আপনি কি ২০২৬ সালের মাধ্যমিক ইতিহাস Model Question Paper 10 এর সমাধান খুঁজছেন? তাহলে আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন। এই আর্টিকেলে আমরা WBBSE-এর ইতিহাস ২০২৬ মাধ্যমিক ইতিহাস Model Question Paper 10-এর প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক ও বিস্তৃত সমাধান উপস্থাপন করেছি।
প্রশ্নোত্তরগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা সহজেই পড়ে বুঝতে পারে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যবহার করতে পারে। ইতিহাস মডেল প্রশ্নপত্র ও তার সমাধান মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ও সহায়ক।
MadhyamikQuestionPapers.com, ২০১৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষার সমস্ত প্রশ্নপত্র ও সমাধান সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করে আসছে। ২০২৬ সালের সমস্ত মডেল প্রশ্নপত্র ও তার সঠিক সমাধান এখানে সবার আগে আপডেট করা হয়েছে।
আপনার প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করতে এখনই পুরো প্রশ্নপত্র ও উত্তর দেখে নিন!
Download 2017 to 2024 All Subject’s Madhyamik Question Papers
View All Answers of Last Year Madhyamik Question Papers
যদি দ্রুত প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজতে চান, তাহলে নিচের Table of Contents এর পাশে থাকা [!!!] চিহ্নে ক্লিক করুন। এই পেজে থাকা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর Table of Contents-এ ধারাবাহিকভাবে সাজানো আছে। যে প্রশ্নে ক্লিক করবেন, সরাসরি তার উত্তরে পৌঁছে যাবেন।
Table of Contents
Toggleবিভাগ-ক
১. সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো:
১.১ ভারতে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্রটির নাম-
(ক) আলম আরা
(খ) রাজা হরিশচন্দ্র
(গ) বিল্বমঙ্গল
(ঘ) জামাইষষ্ঠী
উত্তর: (খ) রাজা হরিশচন্দ্র
১.২ বাহাই লোটাস টেম্পল কোথায় অবস্থিত?-
(ক) গুজরাটে,
(খ) আগ্রায়,
(গ) দিল্লিতে,
(ঘ) ঢাকায়
উত্তর: (গ) দিল্লিতে,
১.৩ সর্বধর্মসমন্বয়ের আদর্শ প্রচার করেছিলেন-
(ক) বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী
(খ) স্বামী বিবেকানন্দ
(গ) শ্রীরামকৃষ্ণ
(ঘ) কেশবচন্দ্র সেন
উত্তর: (গ) শ্রীরামকৃষ্ণ
১.৪ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম আচার্য বা চ্যান্সেলর ছিলেন-
(ক) উইলিয়ম কোলভিল
(খ) স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
(গ) লর্ড ক্যানিং
(ঘ) স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (গ) লর্ড ক্যানিং
১.৫ বারাণসী সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন-
(ক) জোনাথন ডানকান
(খ) ওয়ারেন হেস্টিংস
(গ) হল্ট ম্যাকেঞ্জি
(ঘ) চার্লস উড
উত্তর: (ক) জোনাথন ডানকান
১.৬ ঔপনিবেশিক অরণ্য আইনের (১৮৭৮ খ্রি) বিরুদ্ধে সংঘটিত আদিবাসী বিদ্রোহটি হল –
(ক) সাঁওতাল হুল
(খ) মুন্ডা বিদ্রোহ
(গ) কোল বিদ্রোহ
(ঘ) রম্পা বিদ্রোহ
উত্তর: (ঘ) রম্পা বিদ্রোহ
১.৭ পাবনা বিদ্রোহের যে কৃষক নেতাকে ‘বিদ্রোহী রাজা’ বলা হয় –
(ক) শম্ভুনাথ পাল
(খ) ঈশানচন্দ্র রায়
(গ) টিপু শাহ
(ঘ) মজনু শাহ
উত্তর: (খ) ঈশানচন্দ্র রায়
১.৮ ‘হিন্দুমেঘোষণাপত্রের (১৮৫৮) প্রধান উদ্দেশ্য ছিল-
(ক) বমন্ত মেলা
(খ) চৈত্রমেলা
(গ) বৈশাখী মেলা
(ঘ) শ্রাবণী মেলা
উত্তর:(খ) চৈত্রমেলা
১.৯ মহারানির ঘোষণাপত্রের (১৮৫৮) প্রধান উদ্দেশ্য ছিল-
(ক) ভারতবাসীর আনুগত্য অর্জন
(খ) ভারতে ব্রিটিশদের একচেটিয়া ব্যাবসার অধিকার লাভ
(গ) ভারতীয় প্রজাদের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার প্রদান
(ঘ) মহাবিদ্রোহে (১৮৫৭) বন্দি ভারতীয়দের মুক্তিদান
উত্তর: (ক) ভারতবাসীর আনুগত্য অর্জন
১.১০ ‘ভারতমাতা’ শব্দটি এসেছে-
(ক) ভারতাম্বা থেকে
(খ) অম্বা থেকে
(গ) মা থেকে
(ঘ) মাতা থেকে
উত্তর: (ক) ভারতাম্বা থেকে
১.১১ ইউ রায় অ্যান্ড সন্স থেকে প্রকাশিত হত-
(ক) সন্দেশ
(খ) গ্রামবার্তা প্রকাশিকা
(গ) সোমপ্রকাশ
(ঘ) বঙ্গদর্শন
উত্তর: (ক) সন্দেশ
১.১২ ‘বাংলার গুটেনবার্গ’ বা ‘বাংলা মুদ্রণশিল্পের জনক’ বলা হয় –
(ক) ওয়ারেন হেস্টিংসকে
(খ) চার্লস উইলকিনসকে
(গ) গ্রাহাম শ-কে
(ঘ) গিলক্রিস্টকে
উত্তর: (খ) চার্লস উইলকিনসকে
১.১৩ বয়কট আন্দোলনের ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল –
(ক) বাংলার কৃষক শ্রেণি
(খ) মধ্যবিত্ত শ্রেণি
(গ) জমিদার শ্রেণি
(ঘ) ছাত্রসমাজ
উত্তর: (খ) মধ্যবিত্ত শ্রেণি
১.১৪ কোন্ অধিত্রিকার সম্পাদক ছিলেন-
(ক) জয়পুর,
(খ) কলকাতা,
(গ) লাহোের,
(ঘ) দিল্লি
উত্তর: লাহোের
১.১৫ ‘লাঙল’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন-
(ক) কাজী নজরুল ইসলাম
(খ) মুজফ্ফর আহমেদ
(গ) এস এ ডাঙ্গে
(ঘ) আচার্য নরেন্দ্র দেব
উত্তর: (ক) কাজী নজরুল ইসলাম
১.১৬ মাতঙ্গিনী হাজরা ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন যে স্থানে –
(ক) তমলুক
(খ) সুতাহাটা
(গ) বরিশাল
(ঘ) পুরুলিয়া
উত্তর: (ক) তমলুক
১.১৭ ‘অল ইন্ডিয়া হোমরুল লিগ’ প্রতিষ্ঠা করেন –
(ক) অ্যানি বেসান্ত
(খ) ভগিনী নিবেদিতা
(গ) বাসন্তী দেবী
(ঘ) নেলী সেনগুপ্ত
উত্তর: (ক) অ্যানি বেসান্ত
১.১৮ ‘রাষ্ট্রীয় স্ত্রী সংঘ’ গঠন করেন-
(ক) বাসন্তী দেবী
(খ) ঊর্মিলা দেবী
(গ) সরোজিনী নাইডু
(ঘ) অরুণা আসফ আলি
উত্তর: (গ) সরোজিনী নাইডু
১.১৯ দেশীয় রাজ্য ছিল না-
(ক) বোম্বে
(খ) ভোপাল
(গ) হায়দরাবাদ
(ঘ) জয়পুর
উত্তর: (ক) বোম্বে
১.২০ স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন-
(ক) প্রফুল্ল ঘোষ
(খ) বিধানচন্দ্র রায়
(গ) শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
(ঘ) ক্ষিতিশচন্দ্র নিয়োগী
উত্তর: (ক) প্রফুল্ল ঘোষ
বিভাগ-খ
২.২. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ১৬টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
উপবিভাগ ২.১ একটি বাক্যে উত্তর দাও:
২.১.১ ‘একেশ্বরবাদীদের প্রতি’ বইটি কার রচনা?
উত্তর: ‘একেশ্বরবাদীদের প্রতি’ বইটির রচয়িতা হলেন রাজা রামমোহন রায়।
২.১.২ ফরাজি আন্দোলনের প্রবর্তক কে?
উত্তর: ফরাজি আন্দোলনের প্রবর্তক ছিলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ।
২.১.৩ কোন্ প্রেক্ষাপটে গোরা উপন্যাস লেখা হয়েছিল?
উত্তর: গোরা’ উপন্যাসটি উনিশ শতকের শেষে সমাজসংস্কার, ব্রাহ্মসমাজ–হিন্দু সমাজের মতবিরোধ ও জাতীয়তাবাদের উত্থানের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল।
২.১.৪ ফ্লাউড কমিশন কোন্ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত?
উত্তর: ফ্লাউড কমিশন তেভাগা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
উপবিভাগ ২.২ ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো:
২.২.১ বিপিনচন্দ্র পালের লেখা সত্তর বৎসর একটি সরকারি নথি।
উত্তর: ভুল
২.২.২ ‘দিকু’ শব্দের অর্থ বহিরাগত।
উত্তর: ঠিক
২.২.৩ ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে স্বামী বিবেকানন্দ শূদ্র জাগরণের কথা বলেছেন।
উত্তর: ঠিক
২.২.৪ লেবার স্বরাজ পার্টির নাম বদলে হয় ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি।
উত্তর: ভুল
উপবিভাগ ২.৩ ‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ লর্ড রিপন | (১) গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| ২.৩.২ হিন্দুমেলা | (২) বারদৌলি |
| ২.৩.৩ কুনবি পাতিদার | (৩) সিন্ধুপ্রদেশ ME-’23 |
| ২.৩.৪ হেমু কালানি | (৪) হান্টার কমিশন ΜΕ-’24, ’22 |
উত্তর:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ লর্ড রিপন | (৪) হান্টার কমিশন |
| ২.৩.২ হিন্দুমেলা | (১) গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| ২.৩.৩ কুনবি পাতিদার | (২) বারদৌলি |
| ২.৩.৪ হেমু কালানি | (৩) সিন্ধুপ্রদেশ |
উপবিভাগ ২.৪ প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখা মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত করো ও নামাঙ্কিত করো:
২.৪.১ ফরাজি আন্দোলনের কেন্দ্র,
২.৪,২ শান্তিনিকেতন,,
২.৪.৩ ঢাকা,
২.৪.৪ দেশীয় রাজ্য হায়দরাবাদ। ME-’23
উপবিভাগ ২.৫ নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন করো:
২.৫.১ বিবৃতি: ব্রিটিশ শাসনকালে সরকারি গোয়েন্দা বিভাগ নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি করে তা সরকারকে জমা দিত।
ব্যাখ্যা ১: এই প্রতিবেদনগুলির সাহায্যে সহজেই বিপ্লবীদের কার্যকলাপ জানা যেত।
ব্যাখ্যা ২: এর সাহায্যে সরকারি শাসনব্যবস্থা সহজ ও সাবলীল হত।
ব্যাখ্যা ৩: এই প্রতিবেদনগুলি নানা সংবাদপত্রে ছাপা হত।
উত্তর: ব্যাখ্যা ১: এই প্রতিবেদনগুলির সাহায্যে সহজেই বিপ্লবীদের কার্যকলাপ জানা যেত।
২.৫.২ বিবৃতি : ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকার ‘তিন আইন’ পাস করে। ME -’18
ব্যাখ্যা ১: এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা।
ব্যাখ্যা ২: এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল জনগণের অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নতিসাধন করা।
ব্যাখ্যা ৩: এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা এবং বিধবাবিবাহ আইনসিদ্ধ করা।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা এবং বিধবাবিবাহ আইনসিদ্ধ করা।
২.৫.৩ বিবৃতি: উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে শিশুশিক্ষার জন্য বইয়ের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়।
ব্যাখ্যা ১: শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
ব্যাখ্যা ২: শিশুদের জন্য সরকার আইন পাস করে।
ব্যাখ্যা ৩: এই সময় শিশুসাহিত্যের বিকাশ ঘটে।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: এই সময় শিশুসাহিত্যের বিকাশ ঘটে।
২.৫.৪ বিবৃতি: ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলার নারীরা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন।
ব্যাখ্যা ১: বাংলায় নারীশিক্ষার যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল।
ব্যাখ্যা ২: বাংলার নারীরা আধুনিক মনোভাবাপন্ন ছিলেন।
ব্যাখ্যা ৩: বাংলার নারীরা অস্ত্র চালনায় দক্ষ ছিলেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: বাংলার নারীরা আধুনিক মনোভাবাপন্ন ছিলেন।
বিভাগ-গ
৩. দুটি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও : (যে-কোনো ১১টি)
৩.১ ইতিহাসের উপাদানরূপে সংবাদপত্রের গুরুত্ব কী?
উত্তর: ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি সমসাময়িক সমাজের ঘটনা, চিন্তা ও মতামতের প্রতিফলন ঘটায়। সংবাদপত্র থেকে ঐ সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
৩.২ সোমপ্রকাশ সমসাময়িক পত্রিকাগুলি থেকে আলাদা ছিল কেন?
উত্তর:সোমপ্রকাশ’ সমসাময়িক পত্রিকাগুলির তুলনায় অনেক দিক থেকেই ব্যতিক্রমী ছিল। প্রথমত, এটি সমাজসংস্কারের প্রতি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সাহসী অবস্থান নিয়েছিল। সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, নারীশিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে উদার ও প্রগতিশীল মত প্রকাশ করে পত্রিকাটি সেই সময়কার রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। অন্য অনেক পত্রিকা যেখানে ধর্মীয় নিয়ম ও কুসংস্কারের প্রতি অনুগত ছিল, সেখানে ‘সোমপ্রকাশ’ যুক্তিবাদ ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত, এ পত্রিকা সমাজের সমস্যা নিয়ে যুক্তিনির্ভর, গবেষণাধর্মী ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশ করত, যা পাঠকদের বৌদ্ধিকভাবে সমৃদ্ধ করত এবং চিন্তাশীল করে তুলত। তৃতীয়ত, এটি সামাজিক ইস্যুর পাশাপাশি বিজ্ঞান, ইতিহাস, নৈতিকতা ও সাহিত্য নিয়েও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা ছাপত, ফলে পত্রিকাটি জ্ঞানচর্চার একটি বিস্তৃত ক্ষেত্র তৈরি করে।
চতুর্থত, ‘সোমপ্রকাশ’ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শ বা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি বাধ্য ছিল না; বরং নিরপেক্ষতা, যুক্তি ও আধুনিক চিন্তার ওপর জোর দিয়েছিল। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই একে সমসাময়িক পত্রিকাগুলির তুলনায় আরও উন্নত, স্বাধীনমনা ও নবজাগরণধর্মী রূপ প্রদান করে।
৩.৩ ভারতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রসারের ক্ষেত্রে চার্লস উডের দুটি সুপারিশ উল্লেখ করো।
উত্তর: চার্লস উডের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ
১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে স্যার চার্লস উড ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য বিখ্যাত উডের নির্দেশনামা (Wood’s Despatch) জারি করেন। এটি “ভারতের শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা” নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে ভারতে আধুনিক ও সংগঠিত শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়। তার দুটি প্রধান সুপারিশ হলো—
১. তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ
চার্লস উড ভারতের উচ্চশিক্ষা উন্নত করতে কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ে তিনটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব ছিল—
- পরীক্ষা নেওয়া,
- ডিগ্রি প্রদান,
- কলেজগুলিকে অনুমোদন দেওয়া,
- উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ করা।
ফলে সমগ্র ভারতে আধুনিক উচ্চশিক্ষা দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
২. প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষার ব্যবহার ও শিক্ষাবিস্তারের উদ্যোগ
উডের নির্দেশনামায় বলা হয়—
- প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করা হবে যাতে সাধারণ মানুষের শিক্ষাগ্রহণ সহজ হয়।
- মধ্যম স্তরে ইংরেজি শিক্ষা চালু রাখা হবে।
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে যাতে যোগ্য শিক্ষক তৈরি হয়।
- ছাত্রদের মেধা অনুযায়ী বৃত্তি প্রদান করা হবে।
- নারীশিক্ষা সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক আধুনিকতা আসে এবং সমাজে শিক্ষার প্রসার ত্বরান্বিত হয়।
এই দুটি মূল সুপারিশ ভারতের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।
৩.৪ নব্য বেদান্তবাদ কী?
উত্তর: নব্য বেদান্তবাদ হল স্বামী বিবেকানন্দ প্রদত্ত বেদান্তের আধুনিক ব্যাখ্যা, যেখানে প্রাচীন বেদান্তের তত্ত্বকে যুক্ত করা হয়েছে বিজ্ঞান, মানবতা ও সমাজসেবার সঙ্গে। তিনি মনে করতেন যে বেদান্তের মূল ভাবনা আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
স্বামী বিবেকানন্দের নব্য বেদান্তবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
- আত্মার নিত্যতা:
তিনি বলেন, আত্মা জন্ম-নাশহীন, শুদ্ধ, মুক্ত ও চিরন্তন। দেহ নষ্ট হলেও আত্মার কোনও ক্ষতি হয় না। - অদ্বৈতবাদের ওপর জোর:
হিন্দুধর্মের অদ্বৈতবাদই সর্বোচ্চ সত্য—আত্মা ও ব্রহ্ম এক ও অভিন্ন। পরিবর্তনশীল জগতের মূল কারণও এই অদ্বৈত তত্ত্ব। - বেদান্তকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা:
বিবেকানন্দ বলেন, “বনের বেদান্তকে ঘরে আনতে হবে”—অর্থাৎ বেদান্ত কেবল তত্ত্ব নয়, এটি জীবনে প্রয়োগযোগ্য। - মানবসেবা ও কর্মযোগ:
মানুষের সেবা করাকে তিনি ঈশ্বরসেবার সমান বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, সমাজসেবা ও কর্মযোগ বেদান্তের বাস্তব রূপ। - পশ্চিম ও প্রাচ্যের ভালো দিকের সমন্বয়:
পাশ্চাত্যের কর্মশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও উদ্যমের সঙ্গে ভারতের আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাকে মিলিয়ে নিতে তিনি উৎসাহ দেন।
স্বামী বিবেকানন্দের মতে, ব্যক্তির মুক্তি সমাজের মুক্তির মধ্য দিয়েই সম্ভব—এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই নব্য বেদান্তবাদের মূল শিক্ষা।
৩.৫ তিতুমির স্মরণীয় কেন? ME-’22
উত্তর: তিতুমির স্মরণীয় কারণ তিনি ছিলেন ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক সাহসী কৃষক নেতা। তিনি বাংলার নিপীড়িত কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৮৩১ সালে তিনি “তিতুমিরের বাঁশের কেল্লা” নির্মাণ করে ব্রিটিশ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে বারাসতের কৃষক বিদ্রোহ ব্রিটিশদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ব্রিটিশ সেনারা তাঁকে হত্যা করলেও তাঁর সংগ্রামী চেতনা বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেরণা হয়ে থাকে। তাই তিতুমিরকে কৃষক-জনতার অধিকার রক্ষার প্রতীক হিসেবে আজও স্মরণ করা হয়।
৩.৬ চুয়াড় বিদ্রোহের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: চুয়াড় বিদ্রোহের দুটি বৈশিষ্ট্য
১. অরণ্যবাসী ও ভূমিজ জনগোষ্ঠীর শক্তিশালী প্রতিরোধ
চুয়াড় বিদ্রোহ ছিল বনাঞ্চলবাসী ও ভূমিজ জনজাতিগুলোর এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন। চুয়াড়, মুণ্ডা, ভুঁইয়া প্রভৃতি জনগোষ্ঠী ব্রিটিশদের কঠোর রাজস্বনীতি, ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ, জোরপূর্বক খাজনা আদায় এবং সমাজে ধারাবাহিক শোষণের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে। ব্রিটিশ প্রশাসন কৃষকদের জমি কেড়ে নেওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে বহু অরণ্যবাসী অস্ত্র তুলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই কারণে এটি বাংলার অন্যতম বৃহৎ অরণ্যবাসী বিদ্রোহ হিসেবে পরিচিতি পায়।
২. বিদ্রোহের দুই-পর্বে বিকাশ
চুয়াড় বিদ্রোহের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি দুটি সুস্পষ্ট পর্বে সংঘটিত হয়।
- প্রথম পর্বে (১৭৯৮–৯৯) কয়েকজন অসন্তুষ্ট জমিদার চুয়াড় জনগোষ্ঠীকে বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করেন। এ সময় জমিদার-নেতৃত্বে আন্দোলন পরিচালিত হলেও ব্যাপক দমনপীড়নের ফলে বিদ্রোহ কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
- দ্বিতীয় পর্বে (১৮০৯–১০) চুয়াড় সমাজ নিজস্ব নেতৃত্বে আরও সংগঠিত, শক্তিশালী এবং স্বাধীনভাবে লড়াই চালায়। তারা ব্রিটিশদের রাজস্বনীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে সমন্বিত জনআন্দোলন গড়ে তোলে, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে।
এই দুই পর্বের সামগ্রিক সংগ্রাম দেখায় যে চুয়াড় বিদ্রোহ কেবল আকস্মিক জনরোষ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও ক্রমবর্ধমান সংগ্রামের ফল।
৩.৭ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) ব্যর্থতার যে-কোনো দুটি কারণ উল্লেখ করো।
উত্তর: মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) ব্যর্থতার দুটি কারণ
১. ঐক্যের অভাব:
বিদ্রোহীরা সর্বভারতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে পারেনি। হিন্দু-মুসলমান, রাজা-জমিদার কিংবা কৃষক—সবার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল।
২. অস্ত্র ও সংগঠনের দুর্বলতা:
বিদ্রোহীদের অস্ত্র ছিল অপ্রতুল ও পুরোনো। তাদের কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা সংগঠিত সামরিক পরিকল্পনা ছিল না, ফলে ইংরেজদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত বাহিনীর সামনে টিকতে পারেনি।
৩.৮ ভারতসভার কার্যাবলি সম্পর্কে লেখো।
উত্তর: ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে গঠিত ভারতসভা (Indian Association) ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত সংগঠন। এর লক্ষ্য ছিল ভারতীয়দের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করা ও জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা।
ভারতসভার প্রধান কার্যাবলি :
- আই.সি.এস. পরীক্ষার বয়স হ্রাসের বিরুদ্ধে আন্দোলন
ব্রিটিশ সরকার আই.সি.এস. পরীক্ষার বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করলে ভারতসভা তীব্র প্রতিবাদ করে। এই আন্দোলনের ফলে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে স্ট্যাটুটারি সিভিল সার্ভিস চালু হয়। - ইলবার্ট বিল আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা
লর্ড রিপন ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয় অপরাধীদের বিচার করার অধিকার প্রদানের জন্য ইলবার্ট বিল প্রস্তাব করেন। শ্বেতাঙ্গরা এর বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা করলে ভারতসভা বিলের পক্ষে আন্দোলন সংগঠিত করে এবং বিচারব্যবস্থায় সমতার দাবি তোলে। - জাতীয় চেতনা জাগ্রত করা
দেশজুড়ে সভা-সমিতি, প্রচার ও গণআন্দোলনের মাধ্যমে ভারতসভা শিক্ষিত জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা ছড়িয়ে দেয়। - সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ঐক্য গঠন
বিভিন্ন প্রাদেশিক সংগঠনকে যুক্ত করে সার্বভারতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তোলে, যা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে।
সারাংশে, ভারতসভা ব্রিটিশ শাসনের অবিচারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রথম দিকের জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠন, যার আন্দোলনসমূহ ছিল দেশীয় অধিকার রক্ষায় তাৎপর্যপূর্ণ এবং জাতীয় আন্দোলনের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে সহায়ক।
৩.৯ বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার বিকাশের প্রভাব কতটা? ME-’23, ’20
উত্তর: বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার বিকাশ ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। এর মাধ্যমে জ্ঞান, শিক্ষা ও সাহিত্য সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছায়। বহু পত্রিকা, বই ও পুস্তিকা প্রকাশের ফলে সমাজে নতুন চিন্তা ও জাগরণের সঞ্চার ঘটে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে এবং সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। ছাপাখানার কারণে বাংলা ভাষায় নতুন সাহিত্যধারা, যেমন উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধের উদ্ভব ঘটে। সর্বোপরি, এটি বাঙালি সমাজে নবজাগরণের ভিত্তি স্থাপন করে।
৩.১০ ‘ক্রেসকোগ্রাফ’ কী?
উত্তর: ক্রেসকোগ্রাফ হলো আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু উদ্ভিদের বৃদ্ধি পরিমাপের জন্য উদ্ভাবিত একটি সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক যন্ত্র। এর মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র মাত্রায় উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করা যায়। উদ্ভিদও যে জীবন্ত এবং উদ্দীপনায় সাড়া দেয়—তা প্রমাণে এই যন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩.১১ তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার কী?
উত্তর: তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার –
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন-এর প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ শাসনের বিকল্প হিসেবে মেদিনীপুর জেলার তমলুক অঞ্চলে একটি স্বাধীন সমান্তরাল সরকার গঠিত হয়, যা তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার নামে পরিচিত।
তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্য :
- গঠনকাল – ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
- অবস্থান – তমলুকের সুতাহাটা, নন্দীগ্রাম, মহিষাদল ও তমলুক—এই ৪টি থানা এই সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
- নেতৃত্ব – এর সর্বাধিনায়ক ছিলেন বিশিষ্ট গান্ধিবাদী নেতা সতীশচন্দ্র সামন্ত।
- সশস্ত্র দল – সরকারের সামরিক বাহিনীর নাম ছিল ‘বিদ্যুৎবাহিনী’।
- নারী বাহিনী – মহিলা স্বেচ্ছাসেবী দল ছিল ‘ভগিনী সেনা’।
- স্বভাব – এটি ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এক স্বশাসিত স্থানীয় সরকার।
সংক্ষেপে, তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার ছিল ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তমলুকে গড়ে ওঠা একটি বিপ্লবী স্বাধীন প্রশাসন, যা ব্রিটিশ কর্তৃত্বের বাইরে জনগণের নিজস্ব শাসনের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
৩.১২ ১৯২৯ সালের লাহোর অধিবেশন গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: ১৯২৯ সালের লাহোর অধিবেশন গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ এই অধিবেশনেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ‘পূর্ণ স্বরাজ’ বা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-কে ভারতের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করে।
এখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ২৬ জানুয়ারি ১৯৩০ দিনটি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হবে এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ ও গণআন্দোলন আরও তীব্র করা হবে।
৩.১৩ বীণা দাস বিখ্যাত কেন?
উত্তর: বীণা দাস ছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম সাহসী নারী ব্যক্তিত্ব। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত।
অবদান :
ছাত্রীসংঘের সক্রিয় সদস্যা
বীণা দাস ‘ছাত্রীসংঘ’-এর সদস্যা হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে বিপ্লবী কার্যকলাপে অংশ নেন।
গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনের ওপর আক্রমণ
১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনের দিকে রিভলভার থেকে গুলি ছোঁড়েন। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও তাঁর এই সাহসিক ঘটনা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ঘটনার বিচারে বীণা দাসকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বীণা দাস ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে অসামান্য সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্যই বিখ্যাত।
৩.১৪ শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর বিখ্যাত কেন?
উত্তর: শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর নামশূদ্র সমাজের ধর্মগুরু ও মাতুয়া মহাসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিখ্যাত। তিনি নিম্নবর্ণের মানুষদের সামাজিক সম্মান, শিক্ষা ও আত্মমর্যাদার জন্য আন্দোলন চালান। জাতিভেদের বিরুদ্ধে মানবধর্ম, সমতা ও নৈতিক জীবনের শিক্ষা প্রচার করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় নামশূদ্র সম্প্রদায় নতুন সামাজিক শক্তি ও সংগঠন লাভ করে।
৩.১৫ ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি ভারতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি ভারতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কেন?
১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি দিনটি ভারতের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদিন ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় এবং স্বাধীন দেশের নিজস্ব সংবিধান কার্যকরী হয়।
গুরুত্ব :
সংবিধান কার্যকরী
ড. বি.আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে প্রণীত ভারতীয় সংবিধানের খসড়া ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি এই সংবিধান কার্যকর করা হয়।
প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর
এদিন থেকে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন ভারতের নাগরিকদের দ্বারা—ফলে ভারত গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ঐতিহাসিক দিনের সম্মান
২৬ জানুয়ারি তারিখটি বেছে নেওয়া হয় ১৯৩০ সালের পূর্ণস্বরাজ ঘোষণার স্মরণে। এই ঐতিহাসিক তাৎপর্যের কারণেই সংবিধান কার্যকর করার দিন হিসেবে ২৬ জানুয়ারি নির্ধারিত হয়।
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক দিন।
৩.১৬ মাউন্টব্যাটেন প্রস্তাব কী?
উত্তর: মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা বা প্রস্তাব হলো ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের প্রণীত স্বাধীনতা-রূপায়ণ পরিকল্পনা। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুন তিনি যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, সেটিই মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা নামে পরিচিত।
মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার প্রধান বিষয়সমূহ :
1 ভারতের বিভাজন সমগ্র ভারতকে দুটি পৃথক ডোমিনিয়নে ভাগ করা হবে—
ভারত ও পাকিস্তান।
2 পাকিস্তান গঠনের নীতি মুসলিমপ্রধান অঞ্চল—
পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধু, বালুচিস্তান এবং পূর্ব বাংলা নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হবে।
3 প্রদেশগুলির সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার
যেসব প্রদেশে বিভাজনের প্রশ্ন উঠেছিল (যেমন—বাংলা, পাঞ্জাব), সেখানে আইনসভায় ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তারা কোন ডোমিনিয়নে যুক্ত হবে।
4 দেশীয় রাজ্যগুলির অবস্থান
দেশীয় রাজ্যগুলোকে ভারত বা পাকিস্তানের যেকোনো একটিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।
সারাংশে, মাউন্টব্যাটেন প্রস্তাবই ভারতের বিভাজন ও স্বাধীনতা লাভের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বিভাগ-ঘ
৪. সাত বা আটটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও : (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
উপবিভাগ ঘ.১
৪.১ পরিবেশের ইতিহাসের ওপর একটি টীকা লেখো।
উত্তর: মানবজীবনের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। পরিবেশ সমাজ, অর্থনীতি ও সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষের অসচেতনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত শোষণের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশের ইতিহাসচর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পরিবেশের ইতিহাস অধ্যয়নের ফলে—
১. প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝা যায়।
২. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের পরিবেশগত ক্ষতির দিকগুলি স্পষ্ট হয়।
৩. সম্পদের অপচয় ও অতিরিক্ত ব্যবহার জনজীবনকে কীভাবে বিপদের মুখে ফেলে তা জানা যায়।
৪. বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে ধারণা অর্জিত হয়।
৫. পরিবেশ রক্ষার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
এ প্রেক্ষিতে বিভিন্ন পরিবেশ আন্দোলনের জন্ম হয়— যেমন ভারতের চিপকো আন্দোলন (১৯৭৪) ও নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন (১৯৮৫)। পরিবেশসুরক্ষার উদ্দেশ্যে ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়।
সারসংক্ষেপ, পরিবেশ সচেতনতাই পরিবেশ ইতিহাসচর্চার প্রধান লক্ষ্য।
৪.২ ‘নীলদর্পণ’ নাটক থেকে উনিশ শতকের বাংলার সমাজের কীরূপ প্রতিফলন পাওয়া যায়? ΜΕ -’19
উত্তর: দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০) নাটক উনিশ শতকের বাংলার সমাজজীবনের এক বাস্তব ও বেদনাময় চিত্র তুলে ধরে। এই নাটকে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ও শোষণের করুণ বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। নীল চাষের জন্য কৃষকদের জোর করে বাধ্য করা, তাদের জমি দখল, স্ত্রী-সন্তানদের ওপর নির্যাতন—এসব ঘটনা সেই সময়ের সমাজের অমানবিক দিক প্রকাশ করে। নাটকের চরিত্রগুলির মাধ্যমে দেখা যায়, কীভাবে সাধারণ কৃষকরা ব্রিটিশ শাসক ও দেশীয় মহাজনদের দ্বৈত শোষণের শিকার হন। এতে ব্রিটিশ শাসনের অন্যায়, প্রশাসনের নির্লিপ্ততা এবং গ্রামীণ জীবনের দুর্দশা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
‘নীলদর্পণ’-এর মাধ্যমে বাঙালি সমাজে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিবাদের চেতনা জাগ্রত হয়। নাটকটি শুধু কৃষকদের দুরবস্থাই নয়, সমাজের নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয়ের প্রতিফলনও ঘটায়। এটি একদিকে ইংরেজদের শোষণ নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক, অন্যদিকে দেশীয় সমাজের উদাসীনতারও সমালোচনা করে। এই নাটক উনিশ শতকের বাঙালি নবজাগরণের সূচনা ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলা যায়, ‘নীলদর্পণ’ নাটক উনিশ শতকের বাংলার শোষিত সমাজ, তাদের যন্ত্রণা ও জাগরণের এক বাস্তব দলিল।
উপবিভাগ ঘ.২
৪.৩ বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব-এর ধারণাটি ব্যাখ্যা করো। ΜΕ – ’23
উত্তর: বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব — এই তিনটি ধারণাই শাসন বা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিক্রিয়ার বিভিন্ন রূপকে প্রকাশ করে।
বিদ্রোহ বলতে বোঝায় কোনো অত্যাচার, অবিচার বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের সংগঠিত বা অসংগঠিত প্রতিরোধ। সাধারণত এটি আকস্মিকভাবে ঘটে এবং এর উদ্দেশ্য হয় তাত্ক্ষণিক অন্যায়ের প্রতিকার। উদাহরণস্বরূপ, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক বৃহৎ প্রতিরোধ।
অভ্যুত্থান ঘটে সাধারণত কোনো শাসনব্যবস্থা বা সরকারকে আকস্মিকভাবে উল্টে দেওয়ার উদ্দেশ্যে, যেখানে রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি বিদ্রোহের তুলনায় বেশি সংগঠিত এবং নির্দিষ্ট নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত হয়। যেমন—১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর নবাবী শাসন উৎখাতের ঘটনাকে অভ্যুত্থান বলা যেতে পারে।
বিপ্লব হলো বিদ্যমান সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের আন্দোলন। এর লক্ষ্য কেবল শাসক পরিবর্তন নয়, বরং গোটা সমাজব্যবস্থার রূপান্তর। ফরাসি বিপ্লব বা রুশ বিপ্লব এই ধারণার স্পষ্ট উদাহরণ।
এই তিনটি ধারণা পরস্পর সম্পর্কিত হলেও তাদের উদ্দেশ্য, সংগঠন ও ফলাফলের দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে। বিদ্রোহ মুহূর্তের আবেগ, অভ্যুত্থান পরিকল্পিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ, আর বিপ্লব দীর্ঘমেয়াদি সমাজ পরিবর্তনের প্রতীক।
৪.৪ স্বামী বিবেকানন্দের লেখা বর্তমান ভারত গ্রন্থে জাতীয়তাবোধ কীভাবে ফুটে উঠেছে?
উত্তর: গ্রন্থে জাতীয়তাবোধের প্রকাশ
১. সমগ্র ভারতবাসীকে এক জাতি হিসেবে দেখা
স্বামী বিবেকানন্দ জাতিভেদ ভুলে সকল ভারতবাসীকে এক কায়িক-মনোজগৎ বলে মনে করতেন। তিনি বলেন—“নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর—তোমারই রক্ত, তোমার ভাই।” এর মাধ্যমে তিনি জাতিগত বিভেদ দূর করে ঐক্যের ডাক দেন।
২. দেশকে মাতৃরূপে কল্পনা
তিনি দেশকে মা হিসেবে কল্পনা করে দেশের মুক্তির জন্য আত্মত্যাগের আহ্বান জানান। দেশপ্রেমকে পবিত্র ধর্মের আসনে বসিয়ে সকলকে মায়ের সেবায় উৎসাহিত করেন।
৩. যুবসমাজকে দেশগঠনে আহ্বান
স্বামীজী ভারতের দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও হীনম্মন্যতা দূর করতে যুবকদের কর্মময় জীবনে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তিনি “উত্তিষ্ঠত! জাগ্রত!” মন্ত্রের মাধ্যমে ভারতবাসীকে জাগিয়ে তুলতে চান।
এমনকি তিনি বলেন— “গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলার দ্বারা স্বর্গের কাছে যাওয়া যায়”—
অর্থাৎ শক্তি, সাহস ও কর্মপ্রবণতাই জাতির পুনর্জাগরণের মূল শক্তি।
৪. প্রাচ্য–পাশ্চাত্যের সমন্বয়
স্বামীজী একটি নতুন ভারত গড়তে চান যেখানে প্রাচ্যর আধ্যাত্মিকতা ও পাশ্চাত্যের কর্মচঞ্চলতা মিলিত হবে। তাঁর লক্ষ্য ছিল আধুনিক ও ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন।
অবদান
বর্তমান ভারত গ্রন্থটি পরবর্তী কালের বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনুপ্রাণিত করে। শোষিত ও হতাশ ভারতবাসী তাঁর বাণীতে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। এজন্য আর.জি. প্রধান তাঁকে যথার্থই “ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক” বলে অভিহিত করেছেন।
এইভাবে বর্তমান ভারত গ্রন্থে স্বামী বিবেকানন্দ ভারতবাসীর জাতীয়তাবোধ, আত্মসম্মান ও দেশগঠনের স্পৃহাকে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন।
উপবিভাগ ঘ.৩
৪.৫ বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাচিন্তার পরিচয় দাও।
উত্তর: বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাচিন্তার পরিচয়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্বকীয় শিক্ষাদর্শের ভিত্তিতে শান্তিনিকেতন ও পরবর্তী সময়ে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শিক্ষাচিন্তার মূল লক্ষ্য ছিল – প্রকৃতির সান্নিধ্যে, স্বাধীন পরিবেশে, সৃজনশীলতার মাধ্যমে ছাত্রদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
শান্তিনিকেতনের প্রেক্ষাপট
১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রায়পুরের জমিদার ভুবনমোহন সিংহের কাছ থেকে ২০ বিঘা জমি কিনে ‘শান্তিনিকেতন’ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এখানেই রবীন্দ্রনাথ ১৯০১ সালে পাঁচ জন ছাত্র নিয়ে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ নামে বিদ্যালয় গড়েন, যা পরবর্তীতে তাঁর শিক্ষাচিন্তার পরীক্ষাগার হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার প্রধান দিকসমূহ
- প্রকৃতিনির্ভর শিক্ষা
তিনি বিশ্বাস করতেন শ্রেণিকক্ষের দেওয়ালের মধ্যে নয়, প্রকৃতির খোলা পরিবেশে শিশুর মন সবচেয়ে ভালোভাবে বিকশিত হয়। তাই শান্তিনিকেতনে গাছতলায় পাঠদানের প্রচলন ছিল। - আশ্রমিক শিক্ষার আদর্শ
প্রাচীন ভারতের আশ্রম-পদ্ধতি তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। গুরু–শিষ্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সরল জীবনযাপন ও নৈতিক শিক্ষার উপর তিনি গুরুত্ব দেন। - গুরু-শিষ্য ঐক্যের উপর জোর
তাঁর মতে, শিক্ষক জ্ঞান বিতরণ করবেন স্নেহের মাধ্যমে এবং শিক্ষার্থী তা গ্রহণ করবে শ্রদ্ধার সঙ্গে। তাই শান্তিনিকেতনে ছিল ঘনিষ্ঠ, আন্তরিক শিক্ষার পরিবেশ। - সৃজনশীল শিক্ষার বিকাশ
গান, নাচ, ছবি আঁকা, হস্তশিল্প, উৎসব উদ্যাপন—এসবের মাধ্যমেই শিশুদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকশিত হোক, এই ছিল তাঁর মত। তাই এখানে সময়তালিকা ছিল নমনীয়, ছাত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত। - সমগ্র মানবতার শিক্ষা
স্থানীয় গ্রাম ও মানুষের সঙ্গে ছাত্রদের যুক্ত রাখার মাধ্যমে তিনি মানবতাবোধ জাগানোর চেষ্টা করেন। শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যে নয়—মানুষের কাছে গিয়ে মানুষকে জানাই তাঁর উদ্দেশ্য।
বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা
রবীন্দ্রনাথ ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী। তাঁর স্বপ্ন ছিল—এটি হবে “বিশ্বমানবের মিলনক্ষেত্র”। এখানে তিনি চিন, জাপান, ইউরোপ, আমেরিকা প্রভৃতি দেশের পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানান, যাতে বিশ্বসংস্কৃতির আদান–প্রদান ঘটে।
উপসংহার: তাঁর শিক্ষাদর্শ মানবিকতা, স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা ও বিশ্বমানবতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তাই বিশ্বভারতী আজও তাঁর শিক্ষা-দর্শনের অমর নিদর্শন।
৪.৬ অসহযোগ আন্দোলনকালে ভারতের শ্রমিকদের ভূমিকা বর্ণনা করো।
উত্তর: অসহযোগ আন্দোলনকালে ভারতের শ্রমিকদের ভূমিকা
উনবিংশ শতকের শেষভাগে ভারতে শ্রমিকশ্রেণি একটি স্বতন্ত্র সামাজিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠে। আঞ্চলিক শ্রমিক সংগঠন ও AITUC-এর মতো কেন্দ্রীয় সংগঠনের মাধ্যমে তারা সংগঠিত হয়। গান্ধিজির সত্যাগ্রহ ও কংগ্রেসের প্রভাব শ্রমিকদের জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে।
পরিস্থিতি :
অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে। এর পটভূমিতে ছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, রাওলাট আইন, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ইত্যাদি। এসব কারণে শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
সারা ভারতের শ্রমিক ধর্মঘট :
গান্ধিজির নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে যোগ দেয়।
সুমিত সরকারের হিসাবে ১৯২১ সালে—
- মোট ধর্মঘট : ৩৯৬টি
- মোট শ্রমিক অংশগ্রহণ : ৬,০০,৩৫১ জন
- নষ্ট শ্রমদিবস : ৬৯,৯৪,৪২৬ দিন
এগুলো শ্রমিক অসহযোগের ব্যাপকতা প্রমাণ করে।
বাংলার শ্রমিক আন্দোলন :
বাংলার প্রধান শিল্প পাটকল। যুদ্ধোত্তর মন্দার কারণে মজুরি হ্রাস ও শ্রমিক ছাঁটাই চলছিল। ফলে অসহযোগ আন্দোলনে বাংলার শ্রমিকদের প্রবল ভূমিকা দেখা যায়—
- পাটকল ধর্মঘট : ১৯২১ সালে ১৩৭ বার
- অংশগ্রহণ : ১,৮৬,৪৭৯ শ্রমিক
হাওড়ার সেন্ট্রাল জুটমিল, গার্ডেনরিচ ক্লাইভ ও সাউথ ইন্ডিয়ান জুটমিল-এ ধর্মঘট হয়। কয়লাখনি অঞ্চলে স্বামী বিশ্বানন্দ ও স্বামী দর্শনানন্দ শ্রমিকদের নেতৃত্ব দেন। কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয় এবং ইংরেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা ধর্মঘট করে।
অন্যান্য রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলন :
আসাম : চা-বাগানের শ্রমিকরা গান্ধিজির আহ্বানে কাজ ছেড়ে বিহার ফিরে যেতে চাইলে তাদের পুলিশি দমন করা হয়।
মাদ্রাজ : বাকিংহাম ও কর্ণাটক টেক্সটাইল মিল-এর শ্রমিকরা ধর্মঘট করে; থিরু ভিকা কংগ্রেস নেতা আন্দোলনকে সমর্থন করেন।
মূল্যায়ন :
গান্ধিজি ধর্মঘটকে সরাসরি অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে চাননি; তবু কংগ্রেসি নেতারা শ্রমিক ধর্মঘটকে জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেন। শ্রমিকরা শ্রেণিস্বার্থ অতিক্রম করে জাতীয় স্বার্থে অংশ নেয় এবং শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন পরিচালনা করে।
শ্রমিকশ্রেণি অসহযোগ আন্দোলনকে সর্বজনীন রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল।
উপবিভাগ ঘ.৪
৪.৭ বিংশ শতকে ছাত্র আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
উত্তর: ভূমিকা :
বিংশ শতকে ভারতের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকেই ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও পরবর্তী সময়ে জাতীয় আন্দোলনের প্রায় সব পর্যায়েই ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায়। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মাধ্যমে তারা জাতীয় স্বার্থে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলে।
বিংশ শতকে ছাত্র আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য :
- জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা
স্বদেশি আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন ও আইন অমান্য আন্দোলনে ছাত্রসমাজ প্রথম সারিতে থাকে। তারা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্জন, পিকেটিং, মিছিল ও সভা-সমিতির মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে জোরদার করে। - সমাজতান্ত্রিক চেতনার প্রভাব
রুশ বিপ্লবের প্রভাবে ভারতীয় ছাত্রসমাজ সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়। শ্রমিক-কৃষকের অধিকার, সমতা ও শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের ধারণা ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। - সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে অংশগ্রহণ
বিংশ শতকের বিপ্লবী আন্দোলনে বহু ছাত্র সদস্য গোপন সমিতিতে যুক্ত হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেয়। বাংলার ছাত্ররা বিশেষভাবে অ্যানুশীলন, যুগান্তর প্রভৃতি বিপ্লবী সংগঠনে যোগ দিয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। - সমাজসেবামূলক কার্যাবলি
কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, ছাত্রসমাজ বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্য, স্বল্পশিক্ষিত মানুষকে শিক্ষাদান, সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচার—এসব ক্ষেত্রেও তারা সক্রিয় ভূমিকা নেয়।
উপসংহার :
সুতরাং, সমগ্র বিংশ শতকে ছাত্র আন্দোলন ভারতের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে এক নতুন উদ্দীপনা ও সামগ্রিক শক্তি এনে দেয়। তাদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম জাতীয় আন্দোলনকে শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে।
৪.৮ জুনাগড় রাজ্যটি কীভাবে ভারতভুক্ত হয়? ME-’20
উত্তর: জুনাগড় ছিল পশ্চিম ভারতের কাথিয়াওয়ার উপদ্বীপে অবস্থিত একটি দেশীয় রাজ্য, যার শাসক ছিলেন নবাব মুহাম্মদ মহাবত খান। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় জুনাগড়ের অধিকাংশ জনগণ হিন্দু হলেও নবাব মুসলিম ছিলেন। স্বাধীনতার পর নবাব পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, যদিও রাজ্যটি ভৌগোলিকভাবে ভারতের মধ্যে অবস্থিত ছিল। এই সিদ্ধান্তে রাজ্যের জনগণ প্রবলভাবে ক্ষুব্ধ হয় এবং রাজ্যে ব্যাপক জনবিক্ষোভ ও অস্থিরতা দেখা দেয়।
ভারত সরকার এই পরিস্থিতিতে নবাবের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি এবং জুনাগড় সীমান্তে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেয়। পরে নবাব পাকিস্তানে পালিয়ে যান এবং রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব তাঁর দেওয়ান শামলদাস গান্ধী গ্রহণ করেন। দেওয়ান জনগণের দাবির মুখে ১৯৪৮ সালে গণভোট আয়োজন করেন।
গণভোটে প্রায় সমগ্র জনগণ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে রায় দেয়। এর ফলে জুনাগড় আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৪৯ সালে ভারতভুক্ত হয়। এই ঘটনাটি ভারতের ঐক্য ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
বিভাগ-ঙ
৫. পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে যে-কোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর দাও:
৫.১ শিক্ষাবিস্তারে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক কী? উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আলোচনা করো। ME – ’17
উত্তর:
শিক্ষাবিস্তারে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ব্রিটিশ শাসনের সময় ভারতে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক দেখা দেয়, যাকে বলা হয় প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক। এই বিতর্কের মূল বিষয় ছিল—ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে এগোবে: প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানচর্চার ধারায়, নাকি ইউরোপীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর শিক্ষায়।
প্রাচ্যবাদীরা বিশ্বাস করতেন যে ভারতীয় সমাজের উন্নতির জন্য প্রাচীন ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য—যেমন সংস্কৃত, আরবি ও পারসিক—এর শিক্ষাই হওয়া উচিত। তাঁদের মতে, এই ভাষাগুলির মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় জ্ঞান সংরক্ষিত থাকে। প্রাচ্যবাদীরা ব্রিটিশ শাসনের সময়ও চেয়েছিলেন যে শিক্ষার মাধ্যমে ভারতীয় ঐতিহ্য বজায় থাকুক এবং মানুষ নিজেদের সংস্কৃতিকে জানুক।
অন্যদিকে, পাশ্চাত্যবাদীরা যুক্তি দেন যে ভারতের উন্নতি ও আধুনিক সমাজ গঠনের জন্য ইউরোপীয় বিজ্ঞান, দর্শন ও ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, ইংরেজি শিক্ষা মানুষের যুক্তিবোধ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করবে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। তিনি ১৮৩৫ সালে থমাস বাবিংটন ম্যাকলের “মিনিট অন এডুকেশন” গ্রহণ করেন, যেখানে স্পষ্ট বলা হয় যে ইংরেজি ভাষায় পাশ্চাত্য জ্ঞান প্রচার করাই হবে ব্রিটিশ শিক্ষানীতির লক্ষ্য। এর ফলে পাশ্চাত্যবাদীদের মতই সরকারীভাবে গৃহীত হয়।
এই সিদ্ধান্তের ফলস্বরূপ ভারতে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের বিস্তার ঘটে। কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ে আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। প্রাচ্য শিক্ষা গুরুত্ব হারালেও এর ফলে ভারতে এক নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, যারা পরবর্তীকালে সমাজ সংস্কার ও জাতীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।
উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
ভারতের আধুনিক উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একটি যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠান। এটি ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়—ভারতের প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। শুরুতে এর লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ মডেলে উচ্চশিক্ষা প্রদান এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানো।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এক ধরনের পরীক্ষা-নির্ভর affiliating system, যেখানে অনেক কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর মাধ্যমে সমগ্র বাংলায় উচ্চশিক্ষার জাল বিস্তৃত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি ভারতীয় সমাজে আধুনিক বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানচর্চার সূচনা করে।
এর প্রভাবেই বাংলায় এক নতুন বুদ্ধিজীবী শ্রেণি গড়ে ওঠে, যারা সমাজ সংস্কার, জাতীয় চেতনা ও স্বাধীনতার চিন্তাধারায় নেতৃত্ব দেয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ ব্যক্তিত্বরা এই শিক্ষাব্যবস্থার ফলস্বরূপ বিকশিত হন।
বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, গবেষণা, সাহিত্য সৃষ্টিতে ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এটি ভারতের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রেরণা দেয় এবং সমগ্র উপমহাদেশে উচ্চশিক্ষার মান নির্ধারণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
সুতরাং বলা যায়, প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল, আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক ভারতের উচ্চশিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও জাতীয় চেতনার বিকাশে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে।
৫.২ ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনার ইউরোপীয় প্রেক্ষিত কী ছিল?
উত্তর: ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনার ইউরোপীয় প্রেক্ষিত
ঊনবিংশ শতকে ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনা গঠনে ইউরোপ ও বহির্বিশ্বের নানা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এসব ঘটনার মাধ্যমে ভারতীয়রা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সাম্য ও জাতীয় ঐক্যের মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন হয়।
১. আমেরিকার বিপ্লব (১৭৭৫)
আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উক্ত ‘মানবের মৌলিক স্বাধীনতা’র আদর্শ ভারতীয়দের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে উজ্জীবিত করে।
২. ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯)
ফরাসি বিপ্লবের তিন মূল আদর্শ— স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব— ভারতীয় জাতীয়তাবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। রাজতন্ত্রের পতন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘটনা ভারতবাসীর মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তোলে।
৩. ইটালির ঐক্য আন্দোলন
ম্যাৎসিনি, কাভুর ও গ্যারিবল্ডির নেতৃত্বে ১৮৭০ সালে ইটালির জাতীয় ঐক্য সম্পন্ন হয়। ম্যাৎসিনির আদর্শবাদ, কাভুরের কূটনীতি ও গ্যারিবল্ডির বীরত্ব ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের অনুপ্রেরণা জাগায়।
৪. জার্মানির ঐক্য আন্দোলন
বিসমার্ক ‘রক্ত ও লোহা’ নীতি গ্রহণ করে জার্মানিকে একটি শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করেন। তাঁর শক্ত দেশগঠনের সাফল্য ভারতীয়দের জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীন দেশ গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করে।
৫. রাশিয়ার নিহিলিস্ট আন্দোলন
রাশিয়ার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে যুবসমাজের প্রতিবাদী নিহিলিস্ট আন্দোলন ভারতীয়দের মধ্যে অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার সাহস জাগায়।
৬. পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার
পাশ্চাত্য শিক্ষার মাধ্যমে ভারতীয়রা ইউরোপীয় ইতিহাস, বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়। ফলে যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও জাতীয়তাবাদের বোধ তাঁদের মধ্যে সুগভীর হয়।
সারসংক্ষেপ:
ইউরোপ ও আমেরিকার বিপ্লব, ঐক্য আন্দোলন ও রাজনৈতিক দর্শন ঊনবিংশ শতকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রদান করে। এগুলিই ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শগত ভিত্তি তৈরি করেছিল।
৫.৩ বিংশ শতাব্দীতে ভারতের কৃষক আন্দোলন সম্পর্কে আলোকপাত করো।
উত্তর: ভূমিকা
ব্রিটিশ আমলে বিংশ শতাব্দীতে ভারতে কৃষকশ্রেণি বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্রিটিশ শোষণ, খাজনা বৃদ্ধি ও জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। জাতীয় রাজনীতির প্রভাবেই এই কৃষক আন্দোলনগুলি ব্যাপকতা লাভ করে।
১. বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় কৃষক আন্দোলন (১৯০৫)
লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে স্বদেশি আন্দোলন শুরু হলেও কৃষকশ্রেণির অংশগ্রহণ ছিল কম।
- আন্দোলনে কৃষিভিত্তিক কর্মসূচি না থাকায় কৃষকরা তেমন অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
- পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষকরা বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল।
২. অসহযোগ আন্দোলনের সময় কৃষক আন্দোলন (১৯২০–২২)
মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনে কৃষকশ্রেণির সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায়।
বাংলায়
মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর, পাবনা, রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা আন্দোলনে যুক্ত হয়।
বিহারে
ভাগলপুর, মুজফ্ফরপুর, দরভাঙ্গা, মধুবনি অঞ্চলে খাজনা বন্ধ আন্দোলন হয়; নেতা ছিলেন স্বামী বিদ্যানন্দ।
যুক্তপ্রদেশে
হরদই, বারাবাঁকি, রায়বেরিলি, প্রতাপগড়ে কৃষকরা একা আন্দোলনে অংশ নেয়।
এ ছাড়া গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ ও পাঞ্জাবেও কৃষকরা সক্রিয় থাকে।
৩. আইন অমান্য আন্দোলনের সময় কৃষক আন্দোলন (১৯৩০–৩৪)
লবণ সত্যাগ্রহের প্রভাবে কৃষকরা জমিদারি প্রথা ও খাজনার বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করে।
বাংলায়
মেদিনীপুরের কাঁথি, মহিষাদল অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন সংঘটিত হয়।
যুক্তপ্রদেশে
রায়বেরিলি, আগ্রা, লখনউ, প্রতাপগড়ে কৃষকদের অংশগ্রহণ ব্যাপক ছিল।
বিহারে
জমিদারি উচ্ছেদের দাবিতে স্বামীসহজানন্দের নেতৃত্বে কিষানসভা গঠিত হয়।
৪. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় কৃষক আন্দোলন (১৯৪২)
স্বতঃস্ফূর্ত এই আন্দোলনে কৃষকরা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
বাংলায়
মেদিনীপুর, দিনাজপুর, বালুরঘাটে খাজনা বন্ধ আন্দোলন ঘটে।
বিহারে
ভাগলপুর, মুজফ্ফরপুর, পূর্ণিয়া, সাঁওতাল পরগনার ৮০% থানা আন্দোলনকারীদের দখলে আসে।
গুজরাটে
সুরাট, খান্দেশ, ব্রোচ অঞ্চলে রেল অবরোধ ও সরকারি অফিস আক্রমণ করা হয়।
উড়িষ্যায়
তালচের অঞ্চলে কৃষকরা সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
উপসংহার
বিংশ শতাব্দীতে ভারতের জাতীয় আন্দোলনগুলিতে কৃষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদিও জাতীয় নেতাদের মধ্যে জমিদারি-বিরোধী কর্মসূচি নিয়ে মতভেদ ছিল, তবুও কৃষক আন্দোলন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামকে তীব্রতর করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
MadhyamikQuestionPapers.com এ আপনি অন্যান্য বছরের প্রশ্নপত্রের ও Model Question Paper-এর উত্তরও সহজেই পেয়ে যাবেন। আপনার মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কেমন লাগলো, তা আমাদের কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আরও পড়ার জন্য, জ্ঞান অর্জনের জন্য এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য MadhyamikQuestionPapers.com এর সাথে যুক্ত থাকুন।
