঠামো প্রস্তাব করা হয়।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন – এটি ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, শিক্ষা বিভাগ গঠন, অনুদান প্রথা চালু, এবং বৃত্তিমূলক ও স্ত্রী শিক্ষার উপর গুরুত্বারোপ—এই সবকিছুই পরবর্তীকালের ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
সমন্বয় সাধন – এটি শিক্ষার লক্ষ্য, বিষয়বস্তু ও মাধ্যম নিয়ে চলমান বিতর্ক ও মতবাদের মধ্যে একটি সুষ্ঠু সমন্বয় সাধন করে। একদিকে যেমন পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করা হয়, অন্যদিকে মাতৃভাষায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার উপরও জোর দেওয়া হয়।
কাঠামোগত বিপ্লব – ডেসপ্যাচের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত বিপ্লব সাধিত হয়। কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, শিক্ষা পরিচালক (DPI) নিয়োগ এবং একটি বিকেন্দ্রীকৃত কিন্তু সমন্বিত শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তোলা এর অন্তর্ভুক্ত।
পরবর্তী উন্নয়নের ভিত্তি – পরবর্তী প্রায় একশো বছর ধরে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার যাবতীয় সংস্কার ও উন্নয়ন এই ডেসপ্যাচের প্রস্তাবিত কাঠামোকেই ভিত্তি করে এগিয়ে যায়। এটি শুধু একটি নথিই ছিল না, বরং একটি জীবন্ত দলিল যা ভবিষ্যতের পথ নির্দেশ করেছিল।
সুতরাং, এর ব্যাপকতা, মৌলিকত্ব এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণেই উডের নির্দেশনামাকে ভারতের শিক্ষাবিস্তারের ‘মহাসনদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
৪.২ নব্যবঙ্গ আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা কী ছিল?
উত্তর: নব্যবঙ্গ আন্দোলনের প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলি নিম্নরূপ –
উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব – ডিরোজিওর অকাল মৃত্যুর পর গোষ্ঠীটি একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল নেতৃত্ব হারায়। এর ফলে আন্দোলন দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সদস্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কার্যকর কর্মসূচির অভাব – তাদের ধারণা ও কর্মকাণ্ড ছিল অতি-উগ্র ও আবেগপ্রবণ, যা বৃহত্তর বাঙালি সমাজকে আকর্ষণ করতে পারেনি। বরং রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে ভয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
শহরকেন্দ্রিকতা – এই আন্দোলন কেবলমাত্র ইংরেজি-শিক্ষিত কলকাতাকেন্দ্রিক শহুরে বুদ্ধিজীবী ও তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ বা সাধারণ মানুষের কাছে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
হিন্দু ধর্মের প্রতি অন্ধবিরোধিতা – তারা হিন্দু সমাজের কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার বিরোধিতা করতে গিয়ে সমগ্র হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ পোষণ করতে থাকে। ফলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও তারা সমর্থন হারায়।
কৃষক ও গণমানুষের প্রতি উদাসীনতা – নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী কৃষক ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা দেখায়নি। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী এই আন্দোলন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করে।
এই সীমাবদ্ধতাগুলির কারণে নব্যবঙ্গ আন্দোলন একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠীর বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন হিসেবেই থেকে যায় এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়।
উপবিভাগ ঘ.২
৪.৩ ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন ভারতের আদিবাসী জনগণের বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল – মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার তাদের সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য একের পর এক অরণ্য আইন প্রণয়ন করেছিল। এই আইনগুলো ভারতের আদিবাসী (জনজাতীয়) সম্প্রদায়গুলির জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও জীবিকার উপর এক গভীর আঘাত হানে, যা তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাপক বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
অরণ্য আইনের ক্রমবিকাশ ও উদ্দেশ্য –
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৫৫ সালে একটি ‘অরণ্য সনদ’ পাস করে ভারতের বনাঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করে। ১৮৬৫ সালে প্রথম ভারতীয় অরণ্য আইন, ১৮৭৮ সালে দ্বিতীয় অরণ্য আইন এবং ১৯২৭ সালে তৃতীয় অরণ্য আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণকে কঠোর ও বিস্তৃত করা হয়। এই আইনগুলোর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রয়োজনে, বিশেষ করে রেলওয়ে সম্প্রসারণ (স্লিপার তৈরির জন্য) ও জাহাজ নির্মাণের জন্য ভারতের মূল্যবান বনসম্পদকে রক্ষিত (Reserved) ও সংরক্ষিত বন হিসেবে চিহ্নিত করে তার ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
আদিবাসীদের জীবিকা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত –
আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকা প্রকৃতির, বিশেষ করে অরণ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। ব্রিটিশ অরণ্য আইন সেই সম্পর্ককে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে এবং নিম্নলিখিত উপায়ে তাদের ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে –
জীবিকা ও বসবাসের অধিকার হরণ – আদিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বনকে তাদের বাসস্থান ও জীবিকার উৎস হিসেবে দেখে আসছিল। অরণ্য আইন তাদের বন থেকে কাঠ সংগ্রহ, ফলমূল আহরণ, মধু সংগ্রহ এবং এমনকি বনাঞ্চলে বসবাসের ঐতিহ্যগত অধিকারই কেড়ে নেয়। এটি তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।
ঝুম চাষ (স্থানান্তরিত কৃষি) নিষিদ্ধকরণ – আদিবাসী সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ তাদের প্রধান কৃষিপদ্ধতি হিসেবে ঝুম চাষের উপর নির্ভরশীল ছিল। ব্রিটিশ সরকার এই চাষপদ্ধতিকে বন ধ্বংসকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তা নিষিদ্ধ করে দেয়। এটি কৃষি ভিত্তিক তাদের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত করে তোলে।
জমির উপর কর আরোপ ও মালিকানা স্বত্ব অস্বীকার – আদিবাসীরা মনে করত যে অরণ্য পরিষ্কার করে তারা যে জমি চাষযোগ্য করে তুলেছে, তা তাদেরই। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার সেই জমির উপর রাজস্ব (কর) আরোপ করে এবং তাদের ঐতিহ্যগত মালিকানা স্বত্বকে অস্বীকার করে। এটি তাদের কাছে অত্যন্ত অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য মনে হয়।
দিকুদের (বহিরাগত) অত্যাচারে বৃদ্ধি – অরণ্য আইন কার্যকর করার জন্য ব্রিটিশ সরকার বন-দপ্তরের কর্মচারী, ঠিকাদার এবং মহাজনদের (যাদের আদিবাসীরা ‘দিকু’ বলে অভিহিত করত) ক্ষমতা দেয়। এই দিকুরা আদিবাসীদের ওপর শোষণ, জুলুম ও উৎপীড়ন চালাতে থাকে, যা তাদের ক্ষোভকে আরও তীব্রতর করে।
বিদ্রোহের প্রকাশ –
উপরোক্ত কারণগুলো সম্মিলিতভাবে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে প্রবল অসন্তোষ ও হতাশার সৃষ্টি করে। তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিদ্রোহই হয়ে ওঠে একমাত্র পথ। এই অরণ্য আইন ও ভূমি-রাজস্ব নীতির বিরুদ্ধেই ১৮ম ও ১৯শ শতকে একের পর এক আদিবাসী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। যেমন – চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৬৮-১৮৩৩), কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-১৮৩৩), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-১৮৫৬) এবং বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৯৯-১৯০০)। এই বিদ্রোহগুলো ছিল তাদের জমি, জঙ্গল ও স্বাধীনতার অধিকার ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম।
উপসংহার –
সুতরাং, এটা স্পষ্ট যে ব্রিটিশদের অরণ্য আইন কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ‘পরিবেশগত সাম্রাজ্যবাদের’ (Ecological Imperialism) হাতিয়ার, যা আদিবাসীদের তাদের নিজস্ব ভূমি ও সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। তাদের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির মেরুদণ্ডই ছিল অরণ্য। এই অরণ্যকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থাকে ধ্বংস করার মাধ্যমেই ব্রিটিশ সরকার আদিবাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছিল। আদিবাসীদের এই সংগ্রাম ছিল ঔপনিবেশিক শোষণ ও তাদের অস্তিত্বের অধিকার রক্ষার এক ট্র্যাজিক অধ্যায়।
৪.৪ মুন্ডা বিদ্রোহের কারণ আলোচনা করো।
উত্তর: ভূমিকা – ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ আদিবাসী বিদ্রোহগুলির মধ্যে মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৯৯-১৯০০) অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। ছোটনাগপুর অঞ্চলের মুন্ডা সম্প্রদায় তাদের নেতা বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ সংঘটিত করে। এই বিদ্রোহের পিছনে নানাবিধ অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণ কাজ করেছিল।
মুন্ডা বিদ্রোহের কারণ –
মুন্ডা বিদ্রোহের কারণগুলি নিম্নরূপ –
ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তন ও খুৎকাঠি প্রথার অবসান – মুন্ডা সমাজের ভূমি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল খুৎকাঠি প্রথা। এটি ছিল একটি যৌথ গোষ্ঠীগত ভূমিমালিকানার ব্যবস্থা, যেখানে সম্প্রদায়ের সদস্যদের জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা না থাকলেও চাষাবাদের স্বত্ব ছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা তাদের রাজস্ব ব্যবস্থা চালু করার জন্য জমিদারি প্রথা প্রবর্তন করে। এর ফলে বহিরাগত জমিদার ও মহাজনদের (যাদের মুন্ডারা ‘দিকু’ বলত) হাতে জমির মালিকানা চলে যায়। মুন্ডাদের ঐতিহ্যবাহী যৌথ মালিকানার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গেলে তারা নিজেদের জমি থেকেই উৎখাত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এটি বিদ্রোহের একটি মুখ্য কারণ ছিল।
জমি থেকে উৎখাত ও ভূমি হস্তান্তর – ব্রিটিশ ভূমি বন্দোবস্তের সুযোগ নিয়ে বহিরাগত জমিদার ও মহাজনরা কূটকৌশল, জালিয়াতি ও ঋণের ফাঁদে ফেলে মুন্ডাদের কাছ থেকে তাদের জমি ছিনিয়ে নিতে শুরু করে। মুন্ডারা ক্রমাগত ভূমিহীন হয়ে শুধুমাত্র ভাগচাষি বা খাটিয়া শ্রমিকে পরিণত হয়। নিজস্ব জমি ও সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এই প্রক্রিয়া তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
বেগার প্রথা ও শোষণ – ব্রিটিশ সরকার, জমিদার এবং মহাজনরা মুন্ডাদের ওপর বেঠবেগারি বা বিনা মজুরিতে জোরপূর্বক শ্রম (বেগার) চাপিয়ে দেয়। এই নির্যাতনমূলক প্রথা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
মহাজনী শোষণ – বহিরাগত মহাজনরা মুন্ডাদের কাছে ঋণের সুযোগে চড়া হারে সুদ আদায় করত। ফসল বন্ধক রেখে বা জমি হস্তান্তর করে ঋণ শোধ করতে বাধ্য হওয়া মুন্ডারা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে।
সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আঘাত –
ঐতিহ্যগত ব্যবস্থার বিলোপ – ব্রিটিশরা মুন্ডাদের স্বশাসিত গ্রামীণ পরিষদ ও তাদের চিরাচরিত আইন-কানুন (যা সর্দার বা গ্রামপ্রধানদের মাধ্যমে পরিচালিত হত) বাতিল করে তাদের নিজস্ব আইন ও আদালত ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়। এর ফলে মুন্ডাদের স্বায়ত্তশাসন ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।
খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যকলাপ – খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকরা মুন্ডাদের ধর্মান্তরিত করতে শুরু করে। অনেক মুন্ডার ধারণা ছিল যে এটি তাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার একটি চক্রান্ত। এটি মুন্ডা সমাজে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
বিরসা মুন্ডার ভূমিকা ও ধর্মীয় সংস্কার – বিরসা মুন্ডা এই বিদ্রোহের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি শুরুতে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হলেও পরে মুন্ডাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মে ফিরে আসেন এবং একটি নতুন ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি নিজেকে ‘ধরতি আবা’ (ধরণীর পিতা) হিসেবে ঘোষণা করেন এবং মুন্ডারাজ বা মুন্ডাদের স্বাধীন রাজত্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তার বাণী ও নেতৃত্ব মুন্ডাদের মধ্যে নতুন আশা ও সংগ্রামের চেতনা জাগ্রত করে। তিনি মুন্ডাদের একতা, শৃঙ্খলা এবং ব্রিটিশ শাসন ও ‘দিকু’দের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেন।
উপসংহার – মুন্ডা বিদ্রোহ ছিল মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি, ভূমি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক স্বতঃস্ফূর্ত আদিবাসী প্রতিক্রিয়া। যদিও এই বিদ্রোহ সামরিকভাবে ব্যর্থ হয়, তবুও এটি ব্রিটিশ শাসকদের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের প্রশাসনিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে এবং পরবর্তীকালে ছোটনাগপুর টেনান্সি অ্যাক্ট (১৯০৮) প্রণয়নের পথ সুগম করে। বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে সংঘটিত এই বিদ্রোহ ভারতের আদিবাসী সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় রচনা করেছে।
উপবিভাগ ঘ.৩
৪.৫ ভারতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিকাশে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অবদান আলোচনা করো।
উত্তর: ভূমিকা – বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, যখন ভারতীয়দের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ সীমিত ছিল, তখন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠা করেন “বসু বিজ্ঞান মন্দির” (Bose Institute) ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। এটি ছিল একটি স্বাধীন ও স্বদেশি আদর্শে গড়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা ভারতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিকাশে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করে।
ভারতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিকাশে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অবদান –
বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অবদানকে নিম্নলিখিত কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করা যায় –
স্বাধীন ও বিশ্বমানের গবেষণার সূচনা – জগদীশচন্দ্র বসুর মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেখানে বিশ্বমানের গবেষণা করা সম্ভব হবে। এটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল না থেকেই স্বাধীনভাবে উচ্চস্তরের গবেষণা চালানোর সুযোগ পান। এর মাধ্যমে ভারতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।
আন্তঃশাস্ত্রীয় গবেষণার পথিকৃৎ – বসু বিজ্ঞান মন্দিরে একসঙ্গে উদ্ভিদবিদ্যা, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, বায়োফিজিক্স, বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজি ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই আন্তঃশাস্ত্রীয় (Interdisciplinary) পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত অগ্রগামী, যা পরবর্তীতে আধুনিক বিজ্ঞানের একটি কেন্দ্রীয় দর্শনে পরিণত হয়।
যুগান্তকারী আবিষ্কার ও উদ্ভাবন – জগদীশচন্দ্র বসু এই প্রতিষ্ঠানেই উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা চালান এবং ক্রেসকোগ্রাফ, স্ফিগমোগ্রাফ, ফটোসিন্থেটিক বাবলার-এর মতো ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এছাড়াও তিনি ১২৮টি গবেষণাপত্র ও ১১টি গ্রন্থ রচনা করে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেন।
বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য স্থাপন ও নেতৃত্ব – বসু বিজ্ঞান মন্দির কেবলমাত্র জগদীশচন্দ্র বসুর কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রতিষ্ঠানটি একটি দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের সূচনা করে। জগদীশচন্দ্রের পর অধ্যাপক দেবেন্দ্রমোহন বসু-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি তার গতিশীলতা বজায় রাখে।
চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার – এই প্রতিষ্ঠান থেকে পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা যে সকল উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন তার মধ্যে রয়েছে – অধ্যাপক এস. এন. দে-এর কলেরা রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারে বিশেষ ভূমিকা। বি.বি. বিশ্বাস-এর উদ্ভিদের “আয়নোসিটাল ফসফেট চক্র” (IP চক্র) আবিষ্কার। এই আবিষ্কারগুলি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও কৃষি ক্ষেত্রে ভারতের গবেষণার সক্ষমতা প্রমাণ করে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন – প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই তার গবেষণার মানের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে। জগদীশচন্দ্র বসুর কাজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়। এমনকি আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর কাজের উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন। বর্তমান সময়েও প্রতিষ্ঠানটি দেশ-বিদেশের গবেষকদের আকর্ষণ করে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি আদায় করে নেয়।
উপসংহার – সুস্পষ্টভাবেই, বসু বিজ্ঞান মন্দির ভারতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার ইতিহাসে একটি যুগসন্ধিক্ষণের প্রতীক। এটি কেবল একটি গবেষণাগারই ছিল না, বরং একটি এমন ধারণার বাস্তব রূপ যা প্রমাণ করেছিল যে ভারতীয় মেধা ও সম্পদে বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটি গবেষণার স্বাধীনতা, আন্তঃশাস্ত্রীয় সহযোগিতা এবং জ্ঞানের প্রতি নিঃস্বার্থ সাধনার যে আদর্শ স্থাপন করেছিল, তা ভারতের বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিকে মজবুত করতে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে এবং আজও তা অব্যাহত রয়েছে।
৪.৬ ছাপা বইয়ের সঙ্গে শিক্ষাবিস্তারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করো। ΜΕ-’19, ’17
উত্তর: ছাপাখানার আবির্ভাব ও ছাপা বইয়ের প্রসার শিক্ষার বিস্তারে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। নিম্নলিখিত পয়েন্ট গুলির মাধ্যমে এই সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা যায় –
শিক্ষার উপকরণের প্রাপ্যতা ও সুলভতা – ছাপাখানা স্থাপনের পর অল্প সময়ে ও সস্তা দামে বিপুল সংখ্যক পাঠ্যপুস্তক মুদ্রিত হতে থাকে। এর ফলে বইয়ের অভাব দূর হয় এবং শিক্ষার উপকরণ সহজলভ্য হয়ে ওঠে। শ্রীরামপুর মিশন প্রেস, ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি, হিন্দুস্তানি প্রেস-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি সস্তা দামে বই যোগান দিয়ে শিক্ষাবিস্তারের পথ সুগম করে।
শিশু ও প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি রচনা – ছাপা বই শিশুশিক্ষার অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’, রামসুন্দর বসাকের ‘বাল্যশিক্ষা’-এর মতো বইগুলি শিশুদের জন্য আদর্শ শিক্ষাসামগ্রীতে পরিণত হয় এবং সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার প্রসার – ছাপা বইয়ের মাধ্যমে শুধু পাঠ্যপুস্তকই নয়, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়েও জ্ঞান বিস্তৃত হয়। মুদ্রিত গ্রন্থের মাধ্যমে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় ধারার শিক্ষাই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসে।
প্রাচীন পুঁথির সংরক্ষণ ও বিশুদ্ধতা রক্ষা – প্রাচীন হস্তলিখিত পুঁথিগুলো লিপিকরের ভুলে দূষিত হতো। সেগুলো মুদ্রিত আকারে প্রকাশের ফলে বিশুদ্ধ পাঠ সংরক্ষণ সম্ভব হয় এবং জ্ঞানের সঠিক প্রসার ঘটে।
মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি – বাংলা ভাষায় পীয়ারসনের ‘বাক্যাবলী’, লসনের ‘পশ্চাবলী’, রাধাকান্ত দেবের ‘বেঙ্গল স্পেলিং বুক’ প্রভৃতি বই ছাপা হওয়ায় শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ পায়। এটি শিক্ষাকে গণমুখী করে তোলে।
গণশিক্ষার প্রসার – ছাপাখানার প্রভাবে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, গণশিক্ষারও প্রসার ঘটে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারত, বাংলার ইতিহাস এবং ‘সমাচার দর্পণ’, ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর মতো সংবাদপত্র সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়।
শিক্ষাকে আকর্ষণীয় ও বহুমাত্রিক করা – ছাপা বইয়ে চিত্র, মানচিত্র, নকশা ইত্যাদি যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছে বিদ্যাচর্চা আরও আকর্ষণীয় ও বোধগম্য হয়ে ওঠে। এছাড়াও, ছাপা বইয়ের চাহিদা চিত্রশিল্পী, হরফ নির্মাতা ইত্যাদি নতুন পেশার জন্ম দেয়, যা সামগ্রিকভাবে একটি শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক সমাজ গঠনে সহায়ক হয়।
উপসংহার – সুতরাং, এ স্পষ্ট যে ছাপাখানা ও ছাপা বই ছিল শিক্ষাবিস্তারের এক অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। এটি শিক্ষাকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে, জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে বিকশিত করে এবং একটি আধুনিক, শিক্ষিত ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের ভিত রচনা করে।
উপবিভাগ ঘ.৪
৪.৭ উদ্-বাস্তু সমস্যা সমাধানে ভারত সরকার কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করে?
উত্তর: উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে ভারত সরকারের গৃহীত উদ্যোগগুলি নিম্নরূপ –
নেহেরু-লিয়াকৎ চুক্তি (১৯৫০) – পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তুদের আগমন কমানোর উদ্দেশ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলীর মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে উভয় দেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা ও সম্পত্তি ফেরতের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে অনেকের মতে এটি ছিল পাকিস্তানের একটি কৌশল, এবং চুক্তিটি বাস্তবে উদ্বাস্তু আগমন কার্যকরভাবে রোধ করতে ব্যর্থ হয়। এই চুক্তির বিরোধিতা করে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও ড. ক্ষিতিশ চন্দ্র নিয়োগী মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
পুনর্বাসন নীতি ও বিতর্ক – সরকার পশ্চিম পাকিস্তান (বিশেষত পাঞ্জাব) থেকে আগত উদ্বাস্তুদের জন্য সুপরিকল্পিত ও তুলনামূলকভাবে কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তাদের জন্য আবাসন, চাকরি ও ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আসা বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে পুনর্বাসন প্রচেষ্টা অপ্রতুল ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে রেখে আসা তাদের সম্পত্তি ফেরত নিশ্চিত করতে ভারত সরকার কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি বলে সমালোচনা রয়েছে। এই বৈষম্যমূলক নীতি একটি বড় বিতর্কের সৃষ্টি করে।
তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা – সরকার উদ্বাস্তুদের জন্য ত্রাণ শিবির, আবাসন প্রকল্প, সরকারি চাকরি ও ঋণদানের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু লক্ষাধিক মানুষের চাপে এই ব্যবস্থাগুলি প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, বহু বাঙালি উদ্বাস্তুকে রেলস্টেশন (শিয়ালদহ, হাওড়া), ফুটপাত, বা ধুবুলিয়া, কুপার্স ক্যাম্প, রাণাঘাটের রূপশ্রী পল্লীর মতো অস্বাস্থ্যকর ও জনাকীর্ণ শিবিরে দীর্ঘদিন বসবাস করতে বাধ্য করা হয়।
পুনর্বাসনের যুগ (১৯৪৭-১৯৫২) – স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম পাঁচ বছরকে “পুনর্বাসনের যুগ” বলা হয়, কারণ এই সময়ে সরকার উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধান ও তাদের পুনর্বাসনের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তবে সম্পূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান এই সময়ের মধ্যেও হয়ে ওঠেনি। পূর্ব ও পশ্চিমের উদ্বাস্তুদের মধ্যে পুনর্বাসনের ব্যবধান এই সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
৪.৮ স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনীতে দেশভাগের কী প্রতিফলন লক্ষ করা যায়?
উত্তর: ভূমিকা – ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের বিভাজন কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনই ছিল না, এটি ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি। স্বাধীনতার আনন্দের পাশাপাশি দেশভাগ রেখে গেছে অমোচনীয় বেদনার এক অধ্যায়। এই বিভীষিকার সরাসরি সাক্ষী ছিলেন যারা, তাদের ব্যক্তিগত আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথাই এই ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও বাস্তবসম্মত দলিল। এই রচনাগুলোতে দেশভাগের প্রতিফলন ঘটেছে নান্দনিক ও মর্মান্তিক উপায়ে।
স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনীতে দেশভাগের প্রতিফলন –
স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনীতে দেশভাগের যে প্রতিফলন লক্ষ করা যায়, তা নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর মধ্য দিয়ে বিশেষভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে –
বিপন্ন মানবতা ও সাম্প্রদায়িক হিংসার মর্মান্তিক চিত্রণ – এই রচনাগুলোয় দেশভাগের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক—সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হত্যা, লুণ্ঠন ও নারীর ওপর অত্যাচারের নির্মম বর্ণনা ফুটে উঠেছে। খুশবন্ত সিং-এর ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ উপন্যাসটি (যেটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত) মানগাঁও গ্রামের পটভূমিতে সেই হিংসার আবহকে জীবন্ত করে তোলে। এই লেখাগুলো শুধু ঘটনার বর্ণনা দেয় না, বরং ধর্মীয় উন্মাদনা কীভাবে স্বাভাবিক মানবিকতাকে ধ্বংস করে দেয়, তার করুণ দলিল হয়ে থাকে।
উদ্বাস্তু জীবনের করুণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা – স্মৃতিকথাগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে আছে উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণাময় জীবনের কথা। হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উদ্বাস্তু’ গ্রন্থে উদ্বাস্তু কমিশনার হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতার পাশাপাশি লক্ষ মানুষ কীভাবে রাতারাতি সব কিছু হারিয়ে শরণার্থী শিবিরের নির্ভরশীল জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছিল, তার মর্মস্পর্শী বর্ণনা রয়েছে। জ্যোতির্ময়ী দেবীর ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা’ গল্পসংকলনেও নারী ও পরিবারের উপর দেশভাগের প্রভাব এবং উদ্বাস্তু জীবনের দুঃখগাঁথা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।
ছিন্নমূল হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক আঘাত ও পরিচয় সংকট – দেশভাগ শুধু ঘর-বাড়ি ছাড়া নয়, ছিল একটি পরিচয় ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা। দক্ষিণারঞ্জন বসুর ‘ছেড়ে আসা গ্রাম’ স্মৃতিকথায় শেকড়চ্যুত হওয়ার যে বেদনা, তা গভীর আবেগ দিয়ে বর্ণিত হয়েছে। নীরদচন্দ্র চৌধুরীর ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ অ্যান আননোন ইন্ডিয়ান’-এও একটি যুগের অবসান এবং নতুন পরিচয় গঠনের সংকটের প্রতিফলন দেখা যায়।
মানবিক মূল্যবোধ ও সংহতির গল্প – এই বিভীষিকার মধ্যেও মানবতার জয়গান ও পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোর অসংখ্য উদাহরণ এই সাহিত্যে স্থান পেয়েছে। অনেক রচনায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসার, বিপদে রক্ষা করার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা সেই অন্ধকার সময়ে আশার আলো জ্বালিয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি – কিছু আত্মজীবনী ও রচনা দেশভাগের রাজনৈতিক পটভূমি ও বিশ্লেষণও উপস্থাপন করে। যেমন, চৌধুরী খালিকুজ্জামানের ‘পাথওয়ে টু পাকিস্তান’ পাকিস্তান আন্দোলনের দৃষ্টিকোণ থেকে, এবং ড. আম্বেদকরের ‘পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া’ রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই বিভাজনের কারণগুলো তুলে ধরে।
মূল্যায়ন/উপসংহার – স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনী দেশভাগের ইতিহাসকে কেবল তারিখ ও ঘটনার সূচির বাইরে এনে একে মর্মস্পর্শী মানবিক আখ্যানে রূপান্তরিত করেছে। এই রচনাগুলো ইতিহাসের সেই সমস্ত নীরব ও সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে উচ্চারণ করে, যাদের যন্ত্রণা ও ত্যাগ প্রায়শই সরকারি নথিপত্রে উপেক্ষিত থেকেছে। তাই, দেশভাগের পূর্ণাঙ্গ ও গভীর বোঝাপড়ার জন্য এই ব্যক্তিগত আখ্যানগুলো অপরিহার্য। দেশভাগের এই সাহিত্যিক দলিলগুলো কেবল অতীতের স্মারকই নয়, বরং আমাদেরকে সাম্প্রদায়িকতা ও ঘৃণার বিভীষিকা থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং মানবিকতা রক্ষার এক অমূল্য প্রেরণা দেয়।
বিভাগ-ঙ
৫. পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে যে-কোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর দাও :
৫.১ বাংলার নবজাগরণ বলতে কী বোঝায়? এই নবজাগরণের সীমাবদ্ধতাগুলি কী?
উত্তর: নবজাগরণ – উনিশ শতকে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা ও চিন্তাধারার সংস্পর্শে যে বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জাগরণ ঘটে, তাকেই ইতিহাসে ‘বাংলার নবজাগরণ’ নামে অভিহিত করা হয়। এই জাগরণের মূল ভিত্তি ছিল যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদ। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত একটি বাঙালি মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এর ফলে বাংলার শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম ও সমাজজীবনের সর্বস্তরে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তিত্বরা এই নবজাগরণের অগ্রদূত ছিলেন।
বাংলার নবজাগরণের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা ছিল, যা নিম্নরূপ –
সীমিত ব্যাপ্তি ও এলিটিস্ট চরিত্র – এই জাগরণ মূলত পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চবর্ণের হিন্দু মধ্যবিত্ত ও ভদ্রলোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলার গ্রামাঞ্চলের বৃহত্তর কৃষক, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। এই কারণে ঐতিহাসিকরা একে ‘এলিটিস্ট আন্দোলন’, ‘অতিকথা’ বা ‘তথাকথিত নবজাগরণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
হিন্দু সমাজকেন্দ্রিকতা – এই নবজাগরণ প্রাথমিকভাবে হিন্দু সমাজের সংস্কার ও নবজাগরণের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। বাংলার মুসলমান সম্প্রদায় এই আন্দোলন থেকে প্রায় বিচ্ছিন্নই থাকেন।
ব্রিটিশ-মোহ ও ভারতীয় সভ্যতার প্রতি অবহেলা – নবজাগরণের অনেক নেতাই ব্রিটিশ শাসন ও সংস্কৃতির প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং মনে করতেন যে ব্রিটিশ শাসনই ভারতের কল্যাণ বয়ে আনবে। এই মোহের ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রেই ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির মৌলিক উপাদানগুলোর প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেন।
অর্থনৈতিক সংকীর্ণতা ও কৃষক-বিরোধী মনোভাব – এই আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভূস্বামী শ্রেণী থেকে এসেছিলেন। ফলে তারা জমিদারি স্বার্থ রক্ষায় বেশি সচেতন ছিলেন। নীল বিদ্রোহসহ বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনের প্রতি তাদের সাধারণত উদাসীন বা বিরোধী মনোভাব ছিল। হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও দীনবন্ধু মিত্রের মতো কয়েকজন ব্যতিক্রম বাদে বাকি শিক্ষিত বাঙালি কৃষকদের সমস্যাকে গুরুত্ব দেননি।
৫.২ বাংলায় কারিগরি শিক্ষার বিকাশের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
উত্তর: পি.এম.বাগচি অ্যান্ড কোম্পানি – এই কোম্পানি ১৮৮৩-১৮৮৬ সালের মধ্যে প্রাচ্যে প্রথম কোলি (সম্ভবত কোল-তুল্য কিছু), সুগন্ধি প্রসাধনী, রবার স্ট্যাম্প ও পঞ্জিকা তৈরি করে কারিগরি ক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য অর্জন করে।
প্রাথমিক কারিগরি সাফল্য ও উদ্ভাবন –
শিবচন্দ্র নন্দী – ১৮৫২ সালে টেলিগ্রাফ লাইন পাতার সময় তিনি পদ্মায় সাবমেরিন কেবল দ্রুত ও অল্প ব্যয়ে স্থাপন করেন।
মহেন্দ্রনাথ নন্দী – তিনি কাপড় বোনার যন্ত্র তৈরি করেন। এই সাফল্যগুলি বাঙালি কারিগরদের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি শেখার আগ্রহ সৃষ্টি করে।
সরকারি উদ্যোগ – সরকার ১৮৫৬ সালে কলকাতা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করে, যা পরবর্তীতে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নাম নেয় এবং ১৮৮০ সালে শিবপুরে স্থানান্তরিত হয় (বর্তমানে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি)।
স্বদেশী আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী উদ্যোগ – স্বদেশী আন্দোলনের সময় জাতীয় নেতারা সরকারি শিক্ষার বিকল্প হিসেবে জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডাক দেন। ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার। এই পরিষদের অধীনে ১৯০৬ সালে বেঙ্গল ন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার অধ্যক্ষ ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ। জাতীয় শিক্ষা পরিষদের সমর্থক ও সদস্য যেমন তারকনাথ পালিত, নীলরতন সরকার ও রাসবিহারী ঘোষ কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষার পক্ষে ছিলেন।
বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) এবং কারিগরি শিক্ষার বিকাশ – ১৯০৬ সালে তারকনাথ পালিত “সোসাইটি ফর প্রমোশন অব টেকনিক্যাল এডুকেশন ইন বেঙ্গল” গঠন করেন এবং একই বছর বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন প্রমথনাথ বসু এবং সভাপতি ছিলেন রাসবিহারী ঘোষ। ১৯১০ সালে আর্থিক সমস্যার কারণে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ BTI-এর সাথে মিলিত হয়। BTI ভারতেই প্রথম ১৯২১ সালে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পাঠদান শুরু করে। ১৯২৪ সালে এটি যাদবপুরে স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯২৮ সালে এর নামকরণ হয় কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি। এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ‘টেক’ নামক পত্রিকা এবং এখানকার প্রায় শতাধিক দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার দেশের কারিগরি শিক্ষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৫ সালে এটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
সারাংশ – বাংলায় কারিগরি শিক্ষার ভিত্তি রচনায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান (পি.এম.বাগচি), স্বদেশী উদ্ভাবক (শিবচন্দ্র ও মহেন্দ্রনাথ নন্দী), সরকারি কলেজ (বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ), জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (জাতীয় শিক্ষা পরিষদ) এবং বিশেষ করে তারকনাথ পালিত ও অন্যান্যদের প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (পরবর্তীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরিপূরক ভূমিকা পালন করেছে।
৫.৩ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কৃষকদের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: ভূমিকা – ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ বিরোধী শেষ গণ-আন্দোলন। “করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে” – গান্ধিজির এই ডাকে কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে যোগ দেয়।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য – এই আন্দোলনে কৃষকরা জমিদারদের বদলে পুলিশি অত্যাচার ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেছিল। ধনী কৃষক, ক্ষেতমজুর, ভূমিহীন কৃষক, এমনকি কিছু জমিদারও এই আন্দোলনে সামিল হয়। কংগ্রেসের জাতীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত এই আন্দোলনে কৃষকরাও দ্রুত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল এবং এটি একটি গণ-বিদ্রোহের রূপ নেয়।
আন্দোলনের বিভিন্ন কেন্দ্র –
বিহার – বিহারে কিষান সভা পরিচালিত কৃষক আন্দোলন উগ্র রূপ নিয়েছিল। আন্দোলনকারীরা রেলস্টেশন, পৌরভবন, ডাকঘর প্রভৃতি সরকারি দপ্তরে অগ্নিসংযোগ করে এবং বিহারের প্রায় আশি শতাংশ থানা দখল করে নিয়েছিল।
বাংলা – বাংলার বিভিন্ন জেলায় কৃষক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লেও মেদিনীপুর জেলা প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানে কৃষকরা খাজনা দেয়া বন্ধ করে দেয় এবং মাতঙ্গিনী হাজরার মতো কৃষক নেত্রী পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। সতীশ সামন্তের নেতৃত্বে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
গুজরাট – সুরাট, রাজকোট সহ সমগ্র গুজরাটে কৃষকরা গেরিলা কায়দায় রেল অবরোধ, সরকারি নথি পোড়ানো প্রভৃতি কর্মসূচি পালন করে।
অন্যান্য অঞ্চল – এছাড়া উড়িষ্যা, আসাম, মধ্যপ্রদেশ, বোম্বাই সহ সমগ্র ভারতে কৃষকদের ব্যাপক যোগদানের ফলে ভারতছাড়ো আন্দোলন প্রায় একটি সর্বাত্মক কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল।
মূল্যায়ন – কৃষকরা, যারা অন্নদাতা এবং দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত ও শোষিত একটি সম্প্রদায়, তারা এই আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাদের ব্যাপক ও সক্রিয় অংশগ্রহণই এই আন্দোলনকে একটি গণ-বিদ্রোহের চরিত্র দান করেছিল।
MadhyamikQuestionPapers.com এ আপনি অন্যান্য বছরের প্রশ্নপত্রের ও Model Question Paper-এর উত্তরও সহজেই পেয়ে যাবেন। আপনার মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কেমন লাগলো, তা আমাদের কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আরও পড়ার জন্য, জ্ঞান অর্জনের জন্য এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য MadhyamikQuestionPapers.com এর সাথে যুক্ত থাকুন।
