আপনি কি ২০২৬ সালের মাধ্যমিক Model Question Paper 6 এর সমাধান খুঁজছেন? তাহলে আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন। এই আর্টিকেলে আমরা WBBSE-এর ইতিহাস ২০২৬ মাধ্যমিক Model Question Paper 6-এর প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক ও বিস্তৃত সমাধান উপস্থাপন করেছি।
প্রশ্নোত্তরগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা সহজেই পড়ে বুঝতে পারে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যবহার করতে পারে। ইতিহাস Model Question Paper 6 প্রশ্নপত্র ও তার সমাধান মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ও সহায়ক।
MadhyamikQuestionPapers.com, ২০১৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষার সমস্ত প্রশ্নপত্র ও সমাধান সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করে আসছে। ২০২৬ সালের সমস্ত মডেল প্রশ্নপত্র ও তার সঠিক সমাধান এখানে সবার আগে আপডেট করা হয়েছে।
আপনার প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করতে এখনই পুরো প্রশ্নপত্র ও উত্তর দেখে নিন!
Download 2017 to 2024 All Subject’s Madhyamik Question Papers
View All Answers of Last Year Madhyamik Question Papers
যদি দ্রুত প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজতে চান, তাহলে নিচের Table of Contents এর পাশে থাকা [!!!] চিহ্নে ক্লিক করুন। এই পেজে থাকা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর Table of Contents-এ ধারাবাহিকভাবে সাজানো আছে। যে প্রশ্নে ক্লিক করবেন, সরাসরি তার উত্তরে পৌঁছে যাবেন।
Table of Contents
Toggleবিভাগ-ক
১. সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো:
১.১. ‘Science, Technology and Medicine in Colonial India’ গ্রন্থটি লিখেছেন-
(ক) ডেভিড আর্নল্ড
(খ) জে ডি বার্নাল
(গ) রিচার্ড গ্রোভ
(ঘ) আলফ্রেড ক্রসবি
উত্তর: (ক) ডেভিড আর্নল্ড
১.২ ভারতে ফুটবল খেলা প্রবর্তন করেন-
(ক) ইংরেজরা
(খ) ওলন্দাজরা
(গ) ফরাসিরা
(ঘ) পোর্তুগিজরা
উত্তর: (ক) ইংরেজরা
১.৩ সতীদাহপ্রথা রদ হয়-
(ক) ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে
(খ) ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে
(গ) ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে
(ঘ) ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে
উত্তর: (খ) ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে
১.৪ প্রথম ভারতীয় মহিলা ডাক্তার ছিলেন-
(ক) চন্দ্রমুখী বসু
(খ) স্বর্ণকুমারী দেবী
(গ) কাদম্বিনী গাঙ্গুলি
(ঘ) অবলা বসু
উত্তর: (গ) কাদম্বিনী গাঙ্গুলি
১.৫ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বি এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
(ক) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে
(খ) ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে
(গ) ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে
(ঘ) ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে
উত্তর: (খ) ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে
১.৬ খুৎকাঠি প্রথা প্রচলিত ছিল-
(ক) সাঁওতালদের
(খ) মুন্ডাদের
(গ) চুয়াড়দের
(ঘ) ভিলদের মধ্যে
উত্তর: (খ) মুন্ডাদের
১.৭ ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের অরণ্য আইনে অরণ্যকে ভাগ করা হয় –
(ক) দুটি স্তরে
(খ) তিনটি স্তরে
(গ) চারটি স্তরে
(ঘ) পাঁচটি স্তরে
উত্তর: (খ) তিনটি স্তরে
১.৮ ভারতসভার কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন –
(ক) কেশবচন্দ্র সেন
(খ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
(গ) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
(ঘ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
উত্তর: (খ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
১.৯ সিপাহি বিদ্রোহের প্রথম ঘটনাস্থল-
(ক) মিরাট
(খ) বহরমপুর
(গ) ঝাঁসি
(ঘ) কানপুর
উত্তর: (খ) বহরমপুর
১.১০ আর জি প্রধান ‘ভারতের জাতীয়তাবাদের জনক’ বলে অভিহিত করেছেন-
(ক) ঋষি অরবিন্দ ঘোষকে
(খ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে
(গ) স্বামী বিবেকানন্দকে
(ঘ) রাজা রামমোহন রায়কে
উত্তর: (গ) স্বামী বিবেকানন্দকে
১.১১ ভারতে ‘হাফটোন’ প্রিন্টিং পদ্ধতি প্রবর্তন করেন –
(ক) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
(খ) সুকুমার রায়
(গ) পঞ্চানন কর্মকার
(ঘ) চার্লস উইলকিনস
উত্তর: (ক) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
১.১২ বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা জগদীশচন্দ্র বসু অধ্যাপক ছিলেন-
(ক) গণিতশাস্ত্রের
(খ) রসায়ন শাস্ত্রের
(গ) পদার্থবিদ্যার
(ঘ) জীববিদ্যার
উত্তর: (গ) পদার্থবিদ্যার
১.১৩ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি যুক্ত ছিল –
(ক) রাওলাট সত্যাগ্রহে
(খ) অসহযোগ আন্দোলনে
(গ) বারদৌলি সত্যাগ্রহে
(ঘ) সাইমন কমিশনবিরোধী আন্দোলনে
উত্তর: (ঘ) সাইমন কমিশনবিরোধী আন্দোলনে
১.১৪ ‘গণবাণী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন –
(ক) মুজফ্ফর আহমেদ
(খ) সন্তোষ সিং
(গ) এস এ ডাঙ্গে
(ঘ) সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার
উত্তর: (ক) মুজফ্ফর আহমেদ
১.১৫ ‘দেশপ্রাণ’ নামে পরিচিত ছিলেন –
(ক) অশ্বিনীকুমার দত্ত
(খ) সতীশচন্দ্র সামন্ত
(গ) যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত
(ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
উত্তর: (ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
১.১৬ ভাইকম সত্যাগ্রহ অনুষ্ঠিত হয়েছিল –
(ক) মালাবারে
(খ) মাদ্রাজে
(গ) মহারাষ্ট্রে
(ঘ) গোদাবরী উপত্যকায়
উত্তর: (ক) মালাবারে
১.১৭ অনুশীলন সমিতি স্থাপিত হয় –
(ক) ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে
(খ) ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে
(গ) ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে
(ঘ) ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে
উত্তর: (খ) ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে
১.১৮ বুড়িবালামের তীরে ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন –
(ক) সূর্য সেন
(খ) ভগৎ সিং
(গ) বাঘাযতীন
(ঘ) অরবিন্দ ঘোষ
উত্তর: (গ) বাঘাযতীন
১.১৯ জুনাগড় রাজ্যটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় –
(ক) ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে
(খ) ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে
(গ) ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে
(ঘ) ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে
উত্তর: (গ) ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে
১.২০ ভারতীয় সেনার হায়দরাবাদ অভিযান হল –
(ক) অপারেশন বিজয়
(খ) অপারেশন সূর্য
(গ) অপারেশন সিংহ
(ঘ) অপারেশন পোলো
উত্তর: (ঘ) অপারেশন পোলো
বিভাগ-খ
২. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ১৬টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
উপবিভাগ ২.১ একটি বাক্যে উত্তর দাও:
২.১.১ সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক কে ছিলেন? ME ’17
উত্তর: ‘সোমপ্রকাশ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ।
২.১.২ ভারতের প্রথম ভাইসরয় কে ছিলেন?
উত্তর: ভারতের প্রথম ভাইসরয় ছিলেন লর্ড ক্যানিং।
২.১.৩ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
উত্তর: ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার।
২.১.৪ একা আন্দোলন কোথায় শুরু হয়েছিল?
উত্তর: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উত্তরপ্রদেশের হারদোই , বাহরাইচ , বারাবাঙ্কি এবং সীতাপুরে একা আন্দোলন শুরু হয়েছিল।
উপবিভাগ ২.২ ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো:
২.২.১ ‘অশনি সংকেত’ সত্যজিৎ রায় পরিচালিত প্রথম রঙিন ছায়াছবি।
উত্তর: ঠিক
২.২.২ ভারতসভা ইলবার্ট বিলের বিরোধিতা করেছিল। ME-18
উত্তর: ঠিক
২.২.৩ ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠিত হয়।
উত্তর: ঠিক
২.২.৪ ভারত যখন স্বাধীন হয় তখন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড।
উত্তর: ভুল
উপবিভাগ ২.৩ ‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ ড্রিংকওয়াটার বেথুন | (১) চুয়াড় বিদ্রোহের নেতা |
| ২.৩.২ দুর্জন সিং | (২) বারদৌলি আন্দোলন |
| ২.৩.৩ সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি | (৩) হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় ME-’19 |
| ২.৩.৪ বল্লভভাই প্যাটেল | (৪) ভারতসভা |
উত্তর:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ ড্রিংকওয়াটার বেথুন | (৩) হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় |
| ২.৩.২ দুর্জন সিং | (১) চুয়াড় বিদ্রোহের নেতা |
| ২.৩.৩ সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি | (৪) ভারতসভা |
| ২.৩.৪ বল্লভভাই প্যাটেল | (২) বারদৌলি আন্দোলন |
উপবিভাগ ২.৪ প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখা মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত করো ও নামাঙ্কিত করো:
২.৪.১ আধুনিক ভারতের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্থল
২.৪.২ নীল বিদ্রোহের অন্যতম কেন্দ্র: যশোর ME-’19
২.৪.৩ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কেন্দ্র তমলুক
২.৪.৪ কোহিমা
উত্তর:
উপবিভাগ ২.৫ নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন করো:
২.৫.১ বিবৃতি: রামমোহন রায় লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লিখেছিলেন (১৮২৩ খ্রিস্টাব্দ)। ME-’19
ব্যাখ্যা ১: সতীদাহপ্রথা বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে।
ব্যাখ্যা ২: ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারের আবেদন জানিয়ে।
ব্যাখ্যা ৩: ভারতে সংস্কৃত শিক্ষাবিস্তারের আবেদন জানিয়ে।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারের আবেদন জানিয়ে।
২.৫.২ বিবৃতি: আদিবাসীদের কাছ থেকে অরণ্য সম্পদ ব্যবহারের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।
ব্যাখ্যা ১: বনজ সম্পদের ওপর সরকারি অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
ব্যাখ্যা ২: আদিবাসীদের উন্নতি করার জন্য।
ব্যাখ্যা ৩: সরকারের আর্থিক ক্ষতি বন্ধ করতে।
উত্তর: ব্যাখ্যা ১: বনজ সম্পদের ওপর সরকারি অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
২.৫.৩ বিবৃতি: হ্যালহেড তাঁর বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ লেখেন এদেশীয় ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা ভাষা শেখাবার জন্য। ME-20
ব্যাখ্যা ১: কারণ, এ দেশের ইংরেজ কর্মচারীরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন।
ব্যাখ্যা ২: কারণ, বাংলা ভাষা না জানলে ইংরেজ কর্মচারীদের পদোন্নতি হত না।
ব্যাখ্যা ৩: কারণ, এদেশে বাণিজ্য ও প্রশাসন চালাবার জন্য ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা ভাষা আয়ত্ত করা প্রয়োজন ছিল।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: কারণ, এদেশে বাণিজ্য ও প্রশাসন চালাবার জন্য ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা ভাষা আয়ত্ত করা প্রয়োজন ছিল।
২.৫.৪ বিবৃতি: ব্রিটিশ সরকার ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে কার্লাইল সার্কুলার জারি করেন।
ব্যাখ্যা ১: সরকারের উদ্দেশ্য ছিল কৃষক আন্দোলন দমন।
ব্যাখ্যা ২: সরকারের উদ্দেশ্য ছিল নারী আন্দোলন দমন।
ব্যাখ্যা ৩: সরকারের উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র আন্দোলন দমন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: সরকারের উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র আন্দোলন দমন।
বিভাগ-গ
৩. দুটি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও : (যে-কোনো ১১টি)
৩.১ সামরিক ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব কী? ME-’22
উত্তর: সামরিক ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল অতীতের যুদ্ধবিগ্রহের কালপঞ্জি বা ঘটনাবলির বর্ণনামূলক অধ্যয়ন নয়; বরং এটি একটি গতিশীল ও বিশ্লেষণাত্মক শাস্ত্র, যা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান শিক্ষা ও অন্তদৃষ্টি প্রদান করে। সামরিক ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব নিম্নোক্তভাবে বিবেচনা করা যায় –
অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ – সামরিক ইতিহাস আমাদের শিখতে সাহায্য করে কীভাবে ভুল সিদ্ধান্ত, রণকৌশলগত ত্রুটি বা গোয়েন্দা ব্যর্থতা যুদ্ধের ফলাফল পরিবর্তন করে দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক শিক্ষা ভবিষ্যতে অনুরূপ ভুল এড়াতে এবং সঠিক কৌশল ও কূটনীতি প্রণয়নে সহায়তা করে।
রণকৌশল ও কৌশলগত চিন্তার বিকাশ – বিভিন্ন যুগের সেনাপতিদের রণকৌশল, সৈন্য সমাবেশ, সরবরাহ লাইনের ব্যবস্থাপনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অভিযোজনশীলতা অধ্যয়নের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের রণকৌশল ও কৌশলগত পরিকল্পনা উন্নত করতে পারে।
প্রযুক্তি ও অস্ত্রের বিবর্তন বোঝা – সামরিক ইতিহাসচর্চা যুদ্ধাস্ত্র, সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ক্রমবিকাশ তুলে ধরে। এটি দেখায় কীভাবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন (যেমন: ধনুক থেকে বন্দুক, ট্যাংক, ড্রোন) যুদ্ধের ধরনই বদলে দিয়েছে। এই জ্ঞান রাষ্ট্রকে ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিনিয়োগ করতে নির্দেশনা দেয়।
৩.২ নারী ইতিহাস কাকে বলে?
উত্তর: নারী ইতিহাস হল ইতিহাস চর্চার এমন একটি শাখা, যা ঐতিহাসিকভাবে নারীদের ভূমিকা, অবদান ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা বা প্রান্তিককরণের প্রেক্ষাপটে, ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীরা কীভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত হয়েছেন, সেই ইতিহাস নতুন করে বিশ্লেষণ ও চর্চা করে। শিক্ষা, সমাজ, রাজনীতি ও আন্দোলনের মতো ক্ষেত্রে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও তা স্বীকৃতি না পাওয়ার ইতিহাস থেকে বেরিয়ে এসে নারীদের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য, যা সামাজিক ইতিহাস চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
৩.৩ ‘মেকলে মিনিট’ কী? ΜΕ -’18
উত্তর: ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২রা ফেব্রুয়ারি ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিংকের কাছে আইন সচিব টমাস ব্যাবিংটন মেকলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা-ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য একটি প্রস্তাব পেশ করেন। এটি-ই ইতিহাসে ‘মেকলে মিনিট’ নামে পরিচিত। এই প্রস্তাবে মেকলে তাঁর মূল বক্তব্যে বলেন যে, প্রাচ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা বৈজ্ঞানিক চেতনাহীন ও পাশ্চাত্য শিক্ষার তুলনায় নিকৃষ্ট। তাঁর মতে, প্রাচ্য সভ্যতা দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপবিত্র। তাই ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তন করা প্রয়োজন। মেকলের মতে, উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা প্রসারিত হলে ‘চুঁইয়ে পড়া নীতি’ (Downward Filtration Theory) অনুযায়ী তা ধীরে ধীরে নিম্ন শ্রেণির মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়বে। এর ফলে এমন একটি শ্রেণির সৃষ্টি হবে যারা রক্ত ও বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচি, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ইংরেজদের মতো হবে। ভারতীয়দের ওপর পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই ছিল মেকলে মিনিটের মুখ্য উদ্দেশ্য।
৩.৪ রাজা রামমোহন রায়কে কেন ‘আধুনিক ভারতের জনক’ বলা হয়?
উত্তর: রাজা রামমোহন রায়ই ছিলেন প্রথম ভারতীয় ব্যক্তিত্ব যিনি ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, রাজনীতি ও অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে একটি যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছিলেন। অন্ধকার ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন উনবিংশ শতকের ভারতীয় সমাজে তিনি ছিলেন এক আলোকবর্তিকা। ভারতকে মধ্যযুগীয়তা থেকে আধুনিক যুগে প্রবেশের পথ দেখিয়েছিলেন বলেই তাঁকে ‘আধুনিক ভারতের জনক’ বা ‘ভারতীয় নবজাগরণের জনক’ আখ্যা দেওয়া হয়।
৩.৫ দুদু মিঞা স্মরণীয় কেন? ΜΕ-’18
উত্তর: দুদু মিঞা স্মরণীয় প্রধানত দুটি কারণে –
প্রথমত, তাঁর বৈপ্লবিক তত্ত্বের জন্য। তিনি ‘ফরাজি’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং প্রচার করতেন যে, ‘জমি আল্লাহর দান; সুতরাং জমির উপর কর ধার্য করার অধিকার কারও নেই’। এই তত্ত্ব ব্রিটিশ ও জমিদারদের কর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, তাঁর দক্ষ সংগঠন ক্ষমতার জন্য। তিনি বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ববঙ্গ) ‘ফরাজি-খিলাফৎ’ নামে একটি স্বাধীন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। তিনি অঞ্চলটিকে কয়েকটি ‘হল্কা’য় (বৃত্ত বা জোন) বিভক্ত করে প্রতিটিতে একজন খলিফা নিযুক্ত করেন। তাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট হল্কায় জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার প্রতিহত করা। তাঁর নেতৃত্বে ফরাজি বাহিনী জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সফল আক্রমণ চালায় এবং তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।
৩.৬ কেনারাম ও বেচারাম কী?
উত্তর: কেনারাম – ব্যবসায়ীরা যখন সাঁওতালদের কাছ থেকে কৃষিপণ্য কিনত তখন বেশি ওজনের বাটখারা ব্যবহার করত। এই বেশি ওজনের বাটখারা কেনারাম নামে পরিচিত ছিল।
বেচারাম – আবার ব্যবসায়ীরা যখন সাঁওতালদের লবণ, চিনি প্রভৃতি পণ্য বিক্রয় করত, তখন কম ওজনের বাটখারা ব্যবহার করত। এই কম ওজনের বাটখারাকে বলা হত বেচারাম।
৩.৭ মহারানির ঘোষণাপত্রের (১৮৫৮) প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল? ΜΕ -’23, ’18
উত্তর: মহারানির ঘোষণাপত্র ছিল একটি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দলিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল ১৮৫৭-এর বিদ্রোহ-পরবর্তী অস্থিরতা দূর করে ভারতীয়দের, বিশেষত দেশীয় রাজাদের মন জয় করা এবং ব্রিটিশ শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা। ঘোষণাপত্রে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতিই পরবর্তীতে বাস্তবায়িত হয়নি, তাই এই সময়কালকে অনেক ইতিহাসবিদ ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অধ্যায়’ বলে অভিহিত করেন। তবুও, এটি ভারতের শাসন কাঠামোতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন চিহ্নিত করে এবং ব্রিটিশ রাজের সরাসরি শাসনের সূচনা করে।
৩.৮ সিপাহি বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ কী ছিল?
উত্তর: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল ‘এনফিল্ড রাইফেল’-এ ব্যবহৃত কার্তুজ। এই কার্তুজটি দাঁত দিয়ে কেটে ব্যবহার করতে হতো এবং গুজব রটে যায় যে, তাতে গোরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে হিন্দু ও মুসলিম সিপাহীদের ধর্মনাশের আশঙ্কা দেখা দেয় এবং তারা এটির ব্যবহার প্রত্যাখ্যান করে বিদ্রোহ শুরু করে। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ব্যারাকপুর সেনানিবাসের মঙ্গল পাণ্ডে নামক এক সৈনিকের বিদ্রোহের মাধ্যমে বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে।
৩.৯ বাংলার ছাপাখানার বিকাশে পঞ্চানন কর্মকারের ভূমিকা কী ছিল? ΜΕ -’18
উত্তর: বাংলার ছাপাখানার বিকাশে পঞ্চানন কর্মকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক। তাঁর প্রধান ভূমিকাগুলো নিম্নরূপ –
বাংলা হরফ নির্মাণের প্রথম কারিগর – তিনি ছিলেন বাংলা ভাষার জন্য সচল ধাতব হরফ নির্মাণের প্রথম ও প্রধান রূপকার। মিশনারি প্রেসের চার্লস উইলকিন্সের সহযোগী হিসেবে তিনি বাংলা হরফ তৈরির দুরূহ কার্যক্রমে সফলতা অর্জন করেন।
প্রযুক্তিগত দক্ষতা – সুদক্ষ স্বর্ণ শিল্পী হওয়ায় হরফ ঢালাই ও ছেনি দিয়ে কাটার মতো জটিল প্রযুক্তিগত কাজে তাঁর দক্ষতা বাংলা মুদ্রণ শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করে।
স্থায়ী শিল্পের প্রতিষ্ঠা – তাঁর সাফল্যের ফলে বাংলা হরফ নির্মাণ একটি স্থায়ী ও টেকসই শিল্পে পরিণত হয়।
৩.১০ তারকনাথ পালিত কেন স্মরণীয়?
উত্তর: বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও শিক্ষানুরাগী স্যার তারকনাথ পালিত মূলত বাংলা তথা ভারতবর্ষে স্বদেশি বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা প্রসারের অগ্রদূত হিসাবে স্মরণীয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানসমূহ নিম্নরূপ –
জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ও বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা – তাঁর অগ্রণী ভূমিকায় ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয় এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI)। এই প্রতিষ্ঠানটিই পরবর্তীতে বিকাশ লাভ করে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT), খড়গপুর-এ রূপান্তরিত হয়।
কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠায় অবদান – ১৯১৪ সালে কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ (বর্তমানে ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি ও রাসবিহারী ঘোষ যুগ্মভাবে বিপুল অর্থ ও জমি দান করেছিলেন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পত্তি দান – তিনি তাঁর পার্শি বাগানের বাড়ি এবং বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাসভবন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেন, যেখানে পরবর্তীতে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ (অধুনা রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ ক্যাম্পাস) ও বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ গড়ে ওঠে।
৩.১১ তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার কী কী উদ্যোগ নিয়েছিল?
উত্তর: সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে গঠিত তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার (১৭ই ডিসেম্বর ১৯৪২ – সেপ্টেম্বর ১৯৪৪) একুশ মাসের শাসনকালে যেসকল উদ্যোগ গ্রহণ করে ছিল তাহল –
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ভয়ংকর সাইক্লোন বিধ্বস্ত অসহায় মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ সরকার তমলুক থানা দখলের প্রতিশোধের রাজনীতি করে ছিল, তখন তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত অসহায় দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের বিদ্যুৎ বাহিনী, ভগিনী সেনা, আইনশৃঙ্খলা কমিটি শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সালিশি সভা করে গ্রামস্তরের বিবাদ মেটানোর উদ্যোগ নিয়েছিল।
এছাড়া স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল।
৩.১২ বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে কৃষকরা সেভাবে অংশগ্রহণ করেনি কেন?
উত্তর: বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে কৃষকদের সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করার পেছনে দুটি মূল কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে সেগুলোই যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হল –
কৃষকদের দুর্দশা – ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা। এই চাপি রাজস্ব নীতি কৃষকদের উপর মারাত্মক আর্থিক সংকট তৈরি করে। এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ উনিশ শতকে তারা বিভিন্ন সময়ে কৃষক বিদ্রোহ করলেও, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় তারা ছিল নিজেদের দারিদ্র্য ও দুঃখ-দুর্দশায় এতটাই নিমজ্জিত যে, বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার মতো সামর্থ্য বা সুযোগ তাদের ছিল না।
কৃষকদের অনীহা ও মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের দূরত্ব – এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী মধ্যবিত্ত শ্রেণি (যাদের মধ্যে ছিলেন চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক) সমাজে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠী ছিলেন। কিন্তু তারা কৃষকদের প্রকৃত দুঃখ-দুর্দশার সাথে সংবেদনশীল ছিলেন না। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক দূরত্বের কারণে সাধারণ গরিব কৃষকরা মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট বোধ করেনি এবং এতে অংশগ্রহণে অনীহা দেখিয়েছে।
৩.১৩ ননীবালা দেবী স্মরণীয় কেন? ΜΕ-’20
উত্তর: ননীবালা দেবী স্মরণীয় প্রধানত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য। তিনি ‘বিপ্লবীদের পিসিমা’ নামে খ্যাত ছিলেন কারণ তিনি হাওড়ার বালবিধবা হয়েও সংসারের কর্ত্রীর ভূমিকায় থেকে বিপ্লবীদের আশ্রয় দিতেন ও গোপনে অস্ত্র সরবরাহ করতেন। তিনি ব্রিটিশ পুলিশের কাছে ধরা পড়েন এবং ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ৩ নং রেগুলেশন আইনে সাজাপ্রাপ্ত প্রথম মহিলা রাজবন্দী হন। জেলে পুলিশের ভয়ঙ্কর অত্যাচার সত্ত্বেও তিনি কোনো গোপন তথ্য ফাঁস করেননি, যা তাঁর অদম্য দেশপ্রেম ও সাহসের পরিচয় দেয় এবং পরবর্তী বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
৩.১৪ নমঃশূদ্র কারা?
উত্তর: নমঃশূদ্র হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় ও ঐতিহ্যবাহী জনগোষ্ঠী। তাদের মূল বসতি বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও তারা ছড়িয়ে আছেন। পেশাগত দিক থেকে এদের প্রধানতম পেশা হলো কৃষিকাজ।
৩.১৫ উদ্বাস্তু কারা?
উত্তর: “উদ্বাস্তু” কথাটির আক্ষরিক অর্থ “বাস্তু থেকে উৎখাত”। যেসব মানুষ জাতিগত হিংসা, ধর্মীয় কট্টরতা, যুদ্ধ, দাঙ্গা, নিরাপত্তাহীনতা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে নিজের বাসভূমি ছেড়ে অন্যত্র (প্রায়শই অন্য দেশে) পালিয়ে যেতে বাধ্য হন, তাদেরই উদ্বাস্তু বা শরণার্থী বলে। এরা তাদের নিজ দেশে বা রাষ্ট্রে নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার হারান, তাই তারা আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন করেন।
৩.১৬ পাক অধিকৃত কাশ্মীর বলতে কী বোঝো?
উত্তর: “পাক অধিকৃত কাশ্মীর” বলতে জম্মু ও কাশ্মীরের সেই অংশকে বোঝায় যা ১৯৪৭-৪৮ সালে পাকিস্তান তার সামরিক বাহিনী ও অনিয়মিত সেনাদের মাধ্যমে অবৈধভাবে দখল করে নেয়। এই অঞ্চলটি বর্তমানে দুটি প্রশাসনিক এলাকায় বিভক্ত –
১. আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর (তথাকথিত ‘আজাদ কাশ্মীর’)
২. গিলগিট-বালতিস্তান
ভারত এই অঞ্চলটিকে তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে দাবি করে এবং পাকিস্তানের দখলকে আন্তর্জাতিক আইন ও বিভিন্ন জাতিসংঘ প্রস্তাবনার লঙ্ঘন হিসেবে দেখে। পাকিস্তান এই অঞ্চলগুলিকে ‘আজাদ কাশ্মীর’ ও ‘গিলগিত-বালতিস্তান’ নামে পরিচালনা করলেও, স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সেখানে সীমিত।
বিভাগ-ঘ
৪. সাত বা আটটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
উপবিভাগ ঘ.১
৪.১ ভারতের ইতিহাসচর্চার উপাদান হিসেবে জীবনের ঝরাপাতার গুরুত্ব লেখো।
উত্তর: সরলা দেবী চৌধুরানী রচিত তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চার একটি অমূল্য উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। এটি কেবলমাত্র একজন ব্যক্তির জীবনকথা নয়, বরং একটি যুগের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। ইতিহাসচর্চার উপাদান হিসেবে এই গ্রন্থটির গুরুত্ব নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলিতে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক –
সামাজিক ইতিহাসের উৎস – এই আত্মজীবনী থেকে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজ, বিশেষ করে ঠাকুরবাড়ির মতো একটি প্রগতিশীল পরিবারের অন্দরমহলের জীবনযাপন, সংস্কৃতি চর্চা, নিয়ম-কানুন, আদব-কায়দা এবং নারীজীবনের বিবরণ সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এটি ঐতিহাসিকদের জন্য সামাজিক ইতিহাস পুনর্গঠনের একটি নির্ভরযোগ্য উপাদান।
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নারী চেতনার প্রতিফলন – সরলা দেবী ছিলেন কেবলমাত্র সাহিত্যিকই নন, একজন অগ্রগামী দেশপ্রেমিকও। তাঁর আত্মজীবনীতে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ, তাদের চিন্তাভাবনা এবং সংগ্রামের সরাসরি বর্ণনা রয়েছে। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে যেমন দেশপ্রেমের স্ফুরণ ঘটিয়েছিলেন, তেমনই ‘জীবনের ঝরাপাতা’তে তারই প্রত্যক্ষ বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে।
স্বদেশী আন্দোলন ও যুবশক্তির সংগঠন – আত্মজীবনীটি থেকে সরলা দেবীর স্বদেশী আন্দোলনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বাঙালি যুবকদের দৈহিক ও মানসিকভাবে সক্ষম করে তোলার জন্য আখড়া ও ব্যায়ামাগার গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ‘বিলিতি ঘুষি বনাম দেশী কিল’-এর মতো তাঁর রচনাগুলি এবং প্রতাপাদিত্য উৎসব, উদয়াদিত্য উৎসব, বীরাষ্টমী ব্রত পালনের মতো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি যুবশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ এই গ্রন্থে রয়েছে।
ঔপনিবেশিক অর্থনীতির শোষণের চিত্র – ‘জীবনের ঝরাপাতা’ ইংরেজ শাসনামলে ভারতীয় কৃষক, নীলচাষী, চা-বাগানের শ্রমিকদের ওপর চলা অর্থনৈতিক শোষণ ও অত্যাচারের মর্মস্পর্শী বর্ণনায় সমৃদ্ধ। এটি ঔপনিবেশিক শাসনের অন্ধকার দিকটি বুঝতে ইতিহাসবিদদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল।
রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দ সম্পর্কের সাক্ষ্য – সরলা দেবী তাঁর মামা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং স্বামী বিবেকানন্দ—এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীতে এই দুই ব্যক্তিত্বকে দেখতেন, তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যায়ন কেমন ছিল, সে সম্পর্কে অন্তরঙ্গ ও ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ আছে। এটি সেই যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত মূল্যবান সংযোজন।
নারী ইতিহাস চর্চার প্রাথমিক উপাদান – ঐতিহ্যগত ইতিহাসচর্চায় নারীদের ভূমিকা প্রায়শই উপেক্ষিত হয়েছে। সরলা দেবীর মতো একজন সক্রিয়, স্বাধীনচেতা নারীর আত্মকথ্য সেই শূন্যতা পূরণে সহায়তা করে। এটি নারী-ইতিহাস চর্চার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস।
সর্বোপরি, যদিও ‘জীবনের ঝরাপাতা’ একটি আত্মজীবনী এবং এতে লেখিকার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, তবুও আধুনিক ভারতের ইতিহাস—বিশেষ করে বাংলার নবজাগরণ, স্বদেশী আন্দোলন এবং সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস—বুঝতে এই গ্রন্থের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল একটি স্মৃতিকথা নয়, ভারতের ইতিহাসচর্চার একটি অবিচ্ছেদ্য ও প্রাণবন্ত ঐতিহাসিক দলিল।
৪.২ উনিশ শতকে নারীশিক্ষা বিস্তারে ড্রিংকওয়াটার বেথুন কী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন? ΜΕ -’19
উত্তর: ভূমিকা – উনিশ শতকের মধ্যভাগে বাংলায় নারীশিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে জন ড্রিংকওয়াটার বেথুন একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এর প্রসারে গঠনমূলক ও অর্থনৈতিক—বিবিধ ভূমিকা পালন করেন।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা – বেথুনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হল ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে কলকাতার মির্জাপুরে ‘হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ও রামগোপাল ঘোষের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি বর্তমানে বেথুন স্কুল নামে খ্যাত। মাত্র ২১ জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই বিদ্যালয়টি ছিল বাংলায় নারীশিক্ষার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অবদান – বেথুন শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই করেননি, ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি এই বিদ্যালয়ের নামে দান করে যান, যা বিদ্যালয়ের আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় করে। এছাড়া, তিনি বাংলার শিক্ষা কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে নারীশিক্ষার পক্ষে প্রশাসনিক সমর্থনও গড়ে তোলেন।
অন্যান্য শিক্ষামূলক ভূমিকা – তিনি নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বেথুন কলেজ প্রতিষ্ঠার পথও প্রস্তুত করেন। এছাড়াও কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি, ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি এবং বিভিন্ন বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
মূল্যায়ন – ড্রিংকওয়াটার বেথুন কেবল একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন উনিশ শতকে বাংলায় নারীশিক্ষা আন্দোলনের একজন প্রধান স্থপতি। তাঁর এই অবদানের জন্য তিনি ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমতুল্য মর্যাদায় আজও স্মরণীয়।
উপবিভাগ ঘ.২
৪.৩ সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: ভূমিকা – সাঁওতালরা হল কঠোর পরিশ্রমী, শান্তিপ্রিয় এক কৃষিজীবী আদিবাসী সম্প্রদায়। তারা বীরভূম, মানভূম, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, মুরশিদাবাদ প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাস করত। ব্রিটিশ ভূমিরাজস্ব নীতির চাপে তারা রাজমহল পাহাড়ের প্রান্তদেশে বনভূমি পরিষ্কার করে বসবাস ও চাষবাস শুরু করে। তাদের এই অঞ্চলকে ‘দামিন-ই-কোহ’ (পাহাড়ের প্রান্তদেশ) বলা হয়। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে এই অঞ্চলের সাঁওতালরা বিভিন্ন কারণে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ – সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণগুলি হল নিম্নরূপ-
সাঁওতালদের জমি হরণ – সাঁওতালরা কঠোর পরিশ্রম করে দামিন-ই-কোহ অঞ্চলের পাথুরে ও জঙ্গলাকীর্ণ জমিকে চাষযোগ্য জমিতে পরিণত করে। তাদের এই জমিগুলি জমিদার, ইজারাদার ও মহাজনরা নানা অজুহাতে দখল করতে থাকে। ফলে সাঁওতালদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
অত্যধিক হারে রাজস্ব আদায় – ব্রিটিশ কোম্পানির সহযোগী জমিদাররা সাঁওতালদের কাছ থেকে অত্যধিক হারে ভূমিরাজস্ব আদায় করত। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এই অঞ্চলে ১৮ বছরের মধ্যে ১০ গুণ খাজনা বৃদ্ধি করা হয়। তা ছাড়া জমিদার ও তাদের কর্মচারীরা নানা ধরনের উপশুল্ক আদায় করত। এই সব কর মেটাতে সাঁওতালরা নাজেহাল হয়ে যেত।
মহাজনদের শোষণ – নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় নগদ অর্থে খাজনা দিতে হত। সাঁওতালরা নগদ অর্থের জন্য মহাজনদের কাছে ফসল বিক্রি করতে এবং ঋণ নিতে বাধ্য হত। মহাজনরা ঋণ দেওয়ার সুযোগে ৫০% থেকে ৫০০% হারে সুদ আদায় করত। এইভাবে সাঁওতালদের নানারকম কৌশলে শোষণ করত মহাজনরা।
ইংরেজ কর্মচারী ও ঠিকাদারদের অত্যাচার – লর্ড ডালহৌসির আমলে রাজমহল, রামপুরহাট, ভাগলপুর প্রভৃতি অঞ্চলে রেললাইনের কাজ শুরু হয়। এর জন্য এই অঞ্চলে বিভিন্ন কর্মচারী ও ঠিকাদাররা আসে। তারা নানাভাবে সাঁওতালদের উপর অত্যাচার করত। নামমাত্র মজুরিতে কাজ করানো, সাঁওতালদের হাঁস, মুরগি, ছাগল কেড়ে নেওয়া, এমনকি নারীদের সম্মানহানিতেও তারা পিছপা হত না। ফলে সাঁওতালরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।
বহিরাগত ব্যবসায়ীদের শোষণ – বহিরাগত কিছু ব্যবসায়ী সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর দোকান খুলে বসে। তারা সাঁওতালদের সরলতার সুযোগে ‘কেনারাম’ ও ‘বেচারাম’ নামক ভুয়ো বাটখারার দ্বারা কম ওজনে মালপত্র ক্রয়বিক্রয়ের মাধ্যমে দরিদ্র সাঁওতালদের প্রতারণা করে।
সাঁওতাল সমাজে ব্রিটিশ আইন প্রবর্তন – সাঁওতালরা তাদের নিজস্ব নিয়মে চলত। বাংলার ছোটোলাট ফ্রেডারিক হ্যালিডের নির্দেশে সাঁওতালদের মধ্যে ব্রিটিশ আইন কার্যকর করা হয়। এর ফলে তাদের চিরাচরিত উপজাতীয় সংগঠন ভেঙে পড়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়।
উপসংহার – এই সমস্ত কারণ – জমি হরণ, অত্যধিক রাজস্ব, মহাজনদের শোষণ, ইংরেজ কর্মচারীদের অত্যাচার, ব্যবসায়ীদের প্রতারণা এবং নিজস্ব আইন-কানুন কেড়ে নেওয়ার ফলে সাঁওতালরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই সম্মিলিত শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধেই ১৮৫৫ সালে সিধু ও কানুর নেতৃত্বে সাঁওতালরা তাদের মহাবিদ্রোহের সূচনা করেছিল।
৪.৪ বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয় কেন? ME-’19
উত্তর: বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলার কারণ –
প্রথম সাংগঠনিক প্রচেষ্টা – ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সভাই ছিল বাংলা তথা ভারতের প্রথম সংগঠন যেটি শুধুমাত্র সাহিত্য বা সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম নিয়ে কাজ শুরু করে।
ভাষাগত স্বার্থরক্ষার রাজনৈতিক চেতনা – ১৮৩৫ সালে ইংরেজিকে সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই সভার জন্ম। এটি ছিল ব্রিটিশ রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি সাংগঠনিক ও সচেতন প্রতিবাদ।
ব্রিটিশ নীতির বিরোধিতা – প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটিশ শাসনের বিভিন্ন নীতি, যেমন নিস্কর ভূমির উপর কর আদায়, ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এটি তাদের কার্যক্রমকে সরাসরি সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়ে যায়।
যুক্তিতর্কের মাধ্যমে আলোচনা – ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মতোই এই সভায়ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে আলোচনা করার রীতি চালু হয়, যা একটি রাজনৈতিক সংসদীয় ব্যবস্থারই প্রাথমিক রূপ ছিল।
ভারতীয় স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার – এই সভা শুধু বাংলা ভাষারই নয়, ব্রিটিশ শাসনের সাথে জড়িত ভারতীয়দের সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকেই কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
উপসংহার – উপর্যুক্ত রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যগুলো—যেমন সরকারি নীতির বিরোধিতা, জনস্বার্থ রক্ষার দাবি এবং সাংগঠনিক ভাবে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে আলোচনা—এর আগে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রদর্শন করেনি। এই অনন্যতা ও প্রাথমিকতাই বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে ভারতের “প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান”-এর মর্যাদা দান করেছে।
উপবিভাগ ঘ.৩
৪.৫ টীকা লেখো: বসু বিজ্ঞান মন্দির।
উত্তর: ভূমিকা – বসু বিজ্ঞান মন্দির ভারতের কলকাতায় অবস্থিত বিজ্ঞান গবেষণার একটি অগ্রণী প্রতিষ্ঠান। এটি প্রতিষ্ঠা করেন খ্যাতনামা ভারতীয় বিজ্ঞানী আচার্য স্যার জগদীশচন্দ্র বসু। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর কলকাতায় এই প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।
প্রতিষ্ঠার পটভূমি – জগদীশচন্দ্র বসু চেয়েছিলেন ভারতেও যেন ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটির মতো উচ্চমানের বিজ্ঞান গবেষণার কেন্দ্র গড়ে ওঠে। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আত্মনিয়োগ করেন এবং নিজ বাসভবনের সংলগ্ন জমি কিনে বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
উদ্দেশ্য – এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞানের অগ্রগতি সাধন ও জ্ঞানকে সর্বসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। বসু চেয়েছিলেন যে বিজ্ঞানমন্দিরের গবেষণালব্ধ ফল যেন সমগ্র মানবতার কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।
গবেষণার ক্ষেত্র – বসু বিজ্ঞান মন্দিরে শুরু থেকেই বহুমুখী গবেষণার কার্যক্রম শুরু হয়। এখানে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, অণুজীববিজ্ঞান, জৈবরসায়ন, জৈবপদার্থবিজ্ঞান এবং পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়। জগদীশচন্দ্র বসু নিজে এখানে উদ্ভিদের প্রাণ ও স্পন্দন সংক্রান্ত যুগান্তকারী গবেষণা চালান এবং ‘ক্রেস্কোগ্রাফ’ নামক একটি সূক্ষ্ম যন্ত্র আবিষ্কার করেন। ১৯৩৭ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি এখানেই তার গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যান। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি ‘বোস ইনস্টিটিউট’ নামে পরিচিত।
উপসংহার – বসু বিজ্ঞান মন্দির কেবল একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানই নয়, এটি ভারতীয় বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনসহ বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিতরা জগদীশচন্দ্র বসুর কাজের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। ভারত তথা বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রসারে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের ভূমিকা চিরস্মরণীয়।
৪.৬ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি সম্বন্ধে একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো।
উত্তর: ভূমিকা – মার্কসের শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, শোষিত কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা এবং শোষণমুক্তির লক্ষ্যে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি গঠিত হয়।
গঠন – বাংলায় কাজি নজরুল ইসলাম, হেমন্ত সরকার ও শামসুদ্দিন হুসেন প্রমুখ নেতার উদ্যোগে ১৯২৫ সালে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’ গঠিত হয়। ১৯২৬ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি অব বেঙ্গল’ রাখা হয়। পরবর্তীতে ১৯২৮ সালে বিভিন্ন প্রাদেশিক শাখা একত্রিত হয়ে সর্বভারতীয় ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি গঠিত হয় এবং আর.এস. নিম্বকার এর সাধারণ সম্পাদক হন।
উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম – এই দলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা করা। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল জমিদারি প্রথার বিলোপ, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা। ‘লাঙল’, ‘গণবাণী’, ‘শ্রমিক’-এর মতো পত্রিকার মাধ্যমে তারা তাদের বামপন্থী আদর্শ প্রচার করত।
আন্দোলন ও পতন – এই দলের নেতৃত্বে বোম্বাইয়ের রেল, বন্দর ও অন্যান্য শিল্পে শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন সংঘটিত হয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এই আন্দোলন দমনের জন্য বামপন্থী নেতাদের বিরুদ্ধে বিতর্কিত ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে, যার ফলে দলটির কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।
উপসংহার – ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টির মূল বিশ্বাস ছিল যে, আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই তারা কৃষক-শ্রমিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জনের পথ দেখিয়েছিল।
উপবিভাগ ঘ.৪
৪.৭ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো। ΜΕ – ’24
উত্তর: সূচনা – ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য সংগঠন ছিল বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠিত হয়। হেমচন্দ্র ঘোষ ছিলেন এই দলের প্রধান নেতা, এবং সত্যগুপ্ত, মীরা দত্তগুপ্তা, হরিদাস দত্ত, সত্যরঞ্জন বক্সী প্রমুখ ছিলেন এর সংগঠক ও সক্রিয় সদস্য। বাংলার বিভিন্ন স্থানে এই দলের শাখা প্রতিষ্ঠিত হলেও মেদিনীপুর শাখাটি বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল। সংক্ষেপে বি.ভি. নামে পরিচিত এই দলটি বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনে গভীর প্রভাব রাখে।
বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলের ভূমিকা বিশ্লেষণ –
সংগঠন ও লক্ষ্য – বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন। দলটি তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গোপন শাখা স্থাপন করে, বিশেষ করে মেদিনীপুর, ঢাকা ও কলকাতায়।
ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যা – দলটি ব্রিটিশ পুলিশ ও প্রশাসনের অত্যাচারী কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করে একের পর এক সফল হামলা চালায়। ১৯৩০ সালে ঢাকায় ইনস্পেক্টর লোম্যান হত্যা দলের সদস্যদের সাহসিকতার পরিচয় দেয়। ১৯৩০ সালের ৮ই ডিসেম্বর বিনয়-বাদল-দীনেশের রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান বিপ্লবী ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এই অভিযানে তারা কারা বিভাগের অধ্যক্ষ সিম্পসন ও সরকারি কর্তা ক্রেগ-কে হত্যা করেন। এই ঘটনা ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে খ্যাত। মেদিনীপুর শাখার সদস্যরা বিমল দাশগুপ্ত, প্রদ্যোৎ ভট্টাচার্য, অনাথবন্ধু পাঁজা ও মৃগেন দত্ত যথাক্রমে পেডি, ডগলাস ও বার্জ নামক অত্যাচারী জেলাশাসকদের হত্যা করে।
ব্রিটিশ প্রশাসনে আতঙ্ক – বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের এই সশস্ত্র কার্যকলাপ ব্রিটিশ সরকার ও পুলিশ প্রশাসনে ত্রাসের সৃষ্টি করে। তারা দেখিয়ে দেয় যে বাংলার যুবসমাজ ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম।
দলের অবসান ও নতুন দিকে মোড় – ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দলের অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়, ফলে সংগঠনটি দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৩৭ সালে হেমচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে বাকি সদস্যরা বক্সা ক্যাম্পে সমবেত হন। পরবর্তীতে অনেকে সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকে যোগদান করে স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যান।
উপসংহার – বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দল বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের সংগঠিত কার্যকলাপ, সাহসিকতাপূর্ণ হামলা ও ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল। এই দল কেবল ব্রিটিশ শাসকদেরই আতঙ্কিত করেনি, বরং বাংলার যুবসমাজকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।
৪.৮ ভারত সরকার কীভাবে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত করার প্রশ্নটি সমাধান করেছিল? ΜΕ – ’19
উত্তর: সূচনা – ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে মন্ত্রীমিশনের প্রস্তাবে দেশীয় রাজ্যগুলির সমবায়ে ইউনিয়ন গঠনের কথা বলা হয় এবং সেই ইউনিয়নে যোগদান স্বেচ্ছাধীন করা হয়। এর ফলে অনেক দেশীয় রাজ্য স্বাধীন থাকার মনস্থ করায়, ভারতভুক্তি সংক্রান্ত জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়।
দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্তি প্রক্রিয়া –
সংযুক্তি দলিলের মাধ্যমে অধিকাংশ রাজ্যের অন্তর্ভুক্তি – এই সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সহযোগিতায় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং স্বরাষ্ট্রসচিব ভি. পি. মেনন একটি কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিযান চালান। তারা ‘সংযুক্তি দলিল’ (Instrument of Accession)-এর মাধ্যমে বেশিরভাগ দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নে যুক্ত করতে সক্ষম হন। এই প্রক্রিয়ায় কূটনীতি, প্রলোভন এবং কখনও কখনও হুমকির সমন্বয় করা হয়। তবে জুনাগড়, হায়দরাবাদ ও কাশ্মীর-সহ কয়েকটি রাজ্য এই প্রাথমিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
জুনাগড়ের ভারতভুক্তি – ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট জুনাগড়ের নবাব পাকিস্তানে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলে, ভারতীয় সরকার এটি মেনে নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার প্যাটেলের নির্দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী জুনাগড় দখল করে নেয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এক গণভোটের মাধ্যমে জুনাগড়ের জনগণ ভারতের পক্ষে রায় দেন এবং এটি ভারতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়।
হায়দরাবাদের ভারতভুক্তি – হায়দরাবাদের নিজাম তার স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাইলে, ভারত সরকার এটি মেনে নেয়নি। নিজাম ভারত সরকারের আল্টিমেটাম উপেক্ষা করলে, ‘অপারেশন পোলো’ নামক সামরিক অভিযান চালানো হয়। প্যাটেলের নির্দেশে জেনারেল জয়ন্তনাথ চৌধুরীর নেতৃত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দরাবাদে প্রবেশ করে এবং ১৯৪৮ সালের ১৩ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংঘটিত সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে নিজাম বাহিনীকে পরাজিত করে। এরপর হায়দরাবাদ ভারতভুক্ত হয়।
কাশ্মীরের ভারতভুক্তি – কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং প্রাথমিকভাবে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান-সমর্থিত উপজাতি বাহিনী কাশ্মীরে আক্রমণ করলে, তিনি ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করেন। এই শর্তে সাহায্য দেওয়া হয় যে, তাকে ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করতে হবে। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর মহারাজা হরি সিং ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে প্রবেশ করে। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি হলে কাশ্মীরের একটি অংশ (এক-তৃতীয়াংশ) পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, যা ‘আজাদ কাশ্মীর’ নামে পরিচিত। এভাবে নিয়ন্ত্রণ রেখা (LOC) সৃষ্টি হয়।
উপনিবেশগুলির অন্তর্ভুক্তি – ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে থাকা ইউরোপীয় উপনিবেশগুলিও ধাপে ধাপে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫৪ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে ফরাসি উপনিবেশগুলি (পন্ডিচেরি, কারাইকাল, ইয়ানাম, মাহে এবং চন্দননগর) ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যদিকে, পর্তুগিজ উপনিবেশ গোয়া, দমন ও দিউ ১৯৬১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন বিজয়’-এর মাধ্যমে মুক্ত হয়ে ভারতভুক্ত হয়।
উপসংহার – এইভাবে, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের দৃঢ় নেতৃত্ব, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ভি. পি. মেননের কূটনৈতিক দক্ষতার ফলে অসংখ্য দেশীয় রাজ্য ও উপনিবেশকে ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়। তাদের এই ঐতিহাসিক অবদান ভারতকে একটি ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
বিভাগ-ঙ
৫. পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে যে-কোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর দাও:
৫.১ শিক্ষাবিস্তারে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক কী? উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আলোচনা করো। ME-’17
উত্তর: ভূমিকা – উপনিবেশিক ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের ইতিহাস পর্যালোচনায় যে বিতর্কটি প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে আসে তা হল প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক। এই বিতর্ক এবং উচ্চশিক্ষার প্রসারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বিতর্ক – ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনের ৪৩ নং ধারায় বলা হয় যে ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য কোম্পানি বছরে এক লক্ষ টাকা ব্যয় করবে। কিন্তু এই অর্থ প্রাচ্য না পাশ্চাত্য কোন শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়, যা ইতিহাসে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক নামে পরিচিত।
প্রাচ্যবাদীগণ ও তাদের বক্তব্য – প্রাচ্যবাদীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন উইলসন, উইলিয়াম জোনস, জোনাথন ডানকান প্রমুখ। তাদের মূল বক্তব্য ছিল যে ভারতের প্রাচ্য ভাষা ও সাহিত্য (সংস্কৃত, আরবি, ফারসি) চর্চার মাধ্যমে ভারতীয়দের শিক্ষিত ও ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত করে তোলা সম্ভব। তারা ভেবেছিলেন যে প্রাচ্য শিক্ষার মাধ্যমেই ভারতীয়দের মন জয় করা যাবে।
পাশ্চাত্যবাদীগণ ও তাদের বক্তব্য – পাশ্চাত্যবাদীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আলেকজান্ডার ডাফ, লর্ড মেকলে, স্যানডার্স এবং রাজা রামমোহন রায়। তাদের যুক্তি ছিল যে একমাত্র পাশ্চাত্য শিক্ষা (ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞান, দর্শন) ভারতীয়দের সমাজ, ধর্ম ও নৈতিকতার সংস্কার ঘটাতে পারে এবং একটি শ্রেণি তৈরি করতে পারে যারা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত থাকবে।
মেকলে মিনিটস ও বিতর্কের অবসান – ১৮৩৫ সালে লর্ড বেন্টিঙ্কের শাসনকালে, টমাস ব্যাবিংটন মেকলে তাঁর বিখ্যাত “মিনিট” বা প্রতিবেদনে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে সমর্থন করেন। তিনি যুক্তি দেন যে ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে একটি “সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি” তৈরি হবে, যারা নিচের শ্রেণির মধ্যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেবে। মেকলের যুক্তির প্রভাবে লর্ড বেন্টিঙ্ক সরকারি অর্থায়নে ইংরেজি শিক্ষাকে প্রাধান্য দেন। এর মাধ্যমে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্কের অবসান ঘটে এবং ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজি ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের দরজা খুলে যায়।
উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা –
প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিতর্কের পরিণতিতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় (১৮৫৭)। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শে গঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল গৌরবময়।
পরিসর – শুরু থেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতা ছিল বিশাল। শুধু বাংলা নয়, উত্তর, পূর্ব ও মধ্য ভারত, এবং এমনকি বর্তমান মায়ানমার ও শ্রীলঙ্কার কলেজগুলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ ছিল।
উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম – বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল অনুমোদিত কলেজগুলোর পরীক্ষা নেওয়া এবং ডিগ্রি প্রদান। ১৮৫৮ সালে প্রথম স্নাতক (বি.এ) পরীক্ষায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও যদুনাথ বসু সফল হন। ১৮৬১ সালে স্নাতকোত্তর (এম.এ) পরীক্ষা শুরু হয়।
মহিলা শিক্ষায় অবদান – ১৮৮৩ সালে কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ও চন্দ্রমুখী বসু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম মহিলা হন, যা ভারতীয় মহিলা শিক্ষায় এক যুগান্তকারী ঘটনা।
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের যুগ – ১৯০৯ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় উপাচার্য হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের “স্বর্ণযুগ” শুরু হয়। তাঁর উদ্যোগে ১৯০৯ সালে আইন কলেজ এবং ১৯১৪ সালে বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে নতুন মাত্রা দেয়।
উপসংহার – প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্কের মাধ্যমে ভারতে আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে উচ্চশিক্ষা প্রসারের প্রধান কেন্দ্র। শুধু শিক্ষা বিস্তারই নয়, সমাজ সংস্কার ও নবজাগরণ সৃষ্টিতেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অপরিসীম।
৫.২ আনন্দমঠ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে কীভাবে জাতীয়তাবাদের রূপ প্রস্ফুটিত হয়েছে তা আলোচনা করো।
উত্তর: ভূমিকা – ঊনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম স্তম্ভ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচনা করেন। তার রচিত ‘আনন্দমঠ’ কেবল একটি উপন্যাসই নয়, এটি ছিল এক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ইশতেহার, যা ভারতবাসীর মনে জাতীয়তাবাদের বীজ বপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়েই জাতীয়তাবাদের একটি সুসংহত রূপ প্রস্ফুটিত হয়, যা পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথিকৃৎ হয়ে ওঠে।
আনন্দমঠ উপন্যাসের রচনা ও প্রকাশ – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘আনন্দমঠ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে। এই উপন্যাসটি রচনায় তিনি ১৭৭০-এর ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং সেই সময়কার সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের ঐতিহাসিক পটভূমিকে কাজে লাগিয়েছেন। তবে এটি কেবল ইতিহাসের বর্ণনা নয়, বরং তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন জাতীয় চেতনার জন্মদানের প্রয়াস ছিল।
সন্তান সমপ্রদায় ও সংগঠিত জাতীয়তাবাদ – ‘আনন্দমঠ’-এর মূল উপজীব্য হলো ‘সন্তান দল’ নামক একদল সংগ্রামী সন্ন্যাসীর গোষ্ঠী, যারা দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার জন্য আত্মত্যাগে প্রস্তুত। এই সন্তান দল ছিল জাতীয়তাবাদী আদর্শের একটি মূর্তরূপ। তাদের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন যে জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজন সংগঠন, শৃঙ্খলা, ত্যাগ ও একনিষ্ঠ দেশপ্রেম। সন্তানদের ‘মা’ তথা দেশমাতৃকার প্রতি আনুগত্য জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শকে একটি ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তি প্রদান করে, যা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব সৃষ্টি করেছিল।
দেশমাতৃকার ধারণা ও জাতীয়তাবাদের মূর্তরূপ – ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ‘দেশমাতৃকা’ ধারণাটির প্রবর্তন। বঙ্কিমচন্দ্র ভারতভূমিকে ‘মা’ রূপে কল্পনা করে—জগদ্ধাত্রী, দুর্গা ইত্যাদি দেবীর মূর্তিতে—তাকে বন্দনা করার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদকে একটি আবেগময় ও আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। এটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে পাশ্চাত্য ধারণা থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র ও স্বদেশী রূপ দান করে। এই দেশমাতৃকার মুক্তিই হয়ে ওঠে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।
বন্দে মাতরম মন্ত্র ও জাতীয় একতার স্লোগান – ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সর্বাধিক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়। এই গানটি শুধু একটি সাহিত্যিক রচনা নয়, এটি হয়ে ওঠে জাতীয় জাগরণের মন্ত্র। পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রসহ বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় একতা ও প্রতিরোধের প্রধান স্লোগান হয়ে ওঠে। এটি ভারতীয়দের মধ্যে একটি অভিন্ন জাতিসত্তার জাগ্রত করে।
ঐতিহাসিকতা ও জাতীয় গৌরবের পুনরুদ্ধার – যদিও ‘আনন্দমঠ’ একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র ইতিহাসকে কাজে লাগিয়েছেন জাতীয় গৌরব ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য। সন্তান বিদ্রোহের কাহিনীর মাধ্যমে তিনি ভারতবাসী, বিশেষত যুবসমাজের মনে এই বিশ্বাস জন্মাতে চেয়েছেন যে তারা ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জয়লাভ করতে সক্ষম। এই জাতীয় গৌরববোধ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্য অপরিহার্য মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি সরবরাহ করে।
মূল্যায়ন ও প্রভাব – ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে একটি মাইলফলক। অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ দত্ত যেমন বলেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র হলেন “ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রকৃত জনক”। এই উপন্যাস শুধু একটি ধারণাই দেয়নি, এটি একটি গতি সৃষ্টি করেছিল। এটি ভারতীয় বিপ্লবীদের—খুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী থেকে আরও অনেককে—গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। ‘বন্দে মাতরম’ ভারতের জাতীয় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠে।
৫.৩ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শ্রমিকদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: ভূমিকা – ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই আন্দোলন ছিল গান্ধিজির নেতৃত্বে পরিচালিত শেষ গণ আন্দোলন, যা ব্রিটিশ সরকারকে কঠোর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। যদিও আন্দোলন শুরুর আগেই গান্ধিজি সহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়, তবুও দেশব্যাপী এই আন্দোলন ব্যাপক গতি লাভ করে। এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে কৃষক, ছাত্র, নারী ও শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। শ্রমিক শ্রেণি তাদের সংগঠিত শক্তি দিয়ে এই আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
শ্রমিকদের অংশগ্রহণের প্রকৃতি – ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শ্রমিকরা মূলত ধর্মঘট, বিক্ষোভ, হরতাল ও সমান্তরাল সরকার গঠন-এর মাধ্যমে অংশগ্রহণ করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করা এবং সরকারি প্রশাসন অচল করে দেওয়া।
বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিকদের ভূমিকা –
বোম্বাই – বোম্বাই ছিল ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র। ৯ আগস্ট থেকে শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ ও ধর্মঘট শুরু হয়। বোম্বাইয়ের শিল্পাঞ্চল ও বন্দর এলাকার শ্রমিকরা আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকে। তাদের ধর্মঘটের ফলে বোম্বাইয়ে ব্রিটিশ প্রশাসন প্রায় অচল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি চালালে অনেক শ্রমিক শহীদ হন।
গুজরাট – আহমেদাবাদের বস্ত্রশিল্পের প্রায় ১,২৫,০০০ শ্রমিক মজদুর মহাজন সংঘ-এর নেতৃত্বে ব্যাপক ধর্মঘট শুরু করে। এই অঞ্চলে একটি সমান্তরাল সরকার (আজাদ সরকার) গঠিত হয়, যা প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে থাকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শ্রমিকরা এই ধর্মঘটে মজুরি বৃদ্ধির মতো কোনো অর্থনৈতিক দাবি না তুলে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দাবিতেই আন্দোলন চালিয়ে যায়। এই ধর্মঘট প্রায় তিন মাস স্থায়ী হয়।
বিহার – জামশেদপুরের টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি (TISCO)-এর প্রায় ৩০,০০০ শ্রমিক ১০ আগস্ট ধর্মঘট শুরু করে। এই ধর্মঘট ১৩ দিন স্থায়ী হয়। শ্রমিকরা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা ধর্মঘট চালিয়ে যাবে। এর প্রভাবে ডালমিয়ানগর সহ বিহারের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়ে।
মহীশূর (বর্তমান কর্ণাটক) – ব্যাঙ্গালোরের শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা ধর্মঘটের মাধ্যমে আন্দোলনে যোগ দেয়। তাদের সঙ্গে ছাত্র ও সাধারণ জনতাও একাত্মতা প্রকাশ করে। রাজ্যের বিভিন্ন খনিতে শ্রমিক ধর্মঘট হয়। এই ধর্মঘটগুলি দমন করতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী গুলি চালায়, যার ফলে বহু শ্রমিক হতাহত হন।
অন্যান্য অঞ্চল – দিল্লি, লখনউ, কানপুর, নাগপুর, মাদ্রাজ, টেনালি, রামনাদ, কোয়েম্বাটোর ও কলকাতার মতো শিল্পকেন্দ্রগুলিতেও শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। তবে এই অঞ্চলের অনেক ধর্মঘটই ছিল স্বল্পস্থায়ী। এর একটি কারণ ছিল, এই শ্রমিকদের জাতীয় চেতনার পাশাপাশি তাদের নিজস্ব পেশাগত স্বার্থও জড়িত ছিল।
১৯৪৫-৪৭ সালে শ্রমিক আন্দোলনে ভারত ছাড়ো-র প্রভাব –
ভারত ছাড়ো আন্দোলন শ্রমিক আন্দোলনে একটি নতুন চেতনার সঞ্চার করেছিল। ১৯৪৫-৪৭ সময়কালে এই চেতনা আরও শক্তিশালী হয়। ১৯৪৫ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের বিচার-এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনে শ্রমিকরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। বোম্বাই ও কলকাতার বন্দর শ্রমিকরা ইন্দোনেশিয়াগামী জাহাজে মাল বোঝাই করতে অস্বীকার করে, যা ছিল আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের সমর্থনের একটি উদাহরণ। ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ-কে সমর্থন করে বোম্বাইয়ে শ্রমিকদের ব্যাপক ধর্মঘট ও হরতাল ব্রিটিশ সরকারকে প্রবল চাপের মুখে ফেলে দেয়।
সীমাবদ্ধতা – ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ। তারা তাদের অর্থনৈতিক দাবি ত্যাগ করে শুধুমাত্র ‘ভারত ছাড়ো’-র রাজনৈতিক লক্ষ্যকে প্রাধান্য দেয়। তবে এই আন্দোলন ছিল প্রধানত শহরকেন্দ্রিক। বৃহৎ শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা অংশ নিলেও গ্রামীণ কুটিরশিল্পের কারিগররা এই আন্দোলন থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন। মুসলিম লিগ, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া এবং র্যাডিকাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এই আন্দোলনকে সমর্থন না করায় তাদের অনুগত শ্রমিক সংগঠনগুলি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন উৎপাদন ব্যাহত না হওয়ায় জরুরি অবস্থার অজুহাতে ব্রিটিশ সরকার শ্রমিক আন্দোলনকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করে।
উপসংহার – সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শ্রমিকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ব্যাপক ধর্মঘট ও বিক্ষোভ ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক কাঠামোকে নাড়া দিয়েছিল এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করেছিল। এই আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয় শ্রমিক শ্রেণি শুধু তাদের সংগঠিত শক্তিই নয়, দেশের স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ স্বীকার করার দৃঢ় জাতীয়তাবাদী চেতনারও পরিচয় দেয়, যা পরবর্তীকালে ১৯৪৬-৪৭ সালের গণআন্দোলনগুলিকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে।
MadhyamikQuestionPapers.com এ আপনি অন্যান্য বছরের প্রশ্নপত্রের ও Model Question Paper-এর উত্তরও সহজেই পেয়ে যাবেন। আপনার মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কেমন লাগলো, তা আমাদের কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আরও পড়ার জন্য, জ্ঞান অর্জনের জন্য এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য MadhyamikQuestionPapers.com এর সাথে যুক্ত থাকুন।
